লিখিত ইতিহাসের বয়স খুব বেশি না। বাঙলা, বঙ, বং, ,বাঙালা, কিংবা বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের আদি ইতিহাস তাই খুবই অস্পষ্ট। সিন্ধু সভ্যতাকে এই অঞ্চলের আদি সভ্যতা বলা হয়। সেই অর্থে দ্রাবিড় জাতি হল এই অঞ্চলের আদি জাতি। সিন্ধু সভ্যতার পতন ঘটিয়ে আর্য নামক এক যাযাবর জাতি এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করে আর এক নতুন সভ্যতা গড়ে তোলে। তবে এই মতবাদকে আধুনিক বিজ্ঞানীরা মানতে চায় না। কারণ বাইবেল মতে যিশুর জন্মের মাত্র ৪০০০ বছর আগে পৃথিবীর সৃষ্টি আর বেদ মতে আর্যরা এই অঞ্চলে আসে ১৫০০ বছর আগে। তারপর তারা বেদ রজনা করে। অথচ ঋগবেদে যে স্বরস্বতী নামক খরস্রোতা নদীর কথা বলা হয়েছে, সেটা যিশুর জন্মের ৪০০০ বছর পূর্বে শুকিয়ে যায়। পাকিস্তানের বেলুকিস্তানে প্রায় ৯৫০০ বছর আগের কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে। এটাকে অস্ট্রিক জাতি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর তারা সভ্য জাতি ছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই অর্থে এরা হল এই অঞ্চলের আদি জাতি। কারণ অসিট্রকরা দ্রাবিড়দের আগের জাতি।
যায় হোক, অস্ট্রিক আর দ্রাবিড়রা হল এই অঞ্চলের আদি জাতি। কোল, মূণ্ডা, সাওঁতাল ইত্যাদি হল এই জাতির অবশিষ্ট অংশ। আর তাদের বিতাড়িত করে এই অঞ্চলে আসে আর্য নামক এক যাযাবর জাতি যারা নাকি বেদ নামক এক উচ্চ সাহিত্য সম্পন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করে! ক্রমে এখানে গড়ে উঠে মগধ রাজ্য, তারপর শিশুনাংশ এবং নন্দ বংশ। এরপর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বংশের পত্তন করলে সেটা এক সময় এই ভূখণ্ড দখল করে। মৌর্য বংশের পর গুপ্ত বংশ এই এলাকা শাসন করে। এরপর কিছুকাল চরম অরাজকতার পর শশাঙ্ক নামক এক বীর নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তারপর পাল রাজারা প্রায় ৪০০ বছর দেশ চালায়। তারপর আবার সেনরা এই অঞ্চল দখল করে। এরপর বখতিয়ার খলজি এই অঞ্চল দখল করে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা করেন। এরপর মোঘল তারপর ইংরেজরা এই অঞ্চল শাসন করে। আর সবশেষ পাকিস্তানিদের হটিয়ে আমরা আমাদের প্রায় ৮০০ বছরের পুরানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করি।
পাঠকদের মনে হতে পারে আমি যাযাবর আর্য আর ইরানী বংশদূত নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কেন বিদেশীদের কাতারে রাখলাম। এখন আর্য জাতিকে বাদ দিয়ে স্বতন্ত্র বাঙালি জাতির চিন্তা করাও ভুল হবে। ঋগবেদে অনেক হিংস্র প্রণীর কথা থাকলেও বাঘের কথা লিখা ছিল না। কারণ বাঘ ভারতের পূর্ব অংশে বসবাস করত। এর অর্থ হল আর্যরা তখনো এই অঞ্চলে এসেছিল না। তখন এই অঞ্চলে অন্যরা বসবাস করত। তাই আগের দিনের কথা আসলে আর্যকে আলাদা করে দেখার সাহস আমি দেখাতেই পারি। আর সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার শেষ নবাব বলা হলেও তিনি মূলত মোঘল সম্রাজ্যের অংশ ছিলেন। সে সময় মোঘল সম্রাজ্য দূর্বল হয়ে পরলে সুবার শাসনকর্তারা নিজেদের স্বাধীন ভাবতে থাকেন। তবে আমিও এই ব্যাপারে একমত যে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে এই জনপদের মানুষ সত্যিই বিপদে পরে।
