১৫.১
আগামীকাল ফুলটুসের স্কুলে গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে। কালই তো! গত সপ্তাহে স্কুলের নিউজলেটারে দেখেছিলো, মনে পড়ছে বিজুর।
দিনের শেষ সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে দেয়। রানুকে সে পুরোপুরি বুঝতে পারে, এমন দাবি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বিয়ের আগে-পরে মিলিয়ে পনেরো-ষোলো বছর, একজন মানুষকে জানার জন্যে কি সময়টা যথেষ্ট নয়?
হয়তো যথেষ্ট, হয়তো নয়। কিন্তু নয় কেন? এর মধ্যে বারো বছর একই ছাদের নিচে বসবাস করেছে, এক বিছানা ভাগাভাগি করেছে।
শারীরিক নৈকট্য ও সহাবস্থান হয়তো কিছু সাহায্য করে, কিন্তু রানুর রহস্যময়তা ঠিক ঠিক বোঝা আজও হলো না! এই যে আজ এয়ারপোর্ট থেকে ঘরে ফিরে প্রথম পাওয়া উপেক্ষা, ঠিক তার বিপরীতে বিজুর পছন্দমতো পোশাক ও সজ্জা। স্যুভেনির পেয়ে খুশি হওয়া, তার উল্টোদিকে খাবার গরম করা নিয়ে তীক্ষè বাক্য। মেলে না যে!
টেবিলে বিজুর পছন্দের খাবার সাজিয়ে পাশে এসে বসার পর মনে হতে পারে দিনের শেষে একটি মধুর সমাপ্তি অপেক্ষা করে আছে। অথচ এখন কোনোকিছু না বলে সে ঘুমিয়ে পড়লো, এর ব্যাখ্যা কোথায়? হয়তো ইচ্ছের সঙ্গে মিলিয়ে ঘটনা ঘটে না, ঘটানো যায়ও না। খাবার টেবিলে রানুর বসা নিয়ে বিজুর অস্বস্তি কোনো ভুলে যাওয়া অন্ধকার ঘরে হয়তো অকস্মাৎ আলো ফেলে থাকবে।
উঠে পড়ে বিজু, ভেতরে এসে প্যাটিওর দরজা বন্ধ করে। শোয়ার ঘরে যাওয়ার আগে ফুলটুসের ঘরে ঢোকে। নাইট লাইটের অল্প আলোয় দেখা যায়, উপুড় হয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে সে। নতুন পাওয়া বারবি এক হাতে জড়িয়ে ধরা। একটা চেয়ারের ওপর কাল স্কুলে যাওয়ার সব কাপড়চোপড়। মেয়ে নিজে ঘুমানোর আগে কোনোসময় এই কাজটা করে রাখে। সকালে উঠে তাড়াহুড়োর মধ্যে কী পরবো, কী সঙ্গে নেবো এই নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হতে হয় না।
টেবিলের পাশে স্কুলের ব্যাকপ্যাক রাখা। ব্যাকপ্যাক খুলে টেক-হোম ফোল্ডার বের করে বিজু। ফোল্ডারে স্কুলের প্রতিদিনের এবং আসন্ন কার্যকমের বিবরণ, ক্যালেন্ডারে মাসের বিশেষ দিনগুলো হাইলাইট করা। অভিভাবকরা আগাম জেনে যায়, স্কুলে কবে কী হচ্ছে। এ ঘরে আলো জ্বাললে ফুলটুসের ঘুম ভাঙবে না ঠিকই, কিন্তু চোখে আলো পড়লেই চোখমুখ কোঁচকাবে মেয়ে।
ফোল্ডার হাতে নিয়ে বসার ঘরে আসে বিজু। হ্যাঁ, কাল গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে। ছেলেমেয়েরা তাদের দাদা-দাদী বা নানা-নানীকে কাল স্কুলে নিয়ে যেতে পারবে সঙ্গে করে। ক্লাসে তারা বাচ্চাদের গল্প শোনাবে, একসঙ্গে লাঞ্চ খাবে। ব্যাপারটা খুবই মজার হবে, বিজু আন্দাজ করতে পারে। আচ্ছা, বাংলাদেশে বাচ্চাদের স্কুলগুলোতে এই নিয়মটা নেই কেন? দেশে বাচ্চারা এদের তুলনায় অনেক বেশি দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ন্যাওটা হয়।
ফুলটুস তার গ্র্যান্ডপ্যারেন্টদের কতোটুকু চেনে? সামান্য সময়ের যা দেখা-সাক্ষাত হয়েছে, তার বেশি কিছু নয়। নানীর সঙ্গে ছাড়া ঘুমাবো না জাতের আবদার করার মতো ঘনিষ্ঠতা কখনো তৈরি হয়নি!
স্কুল থেকে খবরটা জেনে ফুলটুস জিজ্ঞেস করেছিলো, বাবা, গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে-তে আমার সঙ্গে কে যাবে? আমার গ্র্যান্ডপ্যারেন্টরা কেউ এখানে থাকে না কেন?
