somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আকাশের আয়না সাগরের স্পর্শ - 3

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সন্ধ্যার তেছড়া আলোয় সাগর বড় মায়াবী। ভোরের আলোয় সাগর মাত্র গোসল সেরে আসার সি্নগ্ধতায় ভরা। দুপুরে আবার ঘটনা ভিন্ন। পরিষ্কার আকাশে সূর্যের উজ্জ্বল হাসিতে সাগরও হেসে উঠে আকর্ণ। ঢেউয়ের আকার তুলনামূলক ভাবে বড়, আনন্দে নাচছে যে!

সকালের নাস্তা খেয়ে কাপড় বদলে চলে আসলাম সাগরের সাথে বোঝাপড়ার জন্য। বাচ্চাবুড়োযুবকযুবতী অনেকেই ততক্ষনে সাগরে নেমেছে। আমরা মানুষগুলো থেকে একটু দূরে গিয়ে নামার প্রস্তুতি নিলাম। মুখে এক গাদা সানস্ক্রিন লাগালাম। এমনিই কালো মেয়ে, এর উপর সূর্যের আশীর্বাদে ট্যান লাগলেই হয়েছে, আমাকে আর দেখা যাবে না। তারপরে এক পা এক পা করে এগুলাম, বিশালত্বের দিকে।

হালকা গরম বালু পায়ের তলে আদরের সুঁড়সুঁড়ি দেয়। একটু এগিয়ে ভেজা বালিতে দাঁড়াতেই একটা স্তিমিত ঢেউ এসে পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে গেল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ঢেউ সরতেই সর সর করে বালি সরে গেল পায়ের তলা থেকে। এই অনুভূতির কোন তুলনা হয় না।

হঠাৎ মনে পড়লো আমার কৈশোরের প্রেম ধ্রুবর কথা। দূরবীনের ধ্রুব, রেমি পুরীতে সাগরে নামে ধ্রুবর সাথে, ধ্রুবর সাথে অভিমান করেও নামে একবার ঝড়ের সাগরে। শীর্ষেন্দুর বর্ণিল শব্দগুলো পড়ে খুব নামতে ইচ্ছা করছিল সাগরে, সেবারের পরে সুযোগ আসল এই প্রথম।

কিছুক্ষণ ঢেউ দেখলাম মুগ্ধ হয়ে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তীব্র বাতাসে আলোড়িত নদী দেখলে মনে হয় ক্র্যাপ্টের সিলকের কাপড়। যেন কেউ দুই ধারে ধরে আন্দোলিত করছে বিশাল সিল্কটাকে। সাগরের ঢেউগুলো এমনই, উঁচু নিচু আন্দোলন, বাতাসের সাথে পানির ঠুকাঠুকি। তীরের কাছে এসে ঢেউগুলো ভেঙে যায়, ক্ষ্রীপ্ত ঢেউ সাদা ফেনা নিয়ে ছুঁটে আসে তীব্র বেগে। কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কয়েকটা ঢেউয়ের ধাক্কা খেলাম। পা একটু টাল মাটাল হলো। আমার খুব মজা লাগছিল। সাগরের মত এত বিশ্লাল কিছুর সাথে টেক্কা দিচ্ছি মনে হল। সাগর যেন আমাকে একটু একটু টোকা দিয়ে খেলিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিটা ঢেউ আসে আর আমি তৈরি হই বিধ্বংশী আদরের জন্য। ঢেউ ভাঙতেই, ঢেউয়ের সে কি গর্জন! মনে হলে চ্যালেঞ্জ করছে আমাকে, আমরা পাঁচজন এক সাথে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের সাথে টেক্কা দিচ্ছি। একটু মজা পেয়ে চিৎকার করলাম: কাম অন ম্যান! ব্রিং ইট অন! কাম অন!

সাগর যেন সাড়া দিল, বিশাল এক ঢেউ এলো এবার। আমি উলটা ