ভদ্রলোকের হয়রানির বিবরণ শুনে আমিও শিউরে উঠলাম। মানুষের বিপদ নিয়ে হাসতে নেই। কিন্তু কেউ যদি নিজের হাতে বিপদকে নেমন্তন্ন করে নিয়ে আসে, তাকে বলার কি আছে? রনি এসেই হুড়মুড় করে আফজাল সাহেবের কথাটা গড়গড় করে বলা শুরু করলো। যতোই বলি, "দম নাও, দম নাও"। সে বলে, "মামা তুমি ঘটনাটা শুনে তারপর বলো দম নিতে"। আফজাল সাহেবের ছোট ছেলে সানি রনির ডিপার্টমেন্টে পড়ে। সেই খান থেকে এই গল্পের সূএপাত।
আফজাল সাহেবের বিড়ম্বনা এখন চরমে। সাদা পোশাকের পুলিশ, টিকটিকি, ইন্টেলিজেন্স সবকিছু তাকে শীতের চাদরের মতো আবৃত করে রেখেছে। বেচারা যেখানেই যান তারা পিছুপিছু যায়। রাজস্ব বোর্ড থেকে দু'বার এসে তার কোম্পানীর হিসাব নিকাশের কাগজ পএ নিয়ে গেছে। সময় হলেই নাকি তাদের অফিসে ডাকবে। ব্যাপারটা একটু জটিল বলেই মনে হচ্ছিল। অসাধু ব্যবসায়ী, ফড়িয়া, গড ফাদার (কোন গড মাদার না) - সব কিছুর বিরুদ্ধে দেশে এখন জেহাদ চলছে। সকল অসততার শেকড় উপড়ে ফেলা হবে। আমরা জনগণ আবার মুক্ত ও বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করবো। সবার মনে প্রশান্তি। সবাই আশ্বস্ত। কোথাও কোন বিড়ম্বনা নেই। তার মধ্যে একজন আফজাল সাহেবের বিড়ম্বনা আমাকেও উদ্বিগ্ন করে তুললো।
রনিকে বসিয়ে জিগ্যেস করলাম, "ভদ্রলোক নিশ্চয়ই কোন দুই নম্বর ব্যবসা করেন"। রনি বললো, "তা হলেও তো কোন ব্যাপার ছিল না। ঘটনাটা তো সেটাও না"। আমি একটু বিরক্ত হয়ে পড়লাম, "তা হলে ঘটনা কি"? "ভদ্রলোক করেন কি"? রনি বললো, ভদ্রলোক নিতান্তই সাধারণ ব্যবসায়ী। আফজাল সাহেব রাজনীতির আশেপাশেও নেই। কোন ভোগ্যপণের ব্যবসাও করেন না। তার ছোটখাটো একটা বিড়ি ফ্যাক্টরী আছে বরিশালে। সেখানে তার শ' দুয়েক শ্রমিক আছে। নরসিংদীতে আছে শাড়ীর কারখানা। নিয়মিত কর দেন। সব দলকে চান্দাও দেন। কারও সাথে তার কোন বিরোধ নেই। তার ব্যবসার বিজ্ঞাপন নিয়মিত পএিকায় দেন। রেডিও তে দেন। এবার আমি ক্ষেপতে শুরু করলাম রনির উপর। মনে হলো, "ছোকরাটা আমার সময় নস্ট করছে"। রেগেই বললাম, তা হলে আফজাল মিয়ার সমস্যাটা কি? রনি বললো, "সমস্যা হলো তার শ্যালক"। আমি উৎসুক হয়ে সোফার উপর পা তুলে বললাম, "সব ব্যাটাই খালি শ্যালকদের জন্য ধরা খায়। তার শ্যালক কি করলো? চুরি, ডাকাতি, না ভেজাল মিশাচ্ছিল"?
