রাত বারোটা।
কিছুটা অস্থির আর কম্পিত শরীরে বসে আছে আফরিন।
নুসরাত আফরিন।
অনেক প্রতীক্ষার পর প্রাপ্ত এ রাতটি তার।
অনেক স্বপ্নের সত্যি হওয়ার দিন তার।
কতটা উৎকন্ঠা আর শঙ্কায় কোন রকমে বেচে থাকা স্বপ্নগুলো আজ সত্যি হওয়ার মুখোমুখি এটাও তার কাছে একটা স্বপ্ন।
তাই আনন্দের আসিঞ্চনে তার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে দুগন্ড বেয়ে।
কৃতজ্ঞতায় মাথা অবনত মহান প্রভুর দরবারে।
পরম প্রশান্তি আর প্রাপ্তির ছাপ চোখে মুখে।
জীবনের সবচেয়ে কাঙ্খিত আর মধুময় এ রাতের প্রথম প্রহরে গোলাপ গালিচায় সাজানো এ বাগানের বিছানের ঠিক মধ্যে খানে লাজুক চেহারায় পরম আরাধ্য পুরুষের জন্য অপেক্ষা করছে।আর একটুই তো অপেক্ষা,,,,,এইতো এলো বলে।
ভাবতেই শিহরিত হচ্ছে শরীর মন।হৃদয়ে দুষ্টুমির দোলা খেলে যায়।
যে খুনসুটি গুলো হৃদয়ের মাঝে সযত্নে তুলে রেখেছিল তার আজ বহিঃপ্রকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
ঘরের উজ্জ্বল আলোয় আরো একটি উজ্জ্বল কায়ার প্রবেশের অপেক্ষার প্রহর গুনছে সে।
দরজা খুলতেই পরম আগ্রহ নিয়ে মুখ তুলতেই যা ঘটলো তার জন্য প্রস্তুত ছিলো না সে কোনভাবেই।
এখন কটা বাজে।
এতরাত আমার জন্য বসে থাকতে কে বলেছে তোমায়?
ঘুমাওনি কেন?
এতটা পথ জার্নি করেছো ঘুম আসছে না,নাকি?
বেশ চড়া গলায় কথাগুলা বলে চলেছেন অরুপ হাসান।
এ যেন এক অন্য অপরিচিত রূঢ় অরুপ হাসান।
এমন অরুপের চেহারা কখনোই দেখেনি নুসরাত।
কস্ট পাওয়ার চেয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহব্বল সে।
স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অরুপ কে ডাকে নুসরাত।
অরুপ................
কি হলো?
এমন করছো কেন?
কি করছি আমি?
যা করছি বেশ ভেবে চিন্তে স্বাভাবিক ভাবেই করছি।
কোন সমীকরন মেলানোর চেস্টা করবে না।
শুধু ঘুমাও।
অন্য কোন কথা থাকলে সকালে বলো।
জীবনের সকল চাওয়া পাওয়াকে পূর্নতা এনে দিতেই যে অরুপের প্রতিটি কাজে ছায়ার মত থেকেছে আজ সে দূরে যেতে পারে না।যা্ই হোক না কেন নিজের সমস্ত ছোট ছোট আদুরে চিন্তাগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে এখন অরুপের আদেশটি ই মানতে চায় পুরোপুরিভাবে।কেননা অরুপ এখন তার স্বামী।
অনেক বড়ো এক অধিকার।
কস্টটাকে সহজে মেনে নেওয়ার ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে নুসরাত।গুমরে কেদে উঠছে হৃদয় তার।বুক ভাসিয়ে কাদতে ইচ্ছা করছে।পারছে না কাদতে।পাছে অরুপ আবার অন্য কিছু বলে।
ঘরের ডিম লাইটটা জ্বলছে।
বিছানার এক পাশে কাপড় না বদলেই শুয়ে পড়ে নুসরাত।
তবুও কিছুতেই যে ঘুম আসছে না।
মনের মধ্যে নানা হিসেব নিকেশের ঝড় বইছে।
তবে কি এতদিন চিনতে ভুল করেছে অরুপ কে।
তাতো হবার নয়।
নাকি তার সাথে এতদিন ছল চাতুরী করেছে অরুপ।
বিশ্বাসের উপর দাড়িয়ে এ কথাগুলো সে মানতে চাইছে না কিন্তু অবচেতন মন বলছে হতেও পারে।বড় ভুল করেছিস তুই।
গায়ের শার্টটা আলনায় ছুড়ে মারে অরুপ।
এট্যাচ বাথরুমে ঢুকে ট্যাপটা জোরে ছেড়ে দেই।ঠান্ডা পানিতে নিজের মনকে ঠান্ডা করতে চাইছে সে।
লম্বা একটা গোসল সারে সে।
অবশেষে তার পছন্দের টি সাটটা আর ট্রাউজারটা পড়ে বের হয়ে আসে।
আলতো করে চোখ খুলে দেখার বা বুঝার চেষ্টা করছে নুসরাত অরুপের কর্মকান্ড।
আলনাটা ভালো করে গুছিয়ে রাখে।
ছুড়ে ফেলা শাটটাও গুছিয়ে রাখে।
