অফিসের একটা অ্যাসাইমেন্টে চিটাগাং-এ আসা। অফিস থেকে আগেই একটা পাঁচ তারা হোটেল বুকিং করা ছিল। রাতে জার্নি করে এসে, কোনও মতে রিসিপশন থেকে রুমের চাবিটা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। আট তলায় আমার রুম।
আমার রুমটা বেশ সুন্দর ছিল। বিশাল গদিওয়ালা বিছানা, বিছানার সামনের দেয়ালে ঝোলানো টিভি, এসি তো আছেই, একটা টেবিল ছিল, টেবিলের উপর আবার একটা চিনামাটির ফুলদানি, ফুলদানিটা অবশ্য খালি ছিল। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে রুমের ওয়াশরুমটা।
-এ সবকিছু লক্ষ করেছি সকালে উঠে। রাতে ঘুমের ঘোরে এসব কিছু চোখেই পড়ে নি।
ব্রেক ফাস্ট করা দরকার। রিসিপশনে ফোন দিলাম। বলল, নিচ তলায় খাবারের ব্যবস্থা আছে, ওখানে সেরে নিতে। প্রথমে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল, এত বড় হোটেল যেখানে রুমে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। তারপর ভাবলাম, আফটার অল এটা বাংলাদেশ। এমন অনেক কিছুই আছে যা বাংলাদেশে হয় না...
আমি একটা সিঙ্গেল টেবিলে বসলাম। একটা চিকেন স্যান্ডউইচের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। হঠাত্ চোখ পড়ল দূরের একটা টেবিলে। মেয়েটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আমার বরাবর মেয়েটা। মেনু কার্ড মুখের সামনে ধরে দেখে চেনার চেষ্টা করছি...
এতো নীলিমা! বয়স অনুযায়ী তাকে আমার "আপু" বলার কথা কিন্তু কখনও বলিনি। আমার ইউনিভার্সিটির দুই বছর সিনিয়র ছিল। দুজনেই মঞ্চ নাটক করেছিলাম এক সঙ্গে। শকুন্তলার এক্ট করেছিল সে। আমাকে বেশ ভালো করেই চিনে...
চোখাচোখি হয়ে গেল। আমি আমার পুরো মুখ ঢেকে ফেললাম মেনু কার্ডটা নিয়ে। চোখ সরিয়েছে কিনা দেখার জন্য একটু উঁকি দিলাম। দেখলাম সে আমার টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে। শেষমেশ নামিয়ে ফেললাম কার্ডটা।
সে এসেই প্রায় চিত্কার করে বলল, আসিফ? এতবছর পরে! কেমন আছো?
আমি হাসলাম, এই তো কোনও রকম চলে..
নীলিমা একটা হলুদ রঙের গাউন টাইপের সেলোয়ার পরা। চারদিকে ছড়ানো। এটা গাউন নাকি সেলোয়ার, এটা নিয়ে নিজে নিজের সাথেই বেশ কিছুক্ষণ তর্ক বিতর্ক করলাম। তবে তাকে দারুণ মানিয়েছে। সেই চুল, সেই চোখের কাজল দেওয়া, সেই ঠোঁট....
নীলিমা পাশের টেবিল থেকে একটা চেয়ার নিয়ে আমার পাশে বসে বলল, -তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে কেন?
এবার কিছুটা লজ্জা পেয়ে গলাম। তবুও মুখে হাসিটা ধরে রেখে বললাম, চাঁদের দিকে সবাই তাকায়। চাঁদ কি কখনও জিজ্ঞাসা করে, কেন তাকিয়েছো?
এবার নীলিমা লজ্জা পেয়ে গেল। বলল, আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। কিন্তু আমাকে দেখলে, তাকিয়ে থাকলে,কিন্তু গিয়ে কথা বললে না কেন?
-চাঁদকে সবসময় দূর থেকেই দেখতে হয় কিন্তু এখন দেখছি চাঁদ আমার কাছে চলে এল...
হেসে দিল নীলিমা। একটুও চেঞ্জ হওনি! কিন্তু এখানে কি করছো? কোনও কাজে?
হ্যাঁ, আসলে অফিসের একটা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এসেছি। কিন্তু তুমি এখানে কি করছো?
নীলিমা দূরে ওর টেবিলের দিকে আঙুল দেখালো। একটা সুদর্শন যুবক বসে আছে। ওই সময় চোখে পড়েনি। লোকটা হাবাগোবার মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বলে উঠলাম, হানিমুন?
এবার সত্যিকারেই ভীষণ লজ্জা পেল। মুখটা ওর লাল হয়ে উঠল...
আমি স্যান্ডউইচটা ওদের সাথে ওদের টেবিলে খেলাম। ওদের রুম চারতলায়। বলল রাতে ওদের সাথে ডিনার করতে হবে। আমার আবার কাজ ছিল, একটা ক্লায়েন্ট আসবে। আমি চলে গেলাম রুমে....
নীলিমা আমার প্রেমিকা না। তবে আমি তার সাথে প্রেম করেছি। একতরফা বলা যায়। ভার্সিটিতে তার প্রতি আমার আচরণে সবাই জানতো আমি তাকে ভালোবাসি কিন্তু কেবল সে-ই জানেনি। কখনও কি সে জানেনি যে একটা ছেলে তাকে ভীষণ ভালোবেসে ছিল?
বহু বছর পরে পুরনো ক্রাশ একই বিল্ডিং-এ হানিমুন করছে। প্রশ্ন হল, আমার হৃদয় কি একটুও পুড়ছে না?
উত্তর হল, না...
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১৬ সকাল ৭:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




