পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে তার ব্যক্তিগত একটা জীবন, যেখানে আনন্দ-বেদনা, ভালোলাগা-ভালোবাসা, বঞ্চনার মতো অনেকগুলো বিষয় জড়িত থাকে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় লেখকই তাদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ঘটনাই তাদের জীবনীতে তুলে ধরেছেন। ফরাসি লেখক জঁ্য জ্যাক রুশো ছাড়াও বেঞ্জামিন ফ্যাঙ্কলিন, বার্ট্রান্ড রাসেল-এর মতো বহু লেখক তাদের জীবনীতে, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক লুকায়িত বিষয়গুলো মেলে ধরেছেন। সেখানে যৌনতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কলম চালানো হয়েছে অবাধে, সে জন্যে তাদেরকে নিজ দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু যখন তসলিমা নাসরিন তার আত্মজীবনীতে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজের কিছু সত্য প্রকাশ করলেন তখন তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্যে লাখো মানুষের স্লোগান আর মিছিলে প্রকম্পিত হয় আকাশ-বাতাস, রাজপথ আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে মিছিল আর মিটিংএ।
তসলিমা নাসরিন তার এক কলামে উল্লেখ করেছেন "বাঙালি পুরুষ লেখকদের অনেকেই গোপনে গোপনে বহু নারীর সঙ্গে প্রেম প্রেম শরীরী খেলা খেলতে কুণ্ঠিত নন, নিজেদের জীবন কাহিনীতে সেসব ঘটনা আলগোছে বাদ দিয়ে গেলেও উপন্যাসের চরিত্রদের দিয়ে সেসব ঘটাতে মোটেও সংকোচ বোধ করেন না"। তাহলে তিনি যখন তার জীবনে ঘটে যাওয়া সেইসব ঘটনা আত্মজীবনীতে প্রকাশ করেন, তখন কেন এত প্রশ্নের তীর তার দিতে তেঁড়ে আসে? আমাদের পুরুষ শাসিত এই সমাজে নারীরা কেবলই ভোগের আর প্রজননের একটা যন্ত্র এর চেয়ে বেশী কিছু নয়, অনেকে নারীদের এর চেয়ে ভালো কোন অবস্থানে দেখতেও নারাজ।
নারীকে যখন ভোগ করা হয়, তখন তাকে নিয়ে দু'চার লাইন কবিতা লিখা, বা গল্প-উপন্যাসে তাদেরকে সেভাবে উপস্থাপন করে, নানা উপমা দেয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই কার্পণ্য করেননি, কিন্তু ভোগের পরই তাদেরকে নিয়ে আর মাথা ঘামানোর সময় থাকেনা। আর নারীরা সে বিষয়ে মুখ খুলতে গেলেই সে হয়ে যায় সমাজের চোখে দুশ্চরিত্রা বা নষ্টা, এটা আমাদেরই নিচু মন-মানসিকতার পরিচয়। যৌনতা লুকানোর মতো কোন বিষয় নয়, প্রত্যেকের জীবনেই যে এর শক্ত ভিত গড়া সেটা আমরা সবাই জানি, সেটা আমরা স্বীকার করি বা না করি, সে ভিন্ন বিষয়।
আমি জানি হয়তো এ নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেকের তোপের মুখেই আমাকে পড়তে হবে, তবুও তাকে নিয়ে কিছু কথা আমার বলার আছে। আমি চেষ্টা করেছি তার কিছু লিখা পড়তে, চেষ্টা করেছি তাকে নিয়ে কিছুটা জানতে। তবে তার ব্যাপারে পুরোপুরি জানাটা বেশ কঠিন, কারণ তাকে নিয়ে তেমন কোন বই, বা সমালোচনা গ্রন্থ এখনো আমার চোখে পড়েনি।
তার আত্মজীবনী মূলক বই "আমার মেয়েবেলা" পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিলো। বইটিতে তিনি তার জীবনের অনেক আলোচিত ঘটনা তুলে ধরেছেন। তার জীবনে অনেক পুরুষের আসা-যাওয়া ছিলো সেটাও তিনি বলতে দ্বিধা করেননি। যা সত্য সেটা চিরকালই সত্য। হতে পারে আমাদের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে, তার অনেক কথা মেনে নেয়া কঠিন, কিন্তু অস্বীকার করার মতোও কোন উপায় নেই। তার বইগুলোকে যদি আপনি যৌন সুরসুরিদায়ক বলে মনে করেন, তাতে কারো বলার কিছু নেই, কিন্তু আমি লিখাগুলোকে একটা সাহিত্যিক কর্ম হিসেবেই মনে করি। বইগুলো তার লিখা এটা তার সাফল্য, ভেতরের কথাগুলোতে যদি যৌন সুরসুরি দেয়া মতো কোন বিষয় লিখে একটা সত্যিকে উপস্থাপন করতে চান সেক্ষেত্রে সেটাকে নিষিদ্ধ করার মতো কারণ আমি দেখিনা। আমাদের সমাজকে এই কুপমুন্ডুকতা, ভন্ডামি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। বাজারে প্রচলিত যৌনতা সম্পর্কিত বই বা চলচ্চিত্রগুলো যখন নিষিদ্ধ করা হয়নি, বা করা হলেও তা প্রকৃত অর্থে সমাজ তাকে বাদ দিতে পারেনি, তখন তসলিমা নাসরিনে'র আত্মজীবনী নিষিদ্ধ করার মতো কি কারণ থাকতে পারে তা আমার জানা নেই।
শেষ করার আগে বলবো আমি কারো পক্ষে বা বিপক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্যে কথাগুলো লিখিনি, বরং সমাজে নারীদের ভূমিকা বা অবস্থান সম্পর্কে একটা ক্ষুদ্র ছবি তুলে ধরতে চেয়েছি। আমাদের সমাজকে এই সব সংঙ্কর্ীনতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। নারীদের চলার পথকে আরো সুগম করে দেয়া উচিত, যাতে তারা পুরুষের পাশাপাশি অবস্থান করে একটা সমাজে তাদের অবদানকে নিশ্চিত করে যেতে পারেন।
বিঃদ্রঃ স্বল্প পরিসরে যে কোন লিখা শেষ করা সত্যিই কঠিন, তবুও চেষ্টা করেছি যতটুকু সম্ভব। ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে আমার এই লিখা সম্পর্কে আপনাদের যে কোন মন্তব্য সাদরে গৃহীত হবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




