আরবি পড়ানোর হুজুরের মুখোমুখি কম বেশি আমাদের সবাইকেই হতে হয়েছে। যারা মাদ্রাসায় পড়েননি তাদের আরও বেশি। সাত আট বছর হতেই হুজুরদের ডাক পড়া শুরু হয়। 'হুজুর' বলতেই অন্য জগতের, অন্য প্রজাতির মানুষ বুঝায়। আমার মানুষকে বুঝার চেষ্টা করি পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে। এর মধ্যে তিনটি: দেখা, শোনা, গন্ধ, সব ক'টিই বলে দেয় 'হুজুরেরা' অন্য প্রজাতির মানুষ! দেখতে অচেনা লাগে, পোশাক আশাকের জন্য। আতরের গন্ধটায় বরাবর গা গুলিয়ে আসত আমার। আর যা শোনা হয়, তাও চেনা চেনা লাগে না।
আমার প্রথম আরবি শিক্ষক বেশ ভাল ছিলেন। তখন আমার পাঁচ বছর। 'ভাইয়া' ডাকতাম। আরবি পড়তে চাইতাম না। জোর করা হত না আমাকে, কিন্তু বুঝতাম ওখানে গিয়ে বসতে হবে। আমি যেন একটু পড়ি তার জন্য কত কি... চকলেট, চিপস, দুই টাকা বখশিস।
বেশি দূর আগালো না, তখন বাবার কাছেই বাসায় পড়লাম কিছুদিন। দ্বিতীয়জন একজন আপাদমস্তক হুজুর ছিলেন। মানে ওই অন্য প্রজাতির মানুষ। পড়া না পারলে লাল চোখে কি ভীষণ ভাবে তাকাতেন... আর একটাই হুমকি দিতেন: 'এক থাপ্পড় দিয়ে পে.... ছুটাব'। খুব খারাপ লাগত বকাটা। একবার ভয়ে ভয়ে খাওয়ার টেবিলে বলে দিলাম। মা বাবার চোখাচোখি হল, আমাদের হালকা বকা দেয়া হল আগে না জানানোর কারণে। এরপর থেকে আর দেখিনি ওই 'হুজুর' কে।
তৃতীয় জনও পুরাদমে 'হুজুর' ছিলেন। ইয়া লম্বা দাড়ি। চোখে সুরমা। গায়ে আতর। জোব্বা, টুপি আরও যা যা লাগে হুজুর হতে আর কি। এমনকি ভালই পড়াতেন। দারুণ সুন্দর করে আরবি লিখতে জানতেন। কিন্তু একবার ভাইয়া কি দুষ্টামি করায় ওকে কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করলেন।
জানি, এর চেয়েও অনেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আছে অনেকের। পড়া না পারলে গায়ের এখানে সেখানে ডিজাইন করার জন্য বেতের বাড়ি ফ্রি।
এত গেল কেবলই আরবি নিয়ে জোর জবর দস্তি। হিজাব পড়ানো নিয়েও জোরজবরদস্তি কম দেখি নি। কম্পিউটিং ক্লাসে সেদিন অ্যাডাম বলছে, একটা প্রশ্ন করতে পারি? ব্যক্তিগত মনে হতে পারে, কিন্তু আমার খুবই কিউরিয়াস লাগছে।
বললাম, করো, অসুবিধা নেই। জবাব না দেয়ার হলে আমি দিব না।
প্রশ্ন করল: আচ্ছা তুমি যে মাথায় ওটা পড়, এটা কি পছন্দ কর পড়তে? মানে, আমি তোমাকে অপমান করার জন্য প্রশ্নটা করি নি, কিন্তু আমার স্কুলে একটা বন্ধু ছিল যে সব সময় বলত, ওর বাবা ওকে জোর করে পড়ায়। ও খুব অপছন্দ করে হিজাব পড়া...
বললাম, হ্যা রে, আমি পছন্দ করি। কিন্তু ওর বাবা কাজটা খুব অন্যায় করছে!
ওর বাবা অন্যায় করছে, বাংলাদেশের 'হুজুর' নামের প্রজাতিগুলো অন্যায় করে বেড়াচ্ছে, কোরআনের একটা আয়াতের সরাসরি বিরোধিতা করে:
'দ্বীনের ব্যপারে কোন জোরজবরদস্তি বা বাধ্য বাধকতা নেই'। (সূরা বাকার: 256)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



