
সিন্ডারেল্যা হচ্ছে আর্ন থম্পসন এর ক্ল্যাসিকধর্মী এক নির্যাতিত নায়িকা চরিত্র । এই কাহিনীটি শুরু হয়েছিল রোডোপিস নামে এক গ্রীক ক্রীতদাসীকে উপজীব্য করে । মিসরের রাজার সাথে তার বিয়ে হয়েছিল । পৃথিবীতে প্রচলিত অনেকগুলো সিন্ডারেল্যা গল্পের মধ্যে এটি সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বলে পরিচিত । এই গল্পটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে ।
খৃষ্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে গ্রীক ভূতত্ত্ববিদ স্ট্র্যাবো-র জিওগ্রাফিকা (বুক ১৭, ৩৩) গ্রন্থে গ্রীক ক্রীতদাসীর গল্প ‘রোডোপিস’ ( Rosey Eyes ) এর কাহিনীটি পাওয়া যায়, যে প্রাচীন মিসরের নৌকরেটিস শহরে বাস করত । রোডোপিস এর কাহিনীটি ছিল খুবই আকর্ষণীয় । একদিন সে যখন স্নান করছিল হঠাৎ একটি ঈগল ছোঁ মেরে তার একখানি চপ্পল নিয়ে ফারাও রাজা মেম্ফিসের দিকে উড়ে গেল । মেম্ফিস তখন উম্মুক্ত স্থানে বিচার কার্য নিয়ে বসেছিলেন । ঈগলটি এসে তাঁর মাথার উপর বসল এবং চপ্পলটি রাজার কোলে ফেলে দিল । রাজা এই অদ্ভুত ঘটনা ও সুন্দর চপ্পলটি দেখে উপস্থিত সবার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকালেন । তিনি তৎক্ষনাৎ রাজ্যের সর্বত্র লোক পাঠালেন এই চপ্পলটি কোন নারীর তা অনুসন্ধানের জন্যে । অনেক খুঁজাখুঁজির পর নৌকরেটিশ শহরে রোডোপিসকে খুঁজে পাওয়া গেল এবং চপ্পলটি যে তার সে ব্যাপারে নিশ্চিত হল । রোডোপিসকে রাজা মেম্পিসের কাছে নিয়ে আসা হলে এবং রাজা তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন ।
খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে স্ট্র্যাবোর পূর্বে হেরোডোটাস তার গল্পে রোডোপিস এর বাস্তব জীবন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানিয়েছিলেন । তিনি লিখেছিলেন, রোডোপিস থ্রাস থেকে এসেছিল এবং সামোসে ল্যাডমন এর দাসী ছিল । এটি ছিল প্রখ্যাত গল্প কথক ঈশপের গল্পের সমতুল্য । ফারাও রাজা আমেসিস এর সময়ে তাকে দাসী হিসেবে মিসরে আনা হয়েছিল । গীতিকবি স্যাপ্পো এর ভাই চ্যারাক্সাস কর্তৃক মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে রোডোপিস মুক্ত হয়েছিল ।
প্রাচীন সময়ে সিন্ডারেল্যা থিম নিয়ে রচিত গল্পগুলোর মধ্যে রোমান লেখক এলিয়ানের (১৭৫ খৃঃ – ২৩৫ খৃঃ) গল্পটি ছিল বেশ জনপ্রিয় । তাঁর গল্পটি ছিল কর্ডেলিয়া গল্পের অনুরূপ । কর্ডেলিয়া গল্পের রচয়িতা ছিলেন মোনমাউথ । ল্যাটিন ভাষায় রচিত তাঁর দ্যা হিষ্ট্রি অফ দ্যা কিং অফ ব্রিটানিকা (Historia Regum Britanniae) গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে । বৃটেনের সম্মানিত রাজা লেয়ার এর তিন কন্যার মধ্যে কর্ডেলিয়া ছিল সবচেয়ে ছোট । সে তার অপরাপর বোনের মত মিথ্যা ও চাটুকারিতা দ্বারা পিতাকে প্রভাবিত করত না । রাজা বড় দুই মেয়ের মধ্যে রাজ্য ভাগ করে দিয়েছিলেন এবং কর্ডেলিয়াকে বঞ্চিত করে ত্যাগ করেছিলেন । ফ্রাঙ্কের রাজা আগানিপ্পাসকে কর্ডেলিয়া ভালোবাসত এবং তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় । তারা উভয়ে পালিয়ে গিয়ে একটি সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিল । কর্ডেলিয়া তার বোনদের ভুলে গিয়েছিল যারা পিতার সাথে প্রতারণা করত । শেষ পর্যন্ত কর্ডেলিয়া বৃটেনের মহামান্য রানীর আসন অলংকৃত করেছিল । কিন্তু তার রাজত্বকাল মাত্র পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল । শেক্সপীয়ারের কিং লেয়ার কাহিনীতে এই গল্পটির উল্লেখ পাওয়া যায় । তবে হ্যাপি এন্ডিং নয়, বিয়োগান্তক সমাপ্তি টেনেছেন তিনি ।
