১
সূর্যটা আজ যেন আগুনে আগুন। মাথার ওপর তামাটে আকাশ। নিচে তপ্ত পিচঢালা পথ। এই কাঠফাটা দুপুরে একদল কিশোর লক্ষ্যহীন হেটে চলেছে । রনি, রাহাত, ওলি আর আশফাক। তাদের পদক্ষেপে কোনো গন্তব্য নেই। আছে শুধু শহরের ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতা।
শহরের অলিগলি সব ধুলো আর ধোঁয়ায় মোড়া। গাছের ছায়া নেই, নদীর কলতান নেই । শুধু কংক্রিটের দেয়াল আর মানুষের ভিড়। প্রকৃতি এখানে লালিত নয়, বরং প্রতিদিন নতুন করে ক্ষত-বিক্ষত। রোদে পিচঢালা রাস্তা থেকে ধোঁয়া ওঠে যেন নিজের অজান্তে শহরটা নিজেই জ্বলছে।
চায়ের দোকানের ভাঙা বেঞ্চে বসে থাকা মানুষ, বাজারের কোলাহল, ভিড়ের অস্থিরতা সবকিছুতে এক অদৃশ্য ক্লান্তি। ওলি বলে, এই শহরে মানুষ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। তার কথায় রাহাত আর আশফাক মাথা নাড়ে। তারা জানে, এখানে জীবন মানে শুধু টিকে থাকা, প্রকৃতির কোনো আশ্রয় নেই।
একসময় শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যেত নদী। পাখির গান শোনা যেত বনে উদ্যানে । সেখানে এখন নর্দমা, দুর্গন্ধ আর ময়লার স্তূপ। প্রকৃতির অনুপস্থিতিতে এ শহর আজ শুষ্ক, আর মানুষের মন অস্থির।
তাদের হাটা থামে পুরনো বাজারের সামনে। বাজারে ভিড়, গরমে হাঁসফাঁস করা মানুষ, আর শব্দের ঢেউ। এই শহুরে জীবন যেন এক অন্তহীন পথ চলা। কংক্রিটের দেয়াল, ভাঙা ফুটপাত, মানুষের ভিড়। প্রকৃতির অনুপস্থিতিতে এ এক মহা-শূন্যতা।
তারা আবার হাটতে শুরু করে। হাটতে হাটতে তারা দাড়ায় এক মোড়ে। সূর্য এখনও আগের মতো আগুন। শহরটা নিঃশ্বাস নিচ্ছে ধোঁয়া আর ধুলোয়। এখানে আজ শুধু শুধু ইট-কাঠ-পাথরের প্রতিধ্বনি আর মানুষের ফাঁকা বুলি।
২
রনি কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলে, উফ! চারিদিকে একটা গাছও নেই যে একটু জিরিয়ে নেব। সব তো কেটে মানুষ সাফ করে ফেলল । এ রাস্তার ধারে ছিল পুরনো এক বটগাছ । গাছটা গত মাসেই করাত দিয়ে চেরাই করা হয়েছে। মানুষ এখন সবুজের চেয়ে ইটের দালান বেশি ভালোবাসে।
হাটতে হাটতে তারা চার বন্ধু চলে এসেছে লোকালয়ের শেষে। এখানে শুরু হয়েছে বন । বনের ভিতর পা রাখতে এক ভিন্ন অনুভূতি হলো তাদের। বাইরের সেই আগুনের হলকা এখন নিমেষে উধাও। সামনে উঁচু, সোজা কাণ্ড, আকাশ ছুঁতে চাওয়া গাছের সারি। তারা আগে কখনো এই গাছ দেখেনি বা দেখলেও গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু আজ বনের ভিতর প্রবেশ করতে ছাতিম গাছের মহিমা তাদের চোখে ধরা দিল। পাতার ঘন সবুজে আকাশ ঢেকে গেছে, আর ছোট ছোট সাদা ফুলের গন্ধে চারদিকের বাতাস হয়ে উঠেছে সুরভিত ।
আশফাক থমকে দাড়িয়ে বলে, শোন, তোরা কি কিছু শুনতে পাচ্ছিস? সবাই চুপ হয়ে যায়। পাতার আড়ালে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক, আর ওপরের ডালে বসন্তবৌরির গান। এখানে যেন এক অন্য জগৎ। গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদ মাটিতে আলপনা একেছে।

