somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাগানে গোপনে একজন মালী আসে অথবা আসে না

৩০ শে মে, ২০০৬ সকাল ৯:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেকদিন ধরে অবহেলায় পড়েছিলো তাদের বাগান। বাগানের মালিক দুই বন্ধু বহুদিন পর খোঁজ নিতে এসে দেখলেন ছোট ছোট আগাছায় ভরে গেছে বাগানটি তবে আগাছাগুলোর মাঝে কিছু ফুলের গাছ হয়েছে যেগুলো ভারী সুন্দর। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বললো, "নিশ্চয়ই কোনো মালী এখানে আসে এবং এই ফুলগাছগুলোর পরিচর্যা করে"। এ বিষয়ে তারা খোঁজখবর করা শুরু করলো কিন্তু কোনো প্রতিবেশিই এমন খবর দিতে পারলো না যে তারা কাউকে এই বাগানে কখনও কাজ করতে দেখেছে। বন্ধুটি তখন তার মালী যে আসে সেই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিলো, "যখন সব মানুষ ঘুমিয়ে যায় মালীটি নিশ্চয় তখন আসে। সেজন্যই কেউ তাকে দেখতে পায়না"। দ্বিতীয় জনের পাল্টা উত্তর, "না, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই শব্দ শুনতে পেতো। তাছাড়া, কেউ যদি এই ফুলগাছগুলোর যত্ন নিতেই এখানে আসতো, তাহলে সে নিশ্চয়ই আগাছাগুলোও কেঁটে-ছেঁটে রাখতো"।

দ্বিতীয় বন্ধু তার বিশ্বাসে অটল। সে বললো, " দেখো, কীভাবে এগুলো সাজানো। বুঝাই যাচ্ছে এখানে একটি সৌন্দর্যবোধ কাজ করছে এবং এর একটা উদ্দেশ্য আছে। সুতরাং আমি বিশ্বাস করি কেউ একজন আসে। হতে পারে এমন কেউ আসে যাকে নশ্বর চোখে দেখা যায় না। আমি বিশ্বাস করি, যত ভালোভাবে আমরা বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখবো ততো বেশি আমরা এই সত্য সম্পর্কে নিশ্চিত হবো যে কেউ একজন আসে"। তারপর তারা বাগানটিকে ভালোভাবে পরীক্ষা করা শুরুকরলো। কখনও কখনও তারা এমন কিছুর সংস্পর্শে আসলো যা ইঙ্গিত করে যে সত্যিই একজন মালী এই বাগানে আসে। কখনও কখনও তারা ঠিক বিপরীত কিছুর প্রমাণ পেলো। আবার কখনও তাদের এমনও মনে হলো যে, যে লোকটি বাগানে চুপিসারে আসে সে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই ঢোকে, সে দুষ্ট লোক। বাগানটিকে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা তো তারাই করলোই। তাছাড়াও একটি বাগানকে ফেলে রাখলে কি ঘটে তা জানার জন্য তারা গবেষণা করতে থাকলো।

এইসব পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে একজন যা জানতে পায় তা আরেকজন শিখে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর গবেষণার শেষে একজন বললো, "আমি এখনও বিশ্বাস করি একজন মালী আসে"। অন্যজন বললো "আমি বিশ্বাস করি না"। তাদের গবেষণায় বাগান সম্পর্কে তাদের পর্যবেক্ষণ একইরকম। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তগুলো ভিন্ন ভিন্ন। প্রাপ্ত তথ্যে উপাত্তে কোনো পার্থক্য ছিল না। এমন কি তারা যদি আরো বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতো তাতেও কোনো পার্থক্য তৈরি হতো না বলেই তারা মনে করে। কিংবা এবিষয়েও তাদের কোনো মতপার্থক্য নেই যে ফেলে রাখলে একটি বাগান দ্রুত অগোছালো ও জংলা হয়ে যায়।

