৩. অনেক খন থেকেই কাদের সাহেব খেয়াল করছেন বাসা টা কেমন শান্ত হয়ে আছে। শুনশান নিরাবতা। বুঝলেন ছোট মেয়ে এখনও পড়ছে। যদি ও তার বাসায় লোক খুব বেশি তা নয়, তবে সারা দিন বাসাটা মাতিয়ে রাখে তার ছোট মেয়ে “লহরী”, তবে পড়তে বসলে তাঁর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। পড়াশোনায় খুব মনেযোগী। কিন্তু বাকী সব কাজে মাত্রা ছাড়া পণ্ডিত। শুধু পড়া লেখায় ভাল বলে সব কিছু থেকে পার পেয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় কোন কুক্ষণে যে নাম টি রেখেছিলেন। নামের মতই তাঁর স্বভাব। কাদের সাহেব সংসারে চার জন মানুষ তাঁরা। তাঁর স্ত্রী “তিলোত্তমা” বড় মেয়ে তটিনী আর ছোট মেয়ে লহরী ।যাকে বলে সুখের সংসার।
কাদের সাহেবের স্ত্রী “তিলোত্তমা” সম্পর্ণ অন্য রকম একটা মানুষ। সত্যি কথা বলতে আগে ও এমন ছিল না। কাদের সাহেবের দেখা এই তাঁর ৩য় রুপ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো সে সমাজ বিজ্ঞানে। আর কাদের সাহেব ছিলেন রুয়েটয়ে। সেখান থেকেই ঘটনা চক্রয়ে পরিচয় তাদের। সেখান থেকেই জানা শোনা। তবে মেয়েদের সামনে বলেন “জানা শোনা”,আসলে ছিল বোঝা পড়ার একটা মধুর সম্পর্ক। যদি ও মেয়েরা জানে তাদের সম্পর্কের কথা, বড় মেয়ে না জানার ভান করে আর ছোট্ট মেয়েটা পাবলিক প্লাচে বোমা ফাটায় “বাপির আর মায়ের তো এ্যফেয়ার ছিল”। মাঝে মাঝে খুব লজ্জায় পড়েন ছোট মেয়েটা কে নিয়ে। হাজার হোক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের বাবা,এই সব ব্যাপার গুলো খুব দৃষ্টিকটু মনে হয়।
তিলোত্তমা খুবই সৌখিন মানুষ ছিল বরাবরই। পড়াশোনা শেষ করার পর একটা এনজিওতে চাকরি শুরু করে। যদি ও তিলোত্তমা কে বিয়ে করতে খুব বেগ পেয়ে হয়েছে তাঁর। কাদের সাহেবের মায়ের মত ছিল না এই বিয়েতে কিন্তু ছেলে বেঁকে বসায় তিনি রাজী হন । কারন ছিল শুধু একটায় মেয়ের গায়ের রঙ ফর্সা না তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম ফর্সা হবে না এই জন্য। কাদের সাহের মা খুব সুন্দরী ছিলেন আর ছিলেন খুব দাপটে মহিলা। তিনি যেমন সুন্দরী ছিলেন তেমন ছিলো সৌন্দর্যের অহংকার। তাঁর সৌন্দর্যের সুনাম ছিল চারিদিকে। কিন্তু কাদের সাহেবের সব সময় মনে হয়, মায়ের যদি একটু অহংকার কম হতো তবে তিনি আর ও বেশি সুনাম অর্জন করতে পারতেন।
তিলোত্তমা বিয়ের সময় প্রথম ধাঁক্কা খায় গায়ের রঙ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য আর, দ্বিতীয় ধাঁক্কা খায় তটিনী জন্মবার পর। প্রথমতো মেয়ে আর দ্বিতীয়তো মেয়ের গায়ের রঙ ফর্সা না হবার জন্য। তখন থেকেই আস্তে আস্তে নিজেকে অনেকটায় গুঁটিয়ে নেই তিলোত্তমা। শত চেষ্টা করেও কাদের সাহেব তাকে সেই ধাঁক্কা থেকে বের করে আনতে পারেনি। আর শেষ ধাঁক্কা খায় যখন সন্তানদের প্রয়োজনে নিজের চাকরিটা ছাড়তে হয়। কাছের মানুষদের সাহায্য না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কাদের সাহেবের শত নিষেধ উপেক্ষা করে চাকরিটা ছেড়ে দেয় তিলোত্তমা।
কাদের সাহেবের চিন্তার ছন্দ পতন হলও খুঁট-খাট শব্দ শুনে।শব্দ শুনতে পারছেন কিচেন থেকে বুঝলেন যে ছোট মেয়ে পড়ার টেবিল থেকে উঠেছে।বাসার কলিং বেলের শব্দ ও কানে এলো তাঁর। কাদের সাহেবের মনে মনে ভাবলেন “এখন আবার কে এলো !! ??”।
লহরী কে কিচেনের দরজায় দেখে কাদের সাহের জিজ্ঞাসা করলেন
লহরী কে এলো এখন ?
লহরী কাদের সাহেবের রুমের দরজার কাছে এসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো
লুলা এসেছে…
লুলা !!!
এত অবাক হবার কি আছে ??
এমন ভাব করছো যেন তুমি চিনই না ?