এবার রনি আমার উপর ক্ষেপে উঠলো। মাামা, "তুমি না বুঝে খালি বাগড়া দিচ্ছ। সমস্যাটা নেহাতই জটিল, তুমি কি রিপল অ্যাফেক্ট বলে কিছু বোঝ?"। আফজালের শ্যালক হচ্ছে বুদ্ধির ঢেঁকি। সেই তার ব্যবসার কাগজ পএ দেখে। ভদ্রলোকের মিডিয়া কন্টাক্টও সে। শ্যালক এসে আফজাল সাহেবকে বলে, "দুলাভাই দেশে এখন নতুন চাক্কা লাগছে। সব মাস্তান ও গড ফাদাররা জেলের পানিতে পচা শুরু করছে। দেখছেন না, ড: ইউনূস রাজনীতির মাঠে নামতেছে। বিমান বন্দরে কি সুন্দর কথা বললো। আপনিও কিছু ভাবেন। আপনার মতো সৎ মানুষকেই দেশ খুঁজতেছে"। আফজাল সাহেব নিতান্তই নিরীহ মানুষ। শ্যালকের কথায় গলিত হয়ে বললো, "খুব ভালো কথা"। গ্রামের লোক তো সবসময়ই আমারে চায়। কিন্ত মাস্তানদের ভয়ে কখনও ইলেকশনের নামও নিতে পারি নাই। তবে এইবার আর সেই ভয় নাই। শ্যালক বলে, "দুলাভাই, আপনি ব্যাংকক যাওয়ার পথে যদি একটু সাংবাদিক ভাইদের সাথে কথা বলতেন দেশের ব্যাপারে তা হলে কিন্তু একটা কামের কাম হয়ে যায়। সাংবাদিকরা এখন খালি সুধী সুশীল মানুষদের মুখের কথার লুফে নেওয়ার জন্য বইসা আছে"। যেমন কথা, তেমন কাজ। শ্যালক গিয়ে কয়েকটা পএিকায় প্রেস রিলিজ দিয়ে আসলো, "আফজাল বিড়ি ফ্যাক্টরীর প্রোপাইটার সমাজ সেবী আফজাল মিয়া ব্যাংকক যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের তার ভবিষ্যত ও দেশের ভবিষ্যত নিয়া কিছু কথা বলবেন"।
রনি বললো, "প্রেস রিলিজ কোন পএিকা অবশ্য ছাপায় নাই। কিন্তু ইন্টেলিজেন্সের টিকটিকিরা এখন তার পিছে লাগছে। ভদ্রলোক যেখানেই যায়, তারাও যায় তার পেছনে"। গতকাল পাসপোর্ট অফিস তার পাসপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে। ভদ্রলোকের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। মামা, "এখন উপায়"? এবার আমি সত্যি সত্যি রেগে দাঁড়িয়ে গেলাম। লোকজনের মাথার ব্রেইন পচা শুরু করেছে। রেগেই বললাম, "তোমার বন্ধুর বাপ আফজাল মিয়া জানে না, দেশে জরুরী অবস্থা চলছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত। তারপরেও যদি তার জেলের ভাত খেতে মন চায় তাহলে তাকে আরও কয়েকটা প্রেস রিলিজ পাঠাতে বলো"। রনি এইবার জিগ্যেস করলো, "মামা, ড: ইউনূস প্রেস রিলিজ দেয়, সাংবাদিকদের সাথে কথা কয়, জনগণের কাছে খোলা চিঠি পাঠায়, কই তার তো কোন সমস্যা হয় না"? মেজাজ এবার আমার সপ্তমে। বললাম, "তোমার ঐ বিড়ির ব্যাপারী কি নোবেল প্রাইজ পাইছে? তারে বিড়ির ব্যবসায় মন দিতে বলো। আর না হয় জেলের পানি খাইতে বলো"।
এমন সময় মোবাইলটা বিশ্রীভাবে বেজে উঠলো। হাত বাড়িয়ে ধরতেই মিহি গলায় জিগ্যেস করলো, "এই তুমি রেডী, চাইনীজে কখন আসছো"? "হুম, আসছি" বলেই পাশ ফিরে আবার ঘুমোতে লাগলাম।
নিয়মিত পড়ুন বাংলা গ্রুপ ব্লগিং [link|http://deshivoice.blogspot.com/|
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