আরও একটি সিন্ডারেল্যা গল্পের কথা জানা যায় । ৮৬০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ দুয়াং চেংশী এই গল্পটি রচনা করেন । তিনি ইউয়াং শহর থেকে মানব ফসিলের বিভিন্ন টুকরো থেকে গল্পের ই যিয়াং কে রূপ দান করেন । সে ছিল কঠোর পরিশ্রমী এবং চমৎকার এক বালিকা যে একটি মাছকে সাহায্য করেছিল যাতে তার মায়ের পুনর্জন্ম হয় । তার সৎমা ও বোনেরা মিলে তার মাকে হত্যা করেছিল । যিয়ান তার মায়ের হাড় সংরক্ষণ করেছিল, আসলে এটা ছিল একটা কৌশল । সে একটি উৎসবের জন্য উপযুক্ত পোষাকের ব্যাপারে এই হাড় থেকে সাহায্য পেয়েছিল । যখন সে তার একটি চপ্পল হারিয়েছিল, এরপর তার সৎমাতা ও বোনেরা তাকে চিনতে পেরেছিল । রাজা তার চপ্পলটি খুঁজে পেয়েছিল এবং তাকে প্রথম স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে । আসলে রাজা তাকে তার নিষ্ঠুর সৎমাতা থেকে রক্ষা করেছিল ।
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়শিয়ার গল্পটি দুইজন বালিকাকে নিয়ে । তাদের নাম ছিল বাওয়াং মেরাহ ( Red Onion ) এবং বাওয়াং পুটিহ ( White Onion ) অর্থাৎ পিঁয়াজ ও রসূন । এই দুই দেশের মধ্যে একই গল্প প্রচলিত থাকলেও বালিকাদ্বয়ের মধ্যে সত্যিকার সম্পর্ক ও মূল চারিত্রিক পার্থক্য ছিল । তবে গল্পের পটভূমিতে ছিল চমৎকার সাদৃশ্য । উভয় গল্পে ছিল ঐন্দ্রজালিক মাছ, পরীরানী ও তার কন্যা যে শত্রুদের আগুনে সিদ্ধ করত । নায়িকা তাদের হাড়গুলো খুঁজে পায় এবং তা কবরস্থ করলে কবরের উপর দিয়ে ঐন্দ্রজালিক বাতাস প্রবাহিত হতে থাকে । নায়িকা ঐন্দ্রজালিক বাতাসের উপর দোল খেতে খেতে গান গাইতে থাকলে তার গান সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় যুবরাজ শুনতে পায় । ঐন্দ্রজালিক বাতাস ছিল চপ্পলের একটি পরীক্ষা, যা নায়িকাকে তার শয়তান বোন থেকে বিমুক্ত করেছিল । পরিশেষে যুবরাজ নায়িকার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় ।
ভিয়েতনামের গল্পটি ট্যাম ক্যাম কে উপজীব্য করে রচিত হয়েছিল । ট্যাম তার পিতা ও পিতার রক্ষিতা এবং তার মেয়ে দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিল । তার বৈমাত্রেয় মাতা দ্বারা অন্যায় ভাবে প্ররোচিত হয়ে তারা একটি মৎস শিকারের বাজীতে জিতে ট্যামের জন্মাধিকার চুরি করেছিল । তার বৈমাত্রেয় পরিবার মাছটি হত্যা করে খেয়ে ফেলেছিল এবং এর কাঁটাগুলো পরিবেশন করা হয়েছিল তার অভিবাবক ও নিরাপত্তার জন্যে । পরিশেষে একটি উৎসবে ট্যাম রাজার মর্যাদা সম্পন্ন স্ত্রীতে পরিণত হয় । যাহোক কাহিনীর দ্বিতীয় অংশে এই মহান চরিত্রটি প্রতিশোধ পরায়ণের দিকে মোড় নেয় । তার বৈমাত্রেয় বোনকে জীবন্ত সিদ্ধ করে সেই মাংস তার কুটিনী বৈমাত্রেয় মাতাকে ভক্ষণ করানো হয় ।
