
"আজ আর “ও” কে দেখতে পেলো না বাসার সামনে। ঠিক বুঝতে পারছে না উদ্দীপিত ব্যাপার টা কি হল। প্রতিদিনই তো দেখতে পায় “ও” কে। বাসা থেকে বেরিয়েই মনটা খারাপ হয়ে গেল উদ্দীপিতের। প্রতিদিন বাড়ির মেইন গেট থেকে বের হয়ে দাঁড়ালেই দেখতে পায় “ও” কে। দূর থেকে ঘুম-ঘুম চোখয়ের “ও” ফোলা মুখটা দেখতে খুব ভালই লাগে। আর “ও” কে দেখার সাথে সাথে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় আর চোখয়ের ঘুম গুলো যে কোথায় হারিয়ে যায় বুঝতেই পারিনা উদ্দীপিত। এত ভোর এ, এত সুন্দর পরিপাটি হয় কেন করে কে জানে ? আইরন করা কাপড় পরে সব সময়। ওদের স্কুলের ড্রেসটা ও সুন্দর। ব্লু কামিজ, সাদা সালোয়ার, সাদা ওড়না, সাদা বেল্ট, সাদা স্কাপ আর সাদা জুতা আর সাথে প্রতিদিন লম্বা দুইটা বেণি। উদ্দীপিতের “ওর” পরিপাটি চেহারাটার কথা মনে হতেই মন টা ভাল হয়ে গেল। আবার হাসি ও পেলো তাঁর নিজের জন্য, তাঁর তো ঘুম থেকেই উঠতে ইচ্ছা করে না ভোর বেলা।
অবশ্য না হয়েই বা উপায় কি, ঠিক মত পরিপাটি না হয়ে গেলে যে স্কুলে পানিশমেন্ট খেতে হয় সবার। ও স্কুল যেমন আমার স্কুল ও তেমন।
আর ভাল লাগে না
মর্নিং শিফটে মানুষ পড়ে।"
ঝাঁজালো শব্দে কানটা ফেটে যাচ্ছে উদ্দীপিতের।
কিসের শব্দ এটা !!!!
একটু হুশ হতেই বুঝলও সে, এত খন স্বপ্ন দেখছিল, জীবনের সুখের কিছু স্মৃতির স্বপ্ন ।
উদ্দীপিতের মোবাইল টা বেজেই চলেছে সেই কান ফাটানো ঝাঁজালো শব্দ দিয়ে।
কলটা ও রিসিভ করতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু না করলেও হবে না যে “এটা বড় মায়ের কল”।
কলটা রিসিভ করতেই অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসলো “বাবা তুই কখন আসবি, আমি তো সব রান্না করে বসে আছি”।
উদ্দীপিত ঘুম ঘুম গলাই বলতে লাগলো আমি তো তোমাকে বললাম আমি কাল আসবো, তো তুমি কেন রান্না করে বসে আছো। আজ রাতের বাসে উঠবো আমি, কাল সকালে পৌছাবো যদি ঘাটে জ্যাম না থাকে।"
অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসতে লাগলো সেই মমতার সুর যার বদৌলতে আজ সে এই খানে।
“কাল বাসে আসতে হবে না, আজকের লাস্ট ফ্লাইটে আমি টিকেট কেটে দিচ্ছি তুই চলে আয়”
উদ্দীপিত এবার হয়রান হয়ে বলও বড় মা আমি কাল আসি, শরীর টা খুব ব্যথা করছে আর খুব ঘুম পাচ্ছে"
আর বাড়াবাড়ি করলো না অন্য প্রান্তের মমতার সুর “ঠিক আছে আমি তাহলে আগামী কালের ফার্স্ট ফ্লাইটে টিকেট কেটে দিচ্ছি আর আমি টিকেট কেটে তোকে জানাবো, মাঝে মাঝে আবার টিকেট পাওয়া যায় না, এটায় সমস্যা”।
উদ্দীপিত বলল- ঠিক আছে।
উদ্দীপিতের ইচ্ছা ছিলো আর ও ২ দিন পরে যাবার কিন্তু এই মানুষটার সাথে সে কোন বিষয় নিয়েই জোর করে না।
তাঁর বড় মা তাঁর দেখা জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষ।
তাঁর জন্মের ২ বছরের মাথায় মা মারা যায়। তখন থেকেই তাঁর বাবা পাগল প্রায়। অনেক কষ্টে তাঁর বাবা তাকে দেড় বছর দেখা শোনা করে। সবাই তাঁর বাবা কে আবার নতুন করে সংসার করতে বলে কিন্তু বাবা করেনি। কারন মায়ের স্থান অন্য কাওকে দেওয়া বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না তাই।
এর পর একদিন বাবা তাঁকে বলে “তোমার সব কিছু গুছিয়ে নাও, আমাকে অফিসের কাজে বাইরে যাতে হবে। আমি যত দিন না আসি ততদিন তুমি তোমার বড় চাচার বাড়ী থাকবে, তোমার বড় ভাইয়া আর আপুর সাথে”
বাবা জানতেন সেই বাড়ির মানুষ কখনও তাঁকে অনাদর করবে না, বরং মা মারা যাবার পর বড় মা বলেছিলেন বাবা কে “ছোটো, তুমি আর একটা বিয়ে করো। আর উদ্দীপিতের দায়ভার আমার উপর ছেড়ে দাও” ।
বাবা হয়তো ভেবে ছিলেন তিনি আমাকে পারবেন মানুষ করতে কিন্তু না তিনি পারলেন না। এক সময় নিজের কাছে পরাজিত হলেন আর কাওকে কিছু না বলে হারিয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য।
সেই শেষ তাঁর নিজের ঠিকানা থেকে চলে আসা। আর কোন দিন তাঁর যাওয়া হয়নি সেই ঠিকানায়।
বাবা আমাকে মাগুরা থেকে যশোর নিয়ে আসেন বড় চাচার বাড়ী আর বলেন আমি দেখি কবে ফিরতে পারি। কিন্তু তিনি আর আসেননি।
কয়েক দিন পর বড় চাচা কে ফোন করে বাবা বলে -
“দাদা, আমি আর পারলাম না, আমাকে তোমরা মুক্তি দাও। উদ্দীপিতের দায়ভার তোমাদের উপর দিয়ে আমি পালিয়ে এলাম এর জন্য আমাকে ক্ষমা করো। আমার জন্য ভেবো না, শুধু ছেলেটার দিকে খেয়াল রেখো। আমি আর ফিরবো না, আর আমাকে তোমরা শুধু শুধু খুঁজো না।”
ব্যাস আমার জীবনটায় বদলে গেল একটা ফোন কলে।
অফিস থেকে ফিরেই বড় চাচা আমাকে ডাক দিলেন, আর বললেন “বাবা, তোমার ফোন করেছিল। বাবার আসতে কয়েক দিন দেরি হবে। তোমাকে এখানকার স্কুলে র্ভতি করিয়ে দিতে বললেছে”
সেই থেকে শুরু আমার বড় চাচার আমার বাবার ভুমিকায় পথ চলা। তাঁর জীবনের প্রতি পদে পদে বড় চাচা আর তাঁর বড় মায়ের ভুমিকা। বাবার স্মৃতি বলতে কিছু ছবি আর সাটিফিকেটে তাঁর নামটা।
ব্যাস এই ......
N.B: [আড়ালের অনুভূতি (পর্ব- ৪)- এর বাকী অংশ পরের পোষ্টে]
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



