somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যাদুর আয়না (উপন্যাস) - ১০ম (শেষ) র্পব

২৭ শে জুন, ২০১৪ রাত ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাসমত যে রাতের আঁধারে তার নেমকহারাম আত্মাটাকে দেখে এসেছে এ খবর মফিজের জানা নেই। কিন্তু সেই একই চিন্তা তার মাথায়ও ঘুরপাক খাচ্ছে। এক গোয়ালের গরু বলে কথা! জনতার দাবীর কাছে মাথা নোয়ানোর বিকল্প নেই। মফিজ আর কোন উপায় দেখতে পাচ্ছে না। তার ধারনা, আয়নার সামনে দাড়ানোই লাগবে। সে আগে একবার গিয়ে দেখতে চায় যাতে করে তাকে ঘাবড়াতে না হয়! এছাড়া উল্টোপাল্টা বা এদিক সে দিক কিছু করতে হলে আয়নাটা একটু দেখে রাখা দরকার।

আজ শেষ রাতে সে তার সেক্রেটারি সহ হাজির। এখন সে দাড়িয়ে নিউমার্কেটে। কেউ যেন তাকে চিনতে না পারে এজন্য সে মুখোশ পরে নিয়েছে। হেটে সে এগিয়ে আসছে আয়নার কাছে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে ভয়ে শিউরে উঠল সে। চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। চোখ দুটো তার কুত কুতে কালো। শরীরটা জীর্ণ। সিগারেট সে দিনে গোটা ত্রিশ খায় - ‘কিন্তু তাই বলে’ মনে তার বিস্ময়, ‘আমি কি এত খারাপ’? চেহারাটা লাগছে তার পিশাচের মতো। মনটা তার খারাপ হয়ে গেল। কত মানুষের উপকারও তো সে করেছে! সেগুলা আয়নায় আইল না ক্যান? ধনী হবার লোভ তার আছে। ক্ষমতার যাদু দ-ও তার চাই। তাই বলে অন্যের সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার চিন্তা কি সে করে? নিজের গোপন মনের মুখোমুখি দাড়িয়ে আজ সে বিব্রত। কিংকর্তব্য বিমূঢ়। তার থেকে বেশি হতাশ এই মুহুর্তে আর কেউ নয়।


তার সেক্রেটারি তাকে সান্ত¡না দিতে চাইছে। স্যার, এ কিছু না! অন্য সময় হলে সেক্রেটারিকে সে ব্যঙ্গ করত। রসিকতাও সে করে মাঝে মধ্যে। কিন্তু ব্যঙ্গ বা রসিকতা কোন কিছুতে মন লাগল না তার। নিজের সম্বন্ধে তার একটা উঁচু ধারনা ছিল। ‘পরোপকারী’ বলে তার যে একটা সুনাম আছে তাহলে সেটা কি মিথ্যে? নিজের মনে ঘোরতর ভাবনা তার। সে কিছুতে মনে করতে পারছে না যে দশ জনের ক্ষতি করে দু’জনের ভালো করেছে সে। যাই হোক, নিজের সম্পর্কে করা উঁচু ধারনাটা তার হোঁচট খেল। সেক্রেটারি তাকে ধরে নিউমার্কেটের বাইরে নিয়ে এল। গাড়ির ড্রাইভার মফিজের মুখোশ পরা মুখ দেখে অবাক। বিষয়টা তার কাছে অদ্ভুত বলে মনে হলো। সেক্রেটারি তাকে তুলে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলো। স্যার, মুখোশটা খোলেন। আলো বাতাস পাবেন। আপনার ভালো লাগবে। মফিজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, আর ভালো! মুখোশ খুলল সে। এখন বুকভরা হতাশা তার!

মনাকে নিয়ে খবর বের হয়েছে কয়েকাটা দৈনিক পত্রিকায়। খবরটা পড়ে অনেকে অবাক। অনেকে আবার বোঝার চেষ্টা করছে, ব্যাপারটা কি? মানুষের মনে সন্দেহ, ঘটনা অন্যখাতে প্রবাহিত করার প্লান নাতো! যে যাই ভাবুক জনমত এখনো আগের মতো অটুট আছে। যাদুর আয়নায় চেহারা দেখে তবে দেব ভোট।

ঘটনা যাই ঘটুক আসছে সপ্তাহে মানুষ মেয়র পদপ্রার্থীদের আয়নার সামনে দেখতে চায়। এ জন্য একটা ছুটির দিন পছন্দ তাদের। এতে ধনী দারিদ্র নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সরাসরি দেখার সুযোগ পাবে। শুধু মুখের চেহারা দেখে মানুষ চেনা যায়না। কেবল বাইরেটা দেখে গরু বাঘ বা মহিষ গাধা চেনা যায়। কিন্তু মানুষ? তার মনটা না জানলে তাকে জানাই হলোনা।

মেয়র পদপ্রার্থীরা রাজি এতে। হাসমত এক কথাতে রাজি। তবে তার শর্ত হলো যে সে আসবে সবার আগে এবং সেদিন সাধারণ জনগণ যাদুর আয়নায় নিজেদের দেখতে পারবেনা। পারবে, হাসমত বললেন, নেতাদের দেখা শেষ হলে পরে।

