কলেমা শুধু একটা মন্ত্র নয়। একে কলেমা না বলে 'শাহাদাত' বা সাক্ষ্য দেয়া বলা উচিৎ। এটাই ইসলামে একজনের প্রবেশের চিহ্ন হিসেবে ধরা হয় কারণ মানুষ অন্তরে খোদাই করা কথাই উচ্চারণ করে, প্রকাশ করে, পৃথিবীকে নিজের বিশ্বাস জানায়। সেই বিশ্বাসের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়, সেই বিশ্বাসের প্রতি তার 'এলিজেনস' জানায়। এটাই ছিল মূল আইডিয়া। ঠিক এভাবেই ইসলামের প্রথম যুগে ইসলামে আসত মানুষগুলো। সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে, পরিশুদ্ধ হয়ে। পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে। নিজে চাইতেন বলে। বিশ্বাসটা আগে আসত, তারপরে আসত আর সব কিছু।
কয়েকটা মজার তথ্য দেই। নবুয়াত প্রথম আসার মোটামোটি বারো বছরের মাথায় নামাজ ফরজ হয়। বারো বছর! সময়টা কিন্তু একেবারেই কম না! এই সময়টা দেয়া হয়েছিল, প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষগুলোর হৃদয়ে বিশ্বাস ঢুকানোর জন্য। নামাজ মানে তো কেবল উঠা বসা বা মন্ত্র জপা না... সত্যিই, ইসলামের প্র্যাক্টিসটা ভিতর থেকে বাইরে আসতে হয়। আমাদের দেশীয় (বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কোন অঞ্চলের) স্টাইলে বাইরে চাপিয়ে সেটা ভিতরে ঢুকে যাবে 'একসময়' অমনটা আশা করা অন্যায়। আর হিজাব? সেটা আরও ক্লাসিক, মদীনায় যাওয়ার পরে, মানে অন্তত: নবুয়াতের তের বছর পরে হিজাবের হুকুম আসে। তেরটা বছর পরে! তাহলে এত তাড়াহুরা কেন, ছোট ছোট অনিচ্ছুক মেয়েগুলো, যারা বুঝেই উঠে নি জীবন কি, পথ বেছে নেয়া তো দূরে থাক, বুঝে শুনে বিশ্বাস স্থাপন তো অনেক দূরের কথা, তাদের গায়ে হিজাব চাপিয়ে একটা 'ইসলামিক' ইমেজ সৃষ্টি করা? 'খোলস'? হবে!
জোর জবরদস্তিতে ইসলামের ঘরটা ভাল মতই ভচকে যায়, খুঁটি তৈরি দূরে থাক, একটা ইটও বসে না। বরং অন্য দিকে সুড়ঙ্গ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বুঝেন বলেই সাবধান করে দিয়েছেন দ্বীন নিয়ে জোর জবরদস্তি করা নিয়ে!
এই জোর জবরদস্তির কথা সবাই মুখে কপচায়, কিন্তু পরিবারের প্রশ্ন আসলেই কেন যেন জোর করাটাকে পুরোপুরি হালাল মনে করেন! বুঝি না কেন! বড় পর্যায়ে তো চলেই অহরহ... কি আস্পর্ধায় বোমাবাজী করে যাচ্ছে মানুষগুলো! ওগুলো প্রকৃত ইসলাম না বললেই উঠে হাসি ঠাট্টার রোল। 'আচ্ছা, প্রকৃত ইসলাম তাহলে কি শুনি?'
কোরআন আর হাদীসের সাথে সংঘর্ষশীল যা হয় না তাই প্রকৃত ইসলাম। এই তো প্রমান করে দিলাম, ওগুলো সংঘর্ষশীল। রাসুল (সা) কখনও আতর্কিত আক্রমন করেননি। খুব ভাল করে জানিয়ে শুনিয়ে ঘোষনা করে, যুদ্ধ ক্ষেত্রে সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধে আগ্রহীদের সাথে। তাও শেষ প্রতিকার হিসেবে। কারও উপর 'চাপিয়ে' দেননি যুদ্ধ। ওই কাপুরুষতা নিয়ে আল্লাহর কথা বলতে যায় মানুষগুলো!
আর অন্য ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, সে তো অবশ্যই।
'তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য, আমার দ্বীন আমার জন্য'। (কাফিরুন: 6)
স্পষ্ট ঘোষনা আল্লাহর। প্রাথমিক যুগের সেরা মানুষগুলোর উদারতা দেখে অবাক হতে হয়, তখন প্রতিটা ধর্মের নিজেস্ব ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা তো ছিলই, ছিল উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা। উপাসনালয়গুলোর প্রতি এক বিন্দু অসম্মানের সুযোগ ছিল না। প্রচন্ড পবিত্র মনে করা হত প্রতিটা উপাসনালয়। ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, উমর (রা) গীর্জার কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নামাজের সময় নামাজ পর্যন্ত পড়েছেন। আমাদের সময় অন্য ধর্মের উপাসনালয়কে অতটা পবিত্রজ্ঞান করার সৎ সাহস কি আমাদের আছে?
ওহ নো, ইমান এত ঠুনকো যে, এর পোক্ততা প্রমান করতে অন্য ধর্মের উপাসনালয় পোড়াতে নেমে যাওয়া লাগে? বলছি ব্রাম্মনবাড়িয়ায় কাদিয়ানীদের উপাসনালয় পোড়ানো নিয়ে? নিজেকে ধর্মপ্রান দাবি করা মানুষগুলো ওই কাজ করেছে? কি অদ্ভূদ, এরাই দাবী করে এরা 'মুসলিম'? আল্লাহর কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পন করা মানুষ? কোরআনের আয়াতের সরাসরি লংঘনের পরেও এই দু:সাহস পায় কোথা থেকে?
পুরো ঘটনা আমি জানি না, কিন্তু আমার বিশ্বাসে ওই পোড়ানোর কোন জাস্টিফিকেশন নেই, ব্যাস!
তথাকথিত আত্মসমর্পনকারীদের এই সব অর্থহীন আস্ফালন দেখলে খুব কষ্ট হয় সত্যি!
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০০৬ রাত ২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