কোরিয়ান গল্পটির নাম ছিল কোংজি ও পাতজ্জি । এই গল্পটির মূল চরিত্র হচ্ছে রাজকন্যা কোংজি । সে তার বৈমাত্রেয় মাতা ও বৈমাত্রেয় বোন পাতজ্জি দ্বারা সর্বদা নির্যাতিত হত । রাজার বলনৃত্যের সময় বৈমাত্রেয় পরিবার তাকে বাধ্য করত ঘরে আবদ্ধ থাকতে । সে সময়ে একটি পরীর আগমন ঘটে । পরী কোংজিকে একটি চমৎকার পোষাক দিয়েছিল যা অন্য সবার চেয়ে ছিল আলাদা । এর ফলে তার প্রতি রাজার স্নেহ জাগ্রত হয়েছিল । গল্পটি আরও এগিয়েছে কোংজি কর্তৃক পাতজ্জিকে নদীতে ডুবিয়ে মারার মধ্য দিয়ে । এভাবে কোংজি রাজার সাথে বসবাস করার জন্য পাতজ্জি থেকে মুক্ত হয়েছিল । পরে রাজা পাতজ্জিকে মৃত অবস্থায় খুঁজে পান ।
এ জাতিয় আরও ভিন্ন ভিন্ন গল্পের রূপ পাওয়া যায় মধ্যযুগের ‘এক হাজার এবং এক রাত্রি’ গ্রন্থে । ‘আরব্য রজনি’, ‘দ্বিতীয় শায়খের গল্প’, ‘বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার গল্প’ ও ‘আবদুল্লাহ ইবনে ফাদী এবং তার ভাইগণ’ প্রভৃতি গল্পের থিম ঈর্ষাপরায়ণ বড় দুই বোন কর্তৃক ছোট বোনের নির্যাতিত হওয়ার কাহিনী । এসব গল্প কিছু ছিল বোন কেন্দ্রিক এবং কিছু ভাই কেন্দ্রিক । এরকম একটি গল্প হচ্ছে ‘জুদার ও তার ভাইগণ’ । পূর্বের গল্পের মত এই গল্পটি হ্যাপি এন্ডিং এর অংশ হতে পারত । কিন্তু বড় ভাইদের দ্বারা বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে ছোট ভাইকে হত্যা করে এক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে এই গল্পটির সমাপ্তি হয়েছে ।
সিন্ডারেল্যা বা একটি ছোট কাঁচের চপ্পল গল্পটি ইউরোপিয়ান লোক-কাহিনীতে এক নির্যাতিত নারীর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে । এই গল্পটির ভিন্ন ভিন্ন নামে আরও কয়েকটি ইউরোপিয়ান সংস্করণ দেখা যায় । ফরাসি ভাষায় গল্পটির নাম Cendrillon ou La Petite Pantoufle de verre, জার্মান নাম Aschenputtel, ইতালিয়ান নাম Cenerentola , রাশিয়ান নাম Zolushka, প্রভৃতি । ১৬৩৪ খৃষ্টাব্দে রচিত Giambattista Basile এর Pentamerone , ১৬৯৭ খৃষ্টাব্দে রচিত Charles Perrault এর Historis ou contes du temps passe এবং ১৮১২ খৃষ্টাব্দে রচিত ব্রাদার্স গ্রিম এর লোকগল্পের সংকলন ‘গ্রিমের পরীর গল্প’-তে সিন্ডারেল্যা গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায় ।
যদিও সিন্ডারেল্যা গল্পটির নাম ও চরিত্র বিভিন্ন ভাষায় পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু ইংরেজি ভাষার লোক-কাহিনীতে সিন্ডারেল্যা আজও একটি ধ্রপদী নাম হিসেবে পরিচিত । সিন্ডারেল্যা নামের সাথে সমান্তরাল ভাবে উঠে আসে কিছু অবমুল্যায়িত অবদান, অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির স্বীকৃতি বা সাফল্য এবং নির্যাতিত ও অবহেলিত সময়ের চিত্র । জনপ্রিয় সিন্ডারেল্যা গল্পটি আজও আন্তর্জাতিক ভাবে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ধারা বজায় রেখেছে বিভিন্ন মিডিয়াতে । হলিওডে সিন্ডারেল্যা গল্প নিয়ে ছবিও নির্মিত হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