১৯৪৭ সালে ইংরেজরা যখন এই জনপদের লোকের কাছে ক্ষমতা হসতান্তর করে তখন সবাই মনে করেছিল এবার তারা কাঙ্খিত স্বাধীনতার স্বাদ পেল। বাঙালি নামক পাখিটি খাঁচা থেকে মুক্ত হবার পর উড়তে গিয়ে দেখল তার পাখা কেটে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজরা এ দেশের মানুষের কাছ থেকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হনন করেছিল। পাকিস্তানিরা প্রথমে আমাদের ওপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালায়। দেশের ৫৬ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হবার পরেও তারা বাংলাকে মেনে নিতে পারেনি। তারা এই দেশের মানুষের মনের কথা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই দেশের স্বাধীকার রক্ষার আন্দোলনে প্রথম থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন শত বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মজিবুর রহমান। তিনি সেদিন মানুষের মনের অব্যক্ত কথা বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই সকলে মিলে পাকিস্তানিদের এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করেছিল। রক্ত ঝরেছিল অনেক, অনেকে ভাষা শহীদদের নষ্ট বলেছিল। কিন্তু চূরান্ত বিজয় হয়েছিল রফিক, বরকত, জব্বারদেরই। যুক্তফ্রন্ট, শিক্ষা কমিশন বাতিল, ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর আন্দোলন সবই ছিল এই দেশের স্বাধীকার রক্ষার আন্দোলন। এরপর ১৯৭১ সালে শেখ মজিবুর রহমান এ দেশের মানুষের মনের অব্যক্ত কথা অনুধাবন করে ৭ মার্চ পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন।
তারপরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা আছে। তিনি কারাগারে বন্ধ থাকলেও দেশের জনগণ সেদিন দেশকে মুক্ত করে ছেড়েছিল। যদিও জানা মতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন না। তবে কেউ যদি মনে করে বাঙালি সেদিন শেখ মুজিবকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করেছির তাহলে সে ভুল করবে। বাঙালি তার নিজের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল। শেখ মুজিবকে ভালবাসলেও সেটা নিজের স্বাধীনাতার থেকে বড় ছিল না। আর পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতার থেকে আর বড় হিছু হতেও পারে না। এটা কারো বেলায় হয়নি। এটা শুধু শেষ রাসূল (সাঃ)-এর বেলায় হয়েছিল। তাঁর সাহাবীরা তাঁকে নিজের স্বাধীনতার চেয়েও বড় কিছু মনে করতেন। বাঙালিরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সামাজিক আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল। অথচ স্বাধীন দেশে তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। ভঙ্গুর অর্থনীতি আরো ভঙ্গুর হতে থাকে। বাকশাক নামক এক পদ্ধতি প্রণয়ন করে এই দেশের মানুষকে আবার শৃঙ্খলিত করার প্রয়াস করা হয়। বঙ্গবন্ধু এবার বাঙালির মনের কথা বুঝতে ব্যর্থ হন। তার মাশুল তাঁকে দিতে হয়েছিল। ১৯৯০ সালের পর বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাধ্যমে এ দেশে গণতন্ত্র একটা নতুন মাত্রা পায়। কিন্তু মাত্র ২৩ বছরের মাথায় বিকশিত গণতন্ত্র আবার শৃঙ্খলিত হতে চলেছে। শেখ হাসিনা আবার তাঁর বাবার পথে হাটঁছেন। তিনি নিজেকে খুব শক্তিশালী ভাবছেন। আমার উনার কাছে প্রশ্ন হল উনি কি বঙ্গবন্ধুরর চেয়েও পাকা রাজনীতিবিদ? আর বর্তমান আওয়ামী লীগ কি ১৯৭৫-এর চেয়েও বেশি শক্তিশালী? যদি তিনি না হন তাহলে তিনি কিসের আশায় ক্ষমতা চিরস্থাযী করতে চাচ্ছেন? এর আগে বিএনপি এই একই কাজ করেছিল আর তার ফলাফল ভাল হয়েছিল না। আজ আওয়ামী লীগ যা করছে তাও ভাল হবে না। তবে সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে দেশের মানুষের। তাই একথায় বলতে গেলে আমরা ন্বাদীনতা পেয়েছি তবে সেটা হল “শৃঙ্খলিত স্বাধীনতা”।
১৪০০ বছর আগে রাজা শশাঙ্ক যে স্বাধীনতার বীজ বুনেছিলেন, তা আজও পুরপুরি বিকশিত হয়নি। আর ১২০০ বছর আগে এ দেশের মানুষ গোপাল নামক এক সাধারণ মানুষের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা দিয়ে যে রাজনৈতিক সমঝোতার সূচনা করেছিল, আজও সেই চর্চা বাঙালি রপ্ত করতে পারেনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



