somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্নহত্যার আগে মিনার মাহমুদের লেখা শেষ চিঠি...............

১০ ই এপ্রিল, ২০১২ রাত ১:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথই বেছে নিলেন বিচিন্তা সম্পাদক মিনার মাহমুদ। গত ২৯ মার্চ ঢাকা রিজেন্সি হোটেল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের সঙ্গে পাওয়া যায় পঁাচ পৃষ্ঠার একটি চিঠি। স্ত্রী লাজুককে তিনি এ চিঠিটি লিখেন। চিঠিতে আছে মিনার মাহমুদের জীবন, প্রেম, বিদেশে চলে যাওয়া থেমে শুরু করে অনেক কিছু। ...................................

লাজুক,
আমার এই ৫৩ বছর বয়সী জীবনে অনেক অনেক মেয়েকে দেখেছি। কিন্তু তোমার উদাহরণের বাস্তব ব্যক্তিকে দেখি নি। অবাক হই, সৃষ্টিকর্তা কেন তোমার মতো মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন।
সকালে বাসাথেকে বের হওয়ার সময় আমি জানতাম- কোথায় যাচ্ছি, কি করতে যাচ্ছি। বুক ভেঙে কান্না আসছিল। চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারলাম না। এতদিনের চেনাজানা এ বাড়িতে আর ফিরব না। আর দেখা হবে না তোমার সঙ্গে । চেপে রাখা মুখ ঠেলে কান্না এলো। নিজেকে খুন করে ফেলার এ আয়োজনে সবচেয়ে প্রতিবন্ধকতা ছিলে তুমি।
আমার মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়ে তোমার কান্না- ভাবতেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। আবার সিদ্ধান্ত নিই। সেই লাজুক তুমি এখন নিঃসঙ্গ, একাকী।
তোমার মনে প্রথম প্রশ্ন আসবে আমি কেন আত্মহত্যা করলাম? গতকাল দৈনিক আজকের প্রত্যাশা থেকে রিজাইন করেছি বলে? মোটেও না, আসলে নির্দষ্টি কোন কারণ নেই। কারও প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগ আছে আমার বাংলাদেশের সার্বিক সমাজ ব্যবস্থায়।
সাংবাদিকতা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়থেকে অনার্স শেষ করলেও মাস্টার্স শেষ করতে পারি নি সাংবাদিকতা সূত্রে মাস্তানদের হুমকির কারণে। ক্যাম্পাস ছিল আমার জন্য নিষদ্ধি এলাকা। সাপ্তাহিক বিচিত্রা দিয়ে শুরু করেছিলাম। পদত্যাগে বাধ্য করা হলো আমাকে দুর্নীতির অভিযোগে। লতা হোসেন আমার জীবনের সবচেয়ে আত্মার বন্ধু। তার সহযোগিতায় বিচিন্তা বের করলাম। মোটামুটি সফল। নিষিদ্ধ হলো কিছুদিন পরে। জেল জীবন। তিন বছর বেকার। এরপর এলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একমাত্র সোলএজেন্ট খালেদা জিয়া। বিচিন্তা সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার পর মামলা। তখন সাপ্তাহিক কার্যদিবসের প্রতিটি দিনই হাজির থাকতে হতো কোর্টপাড়ায়। বুঝতে পারছিলাম স্থায়ীভাবে জেল জীবন দেখানোর পরিকল্পনা আছে গণতান্ত্রিক সরকারের। উপায়হীন আমি পালিয়ে গেলাম আমেরিকায়। বিচিন্তা সংশ্লিষ্ট কর্মীরা যাতে বেকার না হয়, বিচিন্তা হস্তান্তর করে গেলাম ইউএনবি এনায়েতুল্লাহ খানের কাছে।
১৮ বছর দাসত্বের জীবন কাটিয়েছি আমেরিকায়। ১৮ হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি, কত কোটি টাকায় বিক্রি করেছ বিচিন্তা? সবাই শুধু বিকৃত মানসিকতার একটি বিষয়ই বিবেচনা করেছে। কিন্তু দেশে ফিরে ২০১০ সালে যখন এনায়েতুল্লাহ খানের কাছ থেকে বিচিন্তা ফিরিয়ে নেই, একজনও প্রশ্ন করে নি কত টাকায় ফেরত নিলাম।
