somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উপন্যাস : পৌরুষ -Ñকিস্তি ৩২

১৫ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৫.১

আগামীকাল ফুলটুসের স্কুলে গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে। কালই তো! গত সপ্তাহে স্কুলের নিউজলেটারে দেখেছিলো, মনে পড়ছে বিজুর।

দিনের শেষ সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে দেয়। রানুকে সে পুরোপুরি বুঝতে পারে, এমন দাবি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বিয়ের আগে-পরে মিলিয়ে পনেরো-ষোলো বছর, একজন মানুষকে জানার জন্যে কি সময়টা যথেষ্ট নয়?

হয়তো যথেষ্ট, হয়তো নয়। কিন্তু নয় কেন? এর মধ্যে বারো বছর একই ছাদের নিচে বসবাস করেছে, এক বিছানা ভাগাভাগি করেছে।

শারীরিক নৈকট্য ও সহাবস্থান হয়তো কিছু সাহায্য করে, কিন্তু রানুর রহস্যময়তা ঠিক ঠিক বোঝা আজও হলো না! এই যে আজ এয়ারপোর্ট থেকে ঘরে ফিরে প্রথম পাওয়া উপেক্ষা, ঠিক তার বিপরীতে বিজুর পছন্দমতো পোশাক ও সজ্জা। স্যুভেনির পেয়ে খুশি হওয়া, তার উল্টোদিকে খাবার গরম করা নিয়ে তীক্ষè বাক্য। মেলে না যে!

টেবিলে বিজুর পছন্দের খাবার সাজিয়ে পাশে এসে বসার পর মনে হতে পারে দিনের শেষে একটি মধুর সমাপ্তি অপেক্ষা করে আছে। অথচ এখন কোনোকিছু না বলে সে ঘুমিয়ে পড়লো, এর ব্যাখ্যা কোথায়? হয়তো ইচ্ছের সঙ্গে মিলিয়ে ঘটনা ঘটে না, ঘটানো যায়ও না। খাবার টেবিলে রানুর বসা নিয়ে বিজুর অস্বস্তি কোনো ভুলে যাওয়া অন্ধকার ঘরে হয়তো অকস্মাৎ আলো ফেলে থাকবে।

উঠে পড়ে বিজু, ভেতরে এসে প্যাটিওর দরজা বন্ধ করে। শোয়ার ঘরে যাওয়ার আগে ফুলটুসের ঘরে ঢোকে। নাইট লাইটের অল্প আলোয় দেখা যায়, উপুড় হয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে সে। নতুন পাওয়া বারবি এক হাতে জড়িয়ে ধরা। একটা চেয়ারের ওপর কাল স্কুলে যাওয়ার সব কাপড়চোপড়। মেয়ে নিজে ঘুমানোর আগে কোনোসময় এই কাজটা করে রাখে। সকালে উঠে তাড়াহুড়োর মধ্যে কী পরবো, কী সঙ্গে নেবো এই নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হতে হয় না।

টেবিলের পাশে স্কুলের ব্যাকপ্যাক রাখা। ব্যাকপ্যাক খুলে টেক-হোম ফোল্ডার বের করে বিজু। ফোল্ডারে স্কুলের প্রতিদিনের এবং আসন্ন কার্যকমের বিবরণ, ক্যালেন্ডারে মাসের বিশেষ দিনগুলো হাইলাইট করা। অভিভাবকরা আগাম জেনে যায়, স্কুলে কবে কী হচ্ছে। এ ঘরে আলো জ্বাললে ফুলটুসের ঘুম ভাঙবে না ঠিকই, কিন্তু চোখে আলো পড়লেই চোখমুখ কোঁচকাবে মেয়ে।

ফোল্ডার হাতে নিয়ে বসার ঘরে আসে বিজু। হ্যাঁ, কাল গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে। ছেলেমেয়েরা তাদের দাদা-দাদী বা নানা-নানীকে কাল স্কুলে নিয়ে যেতে পারবে সঙ্গে করে। ক্লাসে তারা বাচ্চাদের গল্প শোনাবে, একসঙ্গে লাঞ্চ খাবে। ব্যাপারটা খুবই মজার হবে, বিজু আন্দাজ করতে পারে। আচ্ছা, বাংলাদেশে বাচ্চাদের স্কুলগুলোতে এই নিয়মটা নেই কেন? দেশে বাচ্চারা এদের তুলনায় অনেক বেশি দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ন্যাওটা হয়।

ফুলটুস তার গ্র্যান্ডপ্যারেন্টদের কতোটুকু চেনে? সামান্য সময়ের যা দেখা-সাক্ষাত হয়েছে, তার বেশি কিছু নয়। নানীর সঙ্গে ছাড়া ঘুমাবো না জাতের আবদার করার মতো ঘনিষ্ঠতা কখনো তৈরি হয়নি!