আজ সরকারি ছুটির দিন। আজ সকাল থেকে নিউমার্কেট লোকে লোকারণ্য। আয়নার কাছাকাছি এসে আসন নিয়েছেন কিছু সংখ্যক সচেতন নাগরিক। আয়নাটার সামনে তৈরি করা হয়েছে একটা গেট। গেটটি ফুল মালায় সজ্জিত।

‘হাসমত ভাই জিন্দাবান্দ’ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তার দলবল সহ হাসমত ঢুকে পড়েছে মার্কেটের ভিতর। সাংবাদিকেরা দাড়িয়ে সব। নিরাপত্তারক্ষীরাও আছে। ‘হাসমত ভাই’ ফুলের মালা গলায় দিয়ে ধোপ দুরস্ত সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে হাজির। আবারও ধ্বনিত হচ্ছে, হাসমত ভাই জিন্দাবাদ। হাসমত একপা দু’পা করে এগোলেন। ফুল মালায় সজ্জিত গেটটা পেরচ্ছেন তিনি। সবার হৃৎকম্পন বেড়ে গেছে। সাংবাদিকেরা সব প্রস্তুত ক্যামেরা নিয়ে। সচেতন নাগরিকেরা দিচ্ছেন তাদের সতর্ক দৃষ্টি। আয়নায় সামনে এখন হাসমত। আয়নায় ফুটে উঠল অবিকল আরেক হাসমত। সকালে বিউটি পার্লারে গিয়ে তিনি যে আরও সুন্দর হয়ে উঠেছেন সেই সৌন্দর্যও প্রতিফলিত এখন আয়নায়। চারদিক মথিত করে ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে -

হাসমত ভাই জিন্দাবাদ
মেহনতি মানুষ জিন্দাবাদ
নগরিকদের জ- অ- য়।

উপস্থিত জনতার মনে অনেক আশা ছিল যে তারা মেয়র পদ প্রার্থীদের মনের বক্রতা নিজ চোখে দেখবেন। তারা তা দেখতে পেলেন না। তবে যা দেখলেন তাও তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। হাসমত বিজয়ীর বেশে মুর্হুমুহু করতালি আর জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে নিউমার্কেট ত্যাগ করছেন। তার কর্মীরা, অনুসারীরা হাসমত ভাই আর গণতন্ত্রের জয়গান করছে। দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ছে তাদের ধ্বনি-

জনগনের নেতা
হাসমত! হাসমত!
নগরের পিতা-
হবেই হবে
হাসমত! হাসমত!

যে সব মানুষ হাসমতের কারনে কখনো না কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ সকাল তাদের বিষাদের। জনকল্যাণের ইচ্ছায় ব্যাকুল যেসব মানুষ সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক, আরও অনেকে মন তাদের দুঃখে কালো। যাদুর আয়নাটা তাদের একজন ন্যায় পরায়ণ নেতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এখন সব বেকার।

হতাশ সমাবেশ ভেঙে যেতে শুরু করেছে। সাংবাদিক অমিয় কী লিখবে ভেবে পাচ্ছে না। একপাশে একটা দোকানের গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়েছে সে। এইভাবে সে বসে থাকল আরও কিছুক্ষণ। এখন কেউ নেই আর। আয়নাটার প্রতি মানুষের অনুরাগ বা কৌতূহল যেন সব শেষ। একাকী বিধ্বস্ত অমিয় ঠাঁই দাঁড়িয়ে এখন আয়নার সামনে। পিছনে তার মনা। কখন যে সে এসে দাড়িয়েছে অমিয় খেয়াল করেনি। হঠাৎ খেয়াল হলো মনার, আয়নার অমিয়র অবিকল চেহারা ফুটে উঠেছে যেটা হওয়ার কথা নয়। আবার ভালো করে লক্ষ্য করল মনা। না, ঠিক আছে। আয়নাটা কাজ করছেনা। সে ভালোভাবে আয়নাটা দেখল। সেই সব এক। ফ্রেম। কাঠ। উচ্চতা। আয়তন। কিন্তু কাচটা আলাদা। সে উত্তেজিত হয়ে উঠল, এতো সে আয়না না। এইডা তো যে- কোন আয়না। এতো যাদুর আয়না না। আমাদের সে যাদুর আয়না কই? এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে অমিয়। এটা যে যাদুর আয়না না তা বোঝার জন্য মনা আশপাশ থেকে কয়েকজনকে ডেকে আনল। সবাই দেখল যে যাদুর আয়নায় তাদের যেমন দেখাত তা একেবারে আলাদা। সবার মনে প্রশ্ন। সবার মনে বিস্ময়।

অমিয় জিজ্ঞেস করল মনাকে, তুই তো সব সময় নিউমার্কেটে থাকিস তুই জানিস কাজটা কে করল? আমি কেমনে কমু? মনা বলল। হাসমতকে কি তুই সন্দেহ করিস? হেই তো কাল বিকালে আসছিল। আমার লগে সুন্দর সুন্দর কথা কইল। যারা আমারে ধরতে আসছিলো তাগো শায়েস্তা করব কইছিলো। আমার পকেটে যাওনের সময় একশ টাকা গুইজা দিছিল। হেই এই কাম করছে বিশ্বাস হইতাছেনা। বুজবার পারতাছিনা। তয় যে হালারপুতই কামডা করুক সে হালা ভালো করে নাই। জনগণের লগে সে বিশ্বাসঘাতকতা করল।

--------------------------সমাপ্ত-------------------------------
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×