লাজুক, সাংবাদিকতা পেশায় মেধাহীন-আমি শ্রমই দিয়েছি। নিউজপ্রিন্টের ওপর বলপয়েন্ট দিয়ে ক্রমাগত লিখে যাওয়া- হাত ফুলে উঠতো, লাইট বাল্বের উত্তাপ দিয়ে সেক দেওয়া। আবার লেখা। নিজের কাছে প্রশ্ন করি, সাংবাদিকতা পেশার নাম বিনিয়োগ করে কখনও আমি কি কোন সুবিধা নিয়েছি? নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এখন চার হাজার টাকা। কোন বাড়ি অথবা দেশের কোথাও এক ইঞ্চি জমি নেই। আক্ষরিক অর্থে সর্বহারা। একটা সময়ে বাংলাদেশকে আমি দেখেছি পর্বতের উচ্চতা থেকে। নিজের জন্য সম্পদ মাথায় আসে নি।
যে কথাটা বলতে চাই নি- নিউ নিউইয়র্কে আমার জীবন-যাপন ছিল আত্মকেন্দ্রিক। বিচ্ছিন্ন ছিলাম দেশ এবং বাংলা ভাষাথেকে। নেটলাইনে কৃষ্ণকলির গানগুলো শুনতাম, এমন স্থির, কনফিডেন্স। বাংলাদেশ আবার বিজয় হয়ে আসে জীবনে। আর ঠিক এই সময়ে তুমি অপরাজিতা। নেটলাইনে পরিচয়, শুনি তোমার অসাধারণ জীবন্ত গান। সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশে আমার মৃতদেহও যাবে না। তাই শরীরের সবকিছু অগ্রিম দান করে রেখেছিলাম হাসপাতালে। তুমি বদলে দিলে সবকিছু।
লাজুক, আমি সদ্ধিান্ত নিই, ফিরে যাব দেশে। প্রথম দেখা হয় তোমার সঙ্গে বিমানবন্দরে। দীর্ঘ দেহী, শ্যামলা। আশ্চর্য চোখ তোমার। কথা বলে চোখের ভাষায়। তোমার আমার প্রথম দেখা, বিয়েসহ সব সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে আমরা চূড়ান্ত করে ফেলেছি। তুমি দাঁড়িয়েছিলে চেনা অথবা অচেনা মানুষটার জন্য। আমি তোমাকে দেখি সবটুকু। চারদিকে কোন কিছু কেয়ার না করে কাছে টেনে বুকে নেওয়ার ইচ্ছে হয় তোমাকে।
এখন শোনো লাজুক। আমি সর্বহারা। 'কিছু নেই' একজন মানুষ। বিচিন্তা আবার প্রকাশ করেছিলাম, পাঠকরা নেয় নি। পরে একটি চাকরির জন্য কত চেনা অচেনা পত্রিকা মিডিয়ায় চেষ্টা করেছি কেউ নেয় নি। অবাক হয়েছেন নিয়মিত লেখা এক সাংবাদিক। হাজিরা দেব, নিয়মিত লিখব, মাস শেষে একটা বেতন কোথাও হয় নি। কাউকে অভিযোগ করি নি।
লাজুক, বেশ কয়েক দিন ধরে চিন্তা করেছি- মৃত্যু। তারপর কোথায়? এরপর কি জীবনের আর কোন ফিরে পাওয়া। খুব অবাক হয়েছি, বাংলাদেশের কোন দৈনিক পত্রিকায় আমার স্থান হলো না।
বিচিন্তা শুরু করেছিলাম একদল তরুণ নিয়ে। বিরাট এক ঝুঁকি। কোন পত্রিকা নেই না। আমি নিয়ে নিয়েছিলাম। কারণ নতুন সাংবাদিক আনতে। খুব, খুব কষ্ট পেয়েছি, অপমানিত হয়েছি। যুগকে জিজ্ঞাসা করো, বাংলাদেশে সাংবাদিকতার নতুন ধারা যারা তৈরি করেছে তাদের একজন আমিও।
আমি মিনার, যখন আমেরিকা থেকে যখন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিই, শুনে সবাই অবাক। প্রশ্ন করে, বাংলাদেশে কেন ফিরে যাচ্ছি। আমি অবাক হই, নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছি - এটা নিয়ে প্রশ্ন কেন? কোথায় যাব আমি তাহলে?
লাজুক, আমি নিজকে খুন করে ফেললাম। কোন বিকল্প না পেয়ে। কাগজপত্রে আমি একজন আমেরিকাবাসী এখন। তুমি যেতে চাও না। বিদায় তোমাকে। তুমি চাও নি আমি আমেরিকা যায় নি। দয়া করে বেঁচে থেকো লাজুক। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ। আমি এখন ট্যাবলেট খাচ্ছি।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই এপ্রিল, ২০১২ রাত ১:১৫
১৮টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×