এই পর্যায়ে, এই পতিত বাগান ও তার গাছপালা সম্পর্কে "একজন মালী আসে" বিষয়ক হাইপোথিসিসটি আর গবেষণার বিষয় থাকলো না। একজন হাইপোথিসিসটি মেনে নিচ্ছে এবং অন্যজন মেনে নিচ্ছে না। মজার বিষয় হলো দুজনের কেউই বাগানের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটবে বলে আশা করছে না যা অন্যজন করছে। বাস্তব বিষয়গুলো সম্পর্কে দুজনের ধারণাই একরকম। তাহলে, দু'জনের মধ্যে পার্থক্যটা কী? একজন বলছে, "A gardener comes unseen and unheard. He is manifested only in his works with which we are all familiar".। অন্যজন বলছে, "No, there is no gardener"।

মালী সম্পর্কে তারা যে আলাদা আলাদা কথা বলছে তার উপর ভিত্তি করে বাগানটির সম্পর্কে তাদের অনুভূতি আলাদারকম হয়ে যাচ্ছে। একই তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দু'জন দুইভাবে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাতে বাগানটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটা ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। বাগানের অতীতটিও ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে এই ব্যাখ্যায়। তবে বাগানটির ভবিষ্যত সম্পর্কে তাদের আশা-আকাঙ্খা একইরকম মনে হচ্ছে। দু'জনই চায় আগাছামুক্ত সাজানো-গোছানো একটি বাগান।


উপরের "মালী"-র রূপকটি একটি বিখ্যাত রূপক। জন উইজডম তার ধর্মের দর্শন বইটির শুরু করেছিলেন এই গল্প দিয়ে। এই গল্পটির সারকথা হলো, বিবদমান দুই পক্ষ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় এমন তথ্য-উপাত্ত বিষয়ে আপত্তি তোলে না, এমনকি ভবিষ্যতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কি পাওয়া যেতে পারে তা নিয়েও কোনো বিরোধে লিপ্ত হয় না। বরং একই ধরনের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে তারা ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। উভয়পক্ষই পৃথিবী সম্পর্কে তাদের মনের ভাবকেই কথার মাধ্যমে প্রকাশ করছে। তবে কোনো বক্তব্যে ভাবের প্রকাশ ঘটলেই সেটি যে জগৎ সম্পর্কে সত্য কথা তা বলা যাবে না।

[ এই সাইটে মালী সংক্রান্ত বিতর্ক প্রবল। সুতরাং আপনাদের ভালো লাগবে বলে এই রূপক-গল্পটি তুলে দিলাম। ]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

থাক অহমিকায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


তোমার রঙিন আকাশে নেই
যে অমাবস্যার- অন্ধকার
ঝলমল করছে শুধু চাঁদ-
ডুবছ ডুবছ সুখমারী রাত!
উড়ছ শঙ্খচিলের ডানায়;
তোমার আকাশে অমাবস্যা নাই।

আমি মাটি বন্দি হয়েছি
মরার আগেই- মরার আগেই-
স্বপ্ন দেখি শুধু হুতুম পেঁচা হব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০



বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন[

শেখ মুজিব ইতিহাসের খলনায়ক।
জাতীয় বেইমান।
পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী।
- এই কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন?
তাহলে আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করব- একবার শুধু থামুন।

রাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫

ফারাজা তাবাসসুম খান-
অনেকদিন তোমাকে নিয়ে লিখি না। খুব ব্যস্ত আছি। আমার সব সময় নিয়ে নিচ্ছে অফিস। আমি অফিস থেকে তোমাকে ফোন করলে তুমি কথা বলতে চাও না। আবার আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Mystic River – জোয়ারে ফিরে আসে সবকিছু

লিখেছেন রাজসোহান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩১



১৯৭৫ সালের বোস্টন। শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ পাড়া। রাস্তায় হকি খেলছিল তিনটে বাচ্চা ছেলে। হঠাৎ বল গড়িয়ে পড়ল ড্রেনে। খেলা ওখানেই শেষ। ফুটপাতের একপাশে তখন সদ্য ঢালা ভেজা সিমেন্ট। ছেলেগুলো কাঠি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×