তুমিই তো তাকে এই বাসায় আসতে বলেছিলে।
আমি ??? কাদের সাহেব হতবাক মেয়ের কথা শুনে।
আমি আবার কোন পঙ্গু কে বাসায় আসতে বলেছিলাম ??
আর এ বাবা এই লুলা সেই লুলা নয়।
কাদের সাহেব চাপা গলায় বলে উঠলেন “তো ??”
লহরী অবহেলিত গলায় বললো “তোমার ঐ ঘটক লুলা”
কাদের সাহেব এবার রেগে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞাসা করলেন
তা তোমার তাকে কোন দিক দিয়ে লুলা মনে হল, দয়া করে আমাকে বলবে ??
লহরী এবার ঠাট্টার গলায় বলে উঠলো বাপি – তোমার ঐ ঘটকের নাম কি ?
কাদের সাহেব বললেন “লুবনা লাইলা ”
তা হলে সেটা সট ফর্ম করলে কি হয় “লুলাই” তো হয় না ?
কাদের সাহেব বুঝলেন মেয়ে তাঁর সাথে বাঁদরামি শুরু করছে
তিনি বললেন – বুঝলাম
আমার নাম সট ফর্ম করলে কি হয়? কাদের সাহেব মেয়ের কাছে জানতে চাইলেন।
মেয়ে সদয়ে বলে উঠলো “আমি তোমার নাম সট ফর্ম করতে চাই না”
কারন তুমি আমার বাপি আর তাঁর থেকে ও বড় যে ব্যাপার টা সেটা হল তোমার নামে এক জন বিখ্যাত আল্লাহর একজন ওলী ছিলেন “আমি তাকে সম্মান করি এবং শ্রদ্ধা করি”
মেয়ের এই কথায় একটু খুশিই হলেন কাদের সাহেব ।
তিনি মেয়ে কে বললেন যাক খুশি হলাম এটা জেনে, তোমার মা তোমাকে একটু হলে ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছে।
মেয়ের এবার পাল্টা জবাব “আমার মা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, কিন্তু তোমার মা তোমাকে কিছুই শেখায়নি ”
মেয়ের কথা শুনে এবার না হেসে পারলেন না কাদের সাহেব
তিনি হাসতে হাসতে বললেন “আমার মা আমাকে কিছু শেখায় নি ??”
না কিছুই শেখায়নি।
যদি শেখাতো তবে তোমার এক হাতে বই আর এক বিড়ির বদলে থাকতো পেন।
এটা কোন ধরনের কম্বিনেশন আমি তো বুঝতে পারি না। এক হাতে বই যা পৃথিবীর ফার্স্ট ক্লাস একটা জিনিস আর এক হাতে বিড়ি যা সমাজের থার্ড ক্লাস একটা বস্তু।
কাদের সাহেব মেয়ের কথা শুনে খুব কষ্টের হাসি চেপে রাখলেন। তাঁর খুবই মজা লাগে যখন বাসার সবাই তাকে এই টপিকটা নিয়ে বক্তৃতা শুনায়। তিলোতমা বলতে বলতে এখন ক্লান্ত হয়ে গেছে এখন আর সে কিছুই বলে না আর বড় মেয়ে এখন আর কিছু বলে না তবে হাতের কাছে সিগারেটের প্যাকেট পেলে সেটা নিয়ে ওয়াসরুমে যায় আর ফ্লাশ করে দেয়।
আর রইল বাকী এক জন লহরী সে এখনও পর্যন্ত ক্লান্ত হীন ভাবে বক্তৃতা দিয়ে যায় সুযোগ পেলেই।
শুনো বাপি খেলে খাও Marlboro না হলে খাও আকিজ বিড়ি। তা না তুমি খাও
গোল্ড লিফ।
এটা কোন ব্র্যান্ড হলও ?
না ফার্স্ট ক্লাস সিগারেট না থার্ড ক্লাস বিড়ি
মিডল ক্লাস কোন কিছুই আমার পছন্দ না
“তাহার” বাবা Louixs খায় বিখ্যাত ব্র্যান্ড ।
মেয়ের কথা শুনে কাদের সাহেব আতঁকে উঠলেন। আর বললেন-
“তাহার” বাবা Louixs খায় তুই জানলি কেমন করে?
বা-রে না জানার কি আছে… “তাহার” বলেছে কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো লহরী ।
কাদের সাহেব মেয়ের কথা শুনে একটু হতাশ হলেন
আর খুব শান্ত গলায় বললেন “তোরা এই সব কিছু নিয়েও গল্প করিস ?”
না করলে আর আমি জানলাম কেমন করে পাল্টা প্রশ্ন করলো লহরী বাবা কে।
লহরী এবার বাপি কে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো
– শুনো বাপি, এত হতাশ হবার কিছু নেই
ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চা গুলো অনেক স্মার্ট হয় বাপি
ও তুমি বুঝবেনা।
কাদের সাহেব মনে মনে ভাবলেন সত্যি বর্তমান কালের বাচ্চারা অনেক এগিয়ে আছে। যার নাগাল পাওয়া তাঁর বয়সের মানুষের পক্ষে সম্ভব না। শুধু তালে তাল মিলিয়ে চলা আরকি।
কাদের সাহেব আর লহরীর কথার মাঝে আবার ও বাসার বেল বেজে উঠলো।
আর সাথে সাথে লহরীর বলে উঠলো
মায়া অংকেল এসেছে মনে হয়।
——— চলবে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