কী উত্তর দেয় বিজু? কীভাবে বললে মেয়েকে বোঝানো যাবে তার দাদা-দাদী বা নানা-নানী কেন এখানে থাকে না। জানে, বোঝানো সম্ভব নয়। তাই হালকা করে বলেছিলো, তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না, সেইজন্যে মনে হয় এখনে থাকতে চায় না।
ফুলটুস মানতে রাজি নয়। বলে, আমার ক্লাসের ম্যানুয়েল-এর গ্র্যান্ডমা স্প্যানিশ ছাড়া কিচ্ছু জানে না, বলতেও পারে না। সে ম্যানুয়েলদের বাসায় থাকে!
বিজু মনে মনে ভাবে, ম্যানুয়েল ভাগ্যবান। তোর বাবা-মা এখানে স্বেচ্ছা-উদ্বাস্তুর বেশি কিছু নয়, ফুলটুস। তারা তাদের শেকড় ছিঁড়ে চলে এসেছে, এখানে তাদের বাবা নেই, মা নেই, ভাইবোন নেই। তারাও কারো পুত্রকন্যা, আত্মীয়-পরিজন। কিন্তু তা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয় এই দেশে। এখানে শেকড় গেড়ে তারা স্থিত হবে কি না, তাও ঠিক হয়নি এখনো। এই পরিচয়হীনতার বেদনা, বিচ্ছিন্নতার বিষাদ তোকে কেন, তোর মাকেও কি ঠিক বোঝানো যাবে? সে কি এইসব বিপন্নতা টের পায়? ভাবে?
ফুলটুসকে বলে, আচ্ছা, আমি বুড়োর মেকাপ নিয়ে তোর গ্র্যান্ডপা সেজে গেলে হয়?
সেটা নকল হয়ে যাবে, বাবা। সত্যিকারের তো নয়।
বিজু জানে, এ দেশে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীর ছেলেমেয়েদের কাছে বাবা-মাকে অনেকগুলো ভুমিকায় অভিনয় করতে হয় একই সঙ্গে। বাবা-মা-ভাই-বোন ছাড়া আর কোনো নিকটজনের কোনো অস্তিত্ব তাদের কাছে নেই।
মামা, চাচা, ফুপু, খালা এই ধরনের কিছু সম্পর্কের ধারণা আছে তাদের, জানে না সেগুলো সত্যিকারের কি না, তারা ঠিক কারা। মাঝেমধ্যে ছবিতে হয়তো দেখে, দেশে গেলে দেখাশোনা হয় কিছুদিনের জন্যে। তাতে কি কিছু স্পষ্ট হয়? সম্পর্ক, আত্মীয়তা তৈরি হয়?
খালা বা ফুপুর কাছে যে স্নেহচুম্বনটি তাদের পাওনা, সেটি আসে মায়ের কাছ থেকে। অনুপস্থিত দাদীর হয়ে গল্প বলার দায়িত্ব হয়তো বাবার। আসলের স্বাদ-গন্ধ-বচন তবু অধরা থেকে যায়।
তুমি দাদু সাজতে পারো, কিন্তু তুমি তো দাদু নও!
ফুলটুসের ঘরে ফিরে বিজু ফোল্ডারটা ঢুকিয়ে রাখে ব্যাকপ্যাকে। বিছানার পাশে গিয়ে অভ্যাসবশে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালের ওপর এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দেয়। একটু নড়ে ওঠে ফুলটুস, বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে। বোঝা যায় না। ভাবলে খুব অবাস্তব বোধ হয়, পৃথিবীতে বাবা-মা ছাড়া এই শিশুটি কী নিঃসহায়, নিরবলম্ব।
হঠাৎ কখনো কখনো খুব অদ্ভুত একটা ভাবনা আসে। মনে হয়, কোনো একটা দুর্ঘটনায় সে আর রানু যদি মারা যায়, এমন যে ঘটে না তা নয়, ঘটতেই পারে, এই মেয়েটির কী হবে? কার কাছে যাবে সে? যদিও জন্মসূত্রে এটাই তার দেশ, তবু তার আপনজন কেউ থাকবে না। কার অবলম্বন পাবে সে? কীসের আশ্রয়, কীসের নিরাপত্তা সে রেখে যাচ্ছে মেয়ের জন্যে?
ফুলটুস যখন একমনে টিভিতে কার্টুন দেখে, মাঝে মাঝে বিজু পাশে বসে মেয়ের মুখে অপলক তাকিয়ে থাকে। মেয়ের বিস্ময়ভরা চোখ দেখে, কপাল দেখে, ভুরু-ঠোঁট-চিবুক দেখে আর ভাবে, এই শিশুটির বাবা সে! এই অপরূপ বিস্ময়বোধ যায়ই না!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