তারা বনের আরও গভীরে যায়। এখানে এক ছোট জলাশয়। নীলরঙা ফড়িংরা জলের ওপর খেলা করছে। রাহাত নিচু হয়ে এক টুকরো শ্যাওলা ধরা পাথরের ওপর বসে । সে দেখে, একদল লাল পিঁপড়ে সারিবেধে একটা মরা পোকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ক্লান্ত হয়ে তারা ছাতিম গাছের ছায়ায় বসে পড়ে। গাছের গুঁড়ির খসখসে বাকল আর শীতল স্পর্শ অনুভব করে তারা । বুঝতে পারে, এই গাছগুলো শুধু কাঠ আর পাতা নয়, এরা একেকটা তর-তাজা প্রাণ।
গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে আলপনা আকছে। আলো-ছায়ার খেলা যেন হয়ে উঠছে প্রকৃতির নিজস্ব শিল্পকর্ম। এর মধ্যে এক কাঠবিড়ালি লেজ দুলিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আবার হারিয়ে গেল। চারপাশের পাখির ডাক, শাল আর বাঁশঝাড়ের মৃদু দোল মিলিয়ে বন যেন এখন এক জীবন্ত কবিতা।
৩
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। বনের ছায়া এখন আরও দীর্ঘ । তাদের চার বন্ধুর মনে জাগছে এক নতুন উপলব্ধি। তারা ভাবছে, মুক্তি মানে শুধু বাঁধন ছেড়া নয়; প্রকৃত মুক্তি হলো প্রকৃতিকে রক্ষা করা, তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে বেচে থাকা। প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফুল যেন আহ্বান জানাচ্ছে: আমাদের রক্ষা করো, বাচিয়ে রাখো; আর তোমরাও বেচে থাক।
হঠাৎ এখানে উড়ে এল এক বসন্তবৌরি পাখি। তার রঙিন পালক রোদে ঝলমল। তার সুরেলা ডাক নিস্তব্ধতাকে ভেঙে এক অদৃশ্য সঙ্গীত ছড়িয়ে দিল। সেই সুরে তারা অনুভব করল, বন শুধু গাছপালা নয়; তা অজস্র জীবনের আশ্রয়।
সূর্য বিদায় নিচ্ছে। ঘরে ফিরতে উঠে পড়ল তারা। বনের ছায়া, ফুলের গন্ধ আর পাখির গান তাদের উপলব্ধি করাল, প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানুষেরই দায়িত্ব। প্রতিটি গাছ কোন না কোন জীবনের আশ্রয়, প্রতিটি ফুল শান্তির প্রতীক, আর প্রতিটি পাখির ডাক জীবনের সুর। তারা বনভূমির প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফুল, প্রতিটি পাখির কথা ভাবল। স্বপ্ন দেখল যে একদিন এই রুক্ষ পৃথিবী আবার সবুজে ভরে উঠবে। বাতাস হবে শীতল, নদী হবে স্বচ্ছ, আর মানুষ হবে প্রকৃতির সত্যিকারের বন্ধু।
এক অপূর্ব অনুভবে তারা যেন সব এখন বদলে যাওয়া মানুষ। তাদের চোখে আর লক্ষ্যহীন যাযাবরের দৃষ্টি নেই। সেখানে ঝিলিক দিচ্ছে দায়িত্ববোধ। ছাতিম গাছের মায়াবী সুবাস যেন তাদের বলছে, তোমরাই তো আমাদের সন্তান, তোমরাই তো সুরক্ষা দেবে আমাদের!
সূর্য পশ্চিমে ডুবে গেল। ঘরের পথে পা বাড়াল তারা। তাদের মনে তবু জ্বলছে সেই নতুন আলো: প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ। ছাতিম গাছের ছায়ায় কাটানো আজকের দুপুর তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি হয়ে রইল।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