নিজের প্রিয় ল্যাপটপটি ওপেন করে কি যেন করে।মিনিট দশেক বাদে ল্যাপটপটা বন্ধ করে রেখে দেয়।
জায়নামাযটা বের কেরে আলনা থেকে।
ঘরের ফাকা জায়গায় নুসরাত এর বিপরীতে দাড়িয়ে পড়ে জায়নামাযে।নফল নামায আদায় করে কিছুক্ষণ।সুললিত কন্ঠে ধীরে ধীরে কিন্তু খুব মোহনীয় সুরে অনেকক্ষণ ।
এরপর হঠাতই মোনাজাত করা শুরু করে।
বাচ্চা ছেলের মত কাদতে থাকে।
নুসরাত একটু মুখ তুলে চেয়ে দেখে।ঘটনার আবহময়তা বুঝার চেষ্টা করে।
এ যেন প্রাপ্তির কান্না,কৃতজ্ঞতার কান্না।
মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতার কান্না।
এ যেন জগতের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুটি পেয়েছে সে।তাই আনন্দের আতিশয্যে কাদছে অরুপ।এত মূল্যবান সম্পদটি যে খোদা তাকে দিয়েছেন সেই সম্পদকে ঘিরে আবারো মহান প্রভুর দরবারে আরো কত ফরিয়াদ নিয়ে হাত তুলেছে সে।
যে সম্পদ সে পেয়েছে তার যেন যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে সেই তৌফিক দেন মহান প্রভু ।এ অরুপের আবারো নতুন ফরিয়াদ।
নুসরাতের চিন্তার দোদুল্যমানতা এতক্ষণে কেটে গেছে।মন চাচ্ছে মুনাজাতে অংশ গ্রহণ করে।
কিন্তু না,,,,,,,,,
একটু অভিমান হয়েছে।
অরুপ যদি না ডাকে তাহলে সে যাবে না।
চুপ করে শুয়ে থাকে নুসরাত।
দীর্ঘক্ষণ আগামী দিনটার আলোকিত প্রত্যাশায় খোদার কাছে মোনাজাত শেষ করে।খুব সন্তপনে নুসরাতের পাশে এসে বসে।বুঝার চেষ্টা করে সে ঘুম গেছে কিনা?
নুসরাতের নিপুন অভিনয় দক্ষতার কাছে হার মানে সে।
ঘুমিয়েছে ভেবে উঠে যায় পাশ থেকে।নিজের ব্যাগ থেকে বিয়ের প্রথম রাতে বৌয়ের জন্য কেনা সবচেয়ে প্রিয় উপহারটি পাশে এনে রাখে।
নুসরাতের উপর ঝুকে বসে থাকে অনেকক্ষন।
যেন এক অপ্সরীর ঘুম অবলোকন করছে সে।
ক্লান্তিহীন একটি কায়া যে এতটা সুন্দর হতে পারে .......................কল্পনায় ছিলনা অরুপের।
তাইতো একটি অনাকাঙ্খিত আচরন করেছে সে এরকম রুপ সুধা পান করার জন্য।
মনের বারণ আর মানে না সে।কপালে পরম ভালবাসা আর মমতায় একটা চুমো একে দেয় সে।
নুসরাত চুপচাপ সব বুঝার চেস্টা করলেও আর পারে না।এবার চোখ মেলে তাকায়।
অরুপ মুখের উপর হাত দিয়ে তাকে চুপ থাকতে বলে।এরপর নিজেই শুয়া থেকে বসিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে কাদতে থাকে।নুসরাত এর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে আসে।
ঠিক সামনে বসিয়ে অরুপ বলে জানো আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি.......................তাই এরুপ খারাপ আচরণ করায় সত্যিই দুঃখিত।আমাকে ক্ষমা করে দাও সোনা।আর কক্ষনো হবে না।
তুমি আমার সাথে এমন করলা কেন?আর কক্ষনো করবে না,বলো?
বলেই অরুপকে জড়িয়ে কাদতে থাকে নুসরাত।
আর জীবনের পরম পাওয়া ধন কে নিয়েই সামনের জীবনে এগিয়ে যাওয়া,আর পাশাপাশি পথ চলার অঙ্গিকার নিয়েই প্রথম উপহারটি তুলে দেয় নুসরাতের হাতে।
উপহারটি পেয়ে নুসরাতের কান্না আরো বেড়ে যাই।আনন্দ নাকি কস্ট নাকি অন্য কোন আবেশে সে বুঝতে পারে না।
বুঝতে পারে না অরুপও।শুধু অপলক তার প্রিয়তমার দিকে চেয়ে থাকে............................................................................................................................................
.
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১৬ রাত ২:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


