somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফ্যান

২৯ শে জুলাই, ২০১৩ রাত ৯:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আব্বার শোবার ঘরে একটি ফ্যান ছিল। তিন পাখার নীল রঙের ফ্যানটি কিনেছিলেন ঝিনাইদহ শহর থেকে। সে সময় ফ্যান খুব একটা বিক্রি হতো না জেলা শহরগুলোতে। আব্বা গরম সহ্য করতে পারেন না, আর নিরাপত্তার কারনে বাহিরে ঘুমাতেও পারেন না। বাধ্য হয়েই একটি ফ্যান কিনে নিয়ে আসে বাড়িতে। যথারীতি সেটা লাগানো হয় আব্বার ঘরে।

তখন আমার জন্ম হয়নি। আমার মায়েরও বিয়ে হয়নি। আমার নানা বেড়াতে এসে ফ্যানের বাতাস খেয়ে গিয়ে নানীকে বলেছিলেন ছেলে দেখে এলাম। যেমন সুন্দর তেমনি অবস্থা। তোমার মেয়েকে ওই বাড়ি বিয়ে দিলে গায়ে ঘামাচি হবে না। সারা রাত জেগে জেগে স্বামীর জন্য হাত পাখা দিয়ে বাতাসও করতে হবে না। এমনিই পাখা ঘুরবে। বাতাস হবে। তোমার মেয়ে শান্তিতে ঘুমাবে। নানার কথায় নানী সেদিন রাজি হয়েছিল।

নানি রাজি না হলেও যায় আসে না। বিয়ে হতো। নানা, বাড়িতে যেটা বলতো সেটাই হতো। তার কথার ওপরে অন্য কারো কথার তেমন মূল্য ছিল না। নানা মেয়ে বিয়ে দিয়েছিল। মা ফ্যানের বাতাশ খেতেন আর নায়েরে গিয়ে সখিদের সে গল্প শোনাতেন। সখিরা বলতো কতো সুখ, কত সুখ।
আমাদের কয়েক ভাই বোনের জন্ম হয়। বাড়তে থাকে ফ্যানের বয়স। হারাতে থাকে সৌন্দর্য। ফিকে হয়ে আসে গায়ের রং। খসে পড়ে রংয়ের চল্টা, নড়বরে হয়ে পড়ে পাখা। বাড়তে থাকে ফ্যানের শব্দ। শুধু কমে না বাতাশ। এত বয়সি ফ্যান হলেও মনে হয় বাতাশ আরও বেড়েছে। কয়েক মাস পর পর পরিস্কার করা হয় পাখা। ঝেড়ে ফেলা হয় ধুলোবালি। ভেজা কাপড়ে তুলে ফেলা হয় গায়ের ময়লা।

ধীরে ধীরে বাড়ির মানুষের অবস্থা ভাল হতে থাকে। বাড়তে থাকে ঘরের সংখ্যা। কেনা হয় আরও কয়েকটি ফ্যান। পুরাতন ফ্যান বদলে আব্বার ঘরে লাগানো হয় নতুন একটি। আর পুরাতনটির আশ্রয় হয় খাটের নিচে। বেশ কিছু দিন পরে বাড়ি রং করতে আসা মিস্ত্রি ফিরিয়ে দেয় ফ্যানের আয়ুস্কাল। মা’কে বুঝিয়ে বলে রং করে সেটি। কাজের বিনিময়ে কয়েকটি টাকা পেয়ে খুশি হয় মিস্ত্রি। আর ঝক ঝকে নতুন রংয়ে ফ্যানটি দেখে আরও খুশি হয় মা। পুরাতন ফ্যানের নতুন রূপ দেখে, মা আমাকে বলে ’আমার রান্না ঘরে ফ্যানটি লাগিয়ে দে’।

আবারও সেটি মায়ের কাছে কাছে থাকে। মা দিনে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যায় করে এই রান্না ঘরে। মায়ের কথায় আরও তাকে আরও একটু আয়েশে রাখার আশায় প্রতিস্থাপন হয় রান্না ঘরে।

গ্রামের অন্যসব বাড়ির রান্না ঘরের মত না, আমাদের রান্না ঘর। আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা সমৃদ্ধ রান্না ঘরে আজও ঝুলছে ফ্যানটি। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘুরছে আজও। সুইচ চাপলে কোন ধরনের শব্দ না করেই চালু হয়। বাতাশ বাড়লে বাড়ে একটু শব্দ। মাথার ওপর আপন মনে ঘুরতে থাকে। বাড়িতে গিয়ে মা’কে বলেছিলাম ফ্যানটি বদলে ভাল একটি ফ্যান লাগিয়ে নিতে। কখন মাথার ওপর খুলে পড়ে যায়। কে জানে। মা বলেছিল, ‘না থাক, লাগবি নানে’।

মাঝে মাঝে বাড়ির কাজের লোকজন ওটাকে মুছে ঝেড়ে রাখে। সুইচ চাপলে আজও চলে। মা ওই ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য রান্না করেন। মাদুর পেড়ে খেতে দেন। সেদিন দেখলাম ফ্যানের একটি পাখার কোনা থেকে কিছু অংশ বের হয়ে এসেছে। মাকে বললাম। ওটা নাকি আরও পাঁচ বছর আগে থেকই ওই রকম, মা’য়ের জবাব।

ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছিলাম পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে। একজন বৃদ্ধকে দেখলাম ভয়ানক ভাবে আঘাত পেয়েছেন মাথায়। কেটে গেছে মুখের অনেক অংশ। সেলাই দেয়া হয়েছে প্রায় ৩০টি। ভয়াবহ সেই দৃশ্য দেখে আৎকে উঠি। জানতে চাই কিভাবে হলো এমন?। প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধের স্ত্রী বললেন ’পুরাতন একটা ফ্যান ছিল বাড়িতে, রাতে ফ্যানের পাখা ভেঙ্গে পড়েছে ঘুমন্ত লোকটার ওপর’। সাথে সাথে মনে পড়ে যায়। বাড়ির কথা। মায়ের কথা। রান্না ঘরের ফ্যানের কথা।

বাসায় ফিরে টেলিফোনে মা’কে সেদিন কথাগুলো বললাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন। কিন্তু তার রান্না ঘর থেকে পুরাতন ফ্যানটি সরানো দরকার সেটা মাথায় নেননি।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×