স্কুল থেকে খবরটা জেনে ফুলটুস জিজ্ঞেস করেছিলো, বাবা, গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে-তে আমার সঙ্গে কে যাবে? আমার গ্র্যান্ডপ্যারেন্টরা কেউ এখানে থাকে না কেন?

কী উত্তর দেয় বিজু? কীভাবে বললে মেয়েকে বোঝানো যাবে তার দাদা-দাদী বা নানা-নানী কেন এখানে থাকে না। জানে, বোঝানো সম্ভব নয়। তাই হালকা করে বলেছিলো, তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না, সেইজন্যে মনে হয় এখনে থাকতে চায় না।

ফুলটুস মানতে রাজি নয়। বলে, আমার ক্লাসের ম্যানুয়েল-এর গ্র্যান্ডমা স্প্যানিশ ছাড়া কিচ্ছু জানে না, বলতেও পারে না। সে ম্যানুয়েলদের বাসায় থাকে!

বিজু মনে মনে ভাবে, ম্যানুয়েল ভাগ্যবান। তোর বাবা-মা এখানে স্বেচ্ছা-উদ্বাস্তুর বেশি কিছু নয়, ফুলটুস। তারা তাদের শেকড় ছিঁড়ে চলে এসেছে, এখানে তাদের বাবা নেই, মা নেই, ভাইবোন নেই। তারাও কারো পুত্রকন্যা, আত্মীয়-পরিজন। কিন্তু তা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয় এই দেশে। এখানে শেকড় গেড়ে তারা স্থিত হবে কি না, তাও ঠিক হয়নি এখনো। এই পরিচয়হীনতার বেদনা, বিচ্ছিন্নতার বিষাদ তোকে কেন, তোর মাকেও কি ঠিক বোঝানো যাবে? সে কি এইসব বিপন্নতা টের পায়? ভাবে?

ফুলটুসকে বলে, আচ্ছা, আমি বুড়োর মেকাপ নিয়ে তোর গ্র্যান্ডপা সেজে গেলে হয়?

সেটা নকল হয়ে যাবে, বাবা। সত্যিকারের তো নয়।

বিজু জানে, এ দেশে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীর ছেলেমেয়েদের কাছে বাবা-মাকে অনেকগুলো ভুমিকায় অভিনয় করতে হয় একই সঙ্গে। বাবা-মা-ভাই-বোন ছাড়া আর কোনো নিকটজনের কোনো অস্তিত্ব তাদের কাছে নেই।

মামা, চাচা, ফুপু, খালা এই ধরনের কিছু সম্পর্কের ধারণা আছে তাদের, জানে না সেগুলো সত্যিকারের কি না, তারা ঠিক কারা। মাঝেমধ্যে ছবিতে হয়তো দেখে, দেশে গেলে দেখাশোনা হয় কিছুদিনের জন্যে। তাতে কি কিছু স্পষ্ট হয়? সম্পর্ক, আত্মীয়তা তৈরি হয়?

খালা বা ফুপুর কাছে যে স্নেহচুম্বনটি তাদের পাওনা, সেটি আসে মায়ের কাছ থেকে। অনুপস্থিত দাদীর হয়ে গল্প বলার দায়িত্ব হয়তো বাবার। আসলের স্বাদ-গন্ধ-বচন তবু অধরা থেকে যায়।

তুমি দাদু সাজতে পারো, কিন্তু তুমি তো দাদু নও!

ফুলটুসের ঘরে ফিরে বিজু ফোল্ডারটা ঢুকিয়ে রাখে ব্যাকপ্যাকে। বিছানার পাশে গিয়ে অভ্যাসবশে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালের ওপর এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দেয়। একটু নড়ে ওঠে ফুলটুস, বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে। বোঝা যায় না। ভাবলে খুব অবাস্তব বোধ হয়, পৃথিবীতে বাবা-মা ছাড়া এই শিশুটি কী নিঃসহায়, নিরবলম্ব।

হঠাৎ কখনো কখনো খুব অদ্ভুত একটা ভাবনা আসে। মনে হয়, কোনো একটা দুর্ঘটনায় সে আর রানু যদি মারা যায়, এমন যে ঘটে না তা নয়, ঘটতেই পারে, এই মেয়েটির কী হবে? কার কাছে যাবে সে? যদিও জন্মসূত্রে এটাই তার দেশ, তবু তার আপনজন কেউ থাকবে না। কার অবলম্বন পাবে সে? কীসের আশ্রয়, কীসের নিরাপত্তা সে রেখে যাচ্ছে মেয়ের জন্যে?

ফুলটুস যখন একমনে টিভিতে কার্টুন দেখে, মাঝে মাঝে বিজু পাশে বসে মেয়ের মুখে অপলক তাকিয়ে থাকে। মেয়ের বিস্ময়ভরা চোখ দেখে, কপাল দেখে, ভুরু-ঠোঁট-চিবুক দেখে আর ভাবে, এই শিশুটির বাবা সে! এই অপরূপ বিস্ময়বোধ যায়ই না!
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×