somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অস্তিত্ব ( ছোটগল্প )

২৬ শে আগস্ট, ২০১৬ রাত ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মেঘলাদের আর আমাদের ঘর দুখানা ছিলো একই উঠোনে। স্মৃতিঘেরা মাটির উঠোনখানি। যেখানে আমার একটা স্বত্বা আজও দাঁড়িয়ে আছে কিশোরী মেঘলা হাত ধরে। আমার তখন পনের বছর, মেঘলার বয়স চৌদ্দ। প্রতিদিন ঝগড়া, প্রতিদিন ওর কান্না, আবার প্রতিদিন ওর খিলখিলিয়ে হাসি। কিশোর বয়সে মেঘলার প্রতি আবেগ এই জীবনের জন্য যে কত বড় মাদকতা ছিলো তখন বুঝতে পারতাম না। এখন পারি আর হয়তো জীবনে শেষ দিন পর্যন্ত মেঘলার অভিমানী মুখ হঠাৎ ঝলমলে হাসি দেখার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকবে। মানুষের বেঁচে থাকার মূল সময় শৈশব আর কৈশোর। তারুণ্যে তো কাজের ভারে সন্ধ্যা নামে আর বার্ধক্য অবহেলার অন্ধকারে গুমরে মরে। আমাদের দিনগুলো বেশ কেটেছিলো। কিন্তু একদিন স্কুল থেকে এসে শুনলাম, মেঘলার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।
আমি অবুঝ হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ও তো বাচ্চা একটা মেয়ে। এখন ওর কিভাবে বিয়ে হবে? বাবা বলেছিলেন, ছেলে আর মেয়েদের মানসিক বিকাশ পার্থক্য রয়েছে। মেয়েরা ছেলেদের থেকে অনেক তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। মেঘলার বিয়ের পর দেখবি কি সুন্দর গুছিয়ে সংসার করে। আর তোকে এখন বিয়ে দিলি তো কেঁদে মায়ের আঁচলে লুকোবি।

তখন ঐ কিশোর আর কোতূহলের বয়সে না বুঝলেও আজ বুঝতে পারি মেয়েরা কিভাবে ছেলেদের থেকে অল্প ব্যবধানে বড় হয়ে ওঠে। মেয়েরা ইচ্ছা করে বড় হয় না, বাধ্য করা হয় বড় হতে। একটি কিশোরী মেয়েকে তাঁর আশপাশে থাকা পুরুষের লালায়িত চোখগুলো এক একটি নোংরা হাত হয়ে ওর শরীরের বিকাশকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বাধ্য করে নিজের ভেতরে শিশুটাকে মেরে ফেলতে, তাঁকে কিশোরী থেকে হতে হয় নারী। মেঘলাও পেরেছিলো। কয়েকদিনের মাঝেই মেঘলার বিয়ে হয়ে স্বামীর বাড়ি চলে যায়। ওর স্বামী বয়স ছিলো প্রায় চল্লিশ। কিন্তু অভিজাত পরিবারের রূপকথা শুনলে গ্রাম্য বাবারা যেখানে নিজের সন্তানকে জলন্ত অগ্নিকুন্ডে ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করে না সেখান এই বয়সের ব্যবধান নিতান্ত তুচ্ছ। সময়ের সাথে সাথে আমি বড় হচ্ছিলাম। মেঘলাও স্বামীর বাড়ি বেশ মানিয়ে নিয়েছিলো। বছরে দুই একবার এখানে এসে কিছুদিন থাকত। সব থেকে ভাল লাগত বিয়ের পর মেয়েরা সংসার ছাড়া নিজের চারপাশে যে অদৃশ্য সীমারেখা টানে, আমার জন্য সেটার কখনো অস্তিত্বই রাখেনি। প্রতিবার আসতেই আমার সাথে আগের মত ঝগড়া, মারামারি, ক্ষ্যাপামি। ওর বাবা-মাও ওকে খুব বকত। আমি বুঝতাম। কিন্তু আমার ব্যাপারে ও কাউকে মান্য করত না। খুব ভাল লাগত। কখনো কখনো মনে হত মেঘলার কখনো বিয়েই হয়নি, ও তো এখানেই থাকে। আমি ওর চলে যেতেই আবার অপেক্ষা করতাম আবার কবে আসবে। একবার যাবার আগে খুব করে বলে গেল পরেরবার আসার সময় আমার জন্য একটা সোয়েটার বুনে আনবে। নতুন শিখিছে। বরাবরের মত আমি অপেক্ষায় করে রইলাম। মেঘলা এবার এলো না। আমার খুব মন খারাপ হয়েছিলো সেবার। মেঘলার মাকে যেয়ে প্রায় জিজ্ঞেস করতাম, ও খালা, এবার এতো দেরি হচ্ছে কেন তোমার মেয়ের? খালা শুনে কিছু বলত না শুধু হাসত।

ছয় মাস পর খবর এলো, রান্নার সময় অসাবধানে মেঘলার আঁচলে আগুন লাগে। আশপাশে লোকজন এসে নেভাতে নেভাতে ও জ্ঞান হারায় । হাসপাতাল পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি ওর। তাঁর আগেই মেঘলা মারা যায়। পরে অবশ্য শোনা যায়, ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নাকি পুড়িয়ে মেরেছিলো মেয়েটাকে। ও মৃত্যু সংবাদটা শোনার পর আমি একটুও কাদিনি। শুধু ওর মুখটা একটা ভাববার চেষ্টা করেছি। খুব সুন্দরী ছিল না মেঘলা। গায়ের রং শ্যামলা। মেদও ছিলো শরীরে। থাকার মধ্যে ছিল হাসি। ও যখন হাসত একদম পাল্টে যেত মুখটা। একটা হাসি একটা মানুষকে কতটা নিষ্পাপ করতে পারে সেটা মেঘলাকে না দেখলে কেউ কখনো জানবে না। মেঘলার স্বামী কিছুদিন পরেই নাকি আরেক টা বিয়ে করেছিলো। এই মানুষগুলো জানোয়ারের মত শুধু শরীর খোঁজে, একবার যদি মন খুঁজত, দেখতে পেতো প্রকান্ড মহাসমুদ্রও নারীর মনের গভীরতার কাছে কতটা স্থবির।

মেঘলা মরে গেছে। সত্যি মরে গেছে। আজ বিশ বছর পর কেউ ওকে মনে রাখেনি। এমনকি চার টি সন্তানের জন্মদাতা-দাত্রী ওর মা-বাবাকে অনেকদিন হলো একবার নামটা মুখে নিতে শুনিনি কখনো। শুধু স্কুল থেকে ক্লাস নেয়া শেষ করে যখই বারান্দার নগ্ন চাতালে বসি, তখন ঐ শূণ্য উঠোনে আমি মেঘলাকে দেখতে পাই। বিশ বছর ধরে ওখানে মেঘলা আর আমি একসাথে আছি। কেউ জানে না।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০১৬ রাত ১০:২৬
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছেন

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



যুদ্ধের আগে
আকাশের দিকে তাকিয়ে,
মানুষ নিজ নিজ পতাকা ঈশ্বরের রঙে রাঙায়।

প্রথম আঘাতের পর,
প্রথম রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার পূর্বে,
মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে—
"ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছেন।"

প্রতিটি যুদ্ধের আছে একেকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×