somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডাক্তার মানেই এলিট ক্লাস

২৫ শে মার্চ, ২০১৮ রাত ১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"হাতে কাজ করায় অগৌরব নেই; অগৌরব হয় মিথ্যায়, মূর্খতায় আর নীচতায়।"
মাধ্যমিক স্কুলের বইয়ে পড়া এই লাইনগুলো কচি বয়সে মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। তাই কাপড় কাচা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, সাইকেলের সারাই কি চেম্বারের টুকিটাকি যথাসম্ভব চেষ্টা করতাম নিজেই করতে। মধ্যবিত্তের পরিবারে কাজের বুয়ার উপর নির্ভর করাটাও সম্ভব ছিল না সবসময়। যাই হোক- সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
কয়েক সপ্তাহ CMC ঘুরে অনেক জিনিস দেখছি, শিখছি। এখানে প্রচুর বাঙালী আর বাংলাদেশী আসেন চিকিৎসা নিতে। বলা যায় এখানকার রোগীদের বড় একটা অংশ হল বাংলা ভাষাভাষী লোকজন। তার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগীর সংখ্যা নেহাত কম নয়।
তো বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রায় সব রোগীর একটাই কমন অভিযোগ- আমাদের দেশের ডাক্তাররা একদম যা তা। তাদের দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না। তারা ভালো করে রোগী দেখেন না, অযথা টেস্ট-ফেস্ট দিয়ে কমিশন খান, তারা একগাদা ঔষধ প্রেস্ক্রাইব করেন, তাদের দেয়া ঔষধে রোগী ভালো হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি।
আর এজন্যেই তারা সবাই এখানে চলে আসেন। এখানকার ডাক্তাররা সবাই ভালো, তাদের ব্যবহার বন্ধুর মতো, তারা অল্প ঔষধ দেন, তাতেই সব ভালো হয়ে যায় ব্লা ব্লা ব্লা...
এবার আমি আমার কিছু পর্যবেক্ষণ এর কথা বলি। এখানে ডাক্তাররা একটা কেস ডায়াগনোসিস করতে প্রচুর সময় নেন। এবং সবচেয়ে বড় কথা- প্রচুর ইনভেস্টিগেশন (মানে টেস্ট-ফেস্ট) করানো হয়। প্রচুর মানে প্রচুর টাকারও। ছোটখাটো ইনফেকশন কেসেও কালচার/সেন্সিভিটি করানো হয় এবং সব এই হসপিটালেই। এতসব করার পর ঔষধ দেয়া হয়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ ব্যাপারে আবার বাঙালীর কোন অভিযোগ নেই। বাংলাদেশের ডাক্তার দু'টি টেস্ট দিয়েছে বলে যিনি ডাক্তারের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে মুখে ফেনা তুলে ফেলছিলেন, তিনিও দেখি লাইন দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন খালি টেস্ট ই করিয়ে যাচ্ছেন। আর মনে মনে বলছেন- আহা, এখানকার ডাক্তাররা কত ভালো! পরীক্ষা-নিরিক্ষা না করে ঔষধই দেন না।
যাই হোক, ভালো খারাপ মাপামাপি আমার বিষয় না। আমি দেখলাম- এখানে বাংলাদেশে করা কোন রিপোর্ট দেখা হয় না; মানে ডাক্তাররা ভরসা পান না। সেটাই স্বাভাবিক। যে দেশে ল্যাব টেকনোলজিস্টরা ডা: লিখে প্রাকটিস করার জন্য BMDC সনদ পাবার জন্য আন্দোলন করে, সে দেশের ল্যাব রিপোর্ট যে সারমেয় লেজমার্কা হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সবাই ডাক্তার হতে গেলে ল্যাবে কাজ করবে কে? অথচ এখানে সব স্পেশালিটির আলাদা ল্যাব, আলাদা টেকনোলজিস্ট। তারা কেউ প্রেসক্রিপশন লিখতে চায় না, তারা জানে তাদের কাজটা আসলে কি।
আর একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম- রেফারেল সিস্টেম। এখানে জেনারেল ওয়ার্ডে একজন সাধারণ MBBS/BDS ডাক্তার রোগী দেখেন এবং সময় নিয়েই দেখেন। তিনি যদি মনে করেন এই রোগীর একজন বিশেষজ্ঞ দেখানো প্রয়োজন এবং রোগীর পকেটে যদি টাকা থাকে কেবলমাত্র তবেই তিনি সিনিয়র ডাক্তারের প্রাইভেট এপয়েনমেন্ট পাবেন। আর আমাদের দেশে সামান্য সর্দি-জ্বরেও প্রফেসর না দেখালে হয় না। সামান্য MBBS দেখাবো?!!! রাম রাম- এ যে ভাবাও পাপ!
ফলশ্রুতিতে রোগীর চাপ বাড়ে প্রফেসর লেভেলে আর ছোট ডাক্তাররা বসে বসে মাছি মারেন। আর যখন প্রফেসর দুই মিনিটও সময় দেন না তখন শুরু হয় দেশি ডাক্তারের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার অভিযান।
যাক সে কথা, শুরুর কথায় ফিরে আসি। এখানকার প্রায় সব ডাক্তারদের ব্যবহার আসলেই ভালো। খুব আন্তরিক, আর কেয়ারিং। অনেকক্ষেত্রে দেখেছি ডাক্তাররা স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন রোগী, নার্স কিংবা স্টাফকে দিচ্ছেন না। সকালবেলা যে অধরা ডাক্তারকে পাবার জন্য OPD তে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা, সন্ধ্যার পর সেই ডাক্তারই রোগীর কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটছেন, একসাথে বাজার করছেন, সেই বাজার সাইকেলে বেঁধে বাড়ি যাচ্ছেন। স্বভাবতই এসব দেখে বাঙ্গালী অভিভূত, মুগ্ধ। একজনের ভাষায়- "এখানকার ডাক্তাররা একদম মাটির মানুষ, আমাদের দেশের ডাক্তারদের মত না। তারা রোগীর সাথে মিশেন, কথা বলেন, নিজের কাজ নিজেই করেন। তার উপর কাজ শেষে সাইকেলে বাড়ি ফেরেন, ভাবা যায়!!!" আর আমাদের দেশের ডাক্তাররা দেমাগী, তাদের দেখাই পাওয়া যায় না, তারা সবার সাথে কথা বলেন না, গাড়ি ছাড়া তাদের চলেই না আরো কত কি!
ছোট একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি-
চেম্বার দেয়ার সময় আমার প্রচুর খাটতে হয়েছিল। একে তো স্পেস রেডি করা তার উপর ইলেক্ট্রিক লাইন ঠিক করা, ইউনিট বসানো, ইনস্ট্রুমেন্টস রেডি করা এসব তো ছিলই। নিজের লোক বলতে প্রায় কেউ ছিল না তাই সব কাজের তদারকি আমাকেই করতে হত। আর সেটা করতে গিয়ে অনেক কাজ নিজেকেই করতে হয়েছে। তখন যারা আমাকে দেখেছে কাজ করতে- তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে ডাক্তার আমিই। মুখে তাচ্ছিলের হাসি নিয়ে বলেছিল- "ইবা বলে ডাক্তার!" আশেপাশের মানুষের সাথে সাধারণভাবে মিশাও যে অসম্মানের কাজ- সেদিন বুঝেছিলাম। এদের কাছে ভালো বড় ডাক্তার মানেই এলিট ক্লাসের ধরাছোঁয়ার বাইরের লোক।
আর একদিনের ঘটনা- আমি সাইকেল নিয়ে চেম্বারে গিয়েছি। লক করছি এমন সময় পাশে অপেক্ষারত এক মহিলার কথা কানে এলো। ফার্মেসির ছেলেটা বলছিলো- ডাক্তার এসে গিয়েছেন। মহিলার শ্লেষাত্মক উত্তর- "ডাক্তর এনে আইবনা ওবা, ডাক্তর আইবদে কারত গড়ি (ডাক্তার কি এভাবে আসবে, ডাক্তার আসবে কারে চেপে)"
অথচ এরাই বিদেশী ডাক্তারদের সহজ সাধারণ রূপ দেখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আর দেশের ডাক্তারদের সুবচন দেয়!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মার্চ, ২০১৮ রাত ১:৪৪
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নস্টালজিক

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩৩



আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন আমি ইরানের বিরুদ্ধে-২

লিখেছেন অর্ক, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:১৪



ইরান বিশ্বসভ্যতার জন্য এক অভিশাপ, এক কলঙ্ক। কাঠমোল্লারা ক্ষমতা পেলে একটি রাষ্ট্রের যে কি পরিণতি হয়, তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ ইরান। সম্পূর্ণরূপে অসভ্য বর্বর অসুস্থ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেখানে। যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাগাভাগি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

ভাগাভাগি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এলাকায় এক ইফতার মাহফিল-এ
দাওয়াত পাই আর যথাসময় চলে যাই।
অনেক মানুষ পড়ছে দোয়া দুরুদ
ঘনিয়ে আসছে রোজা ভাঙার সময়।

তখন সবার সামনে বিলিয়ে দিচ্ছে বিরিয়ানি
আমার ভাবনা- হয়ত কেউ ভাবছে
যদি একসাথে খাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৩ এ ওয়াকআউট করেছিলেন, ২০২৬ এ তিনিই ঢাবির ভিসি ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২


২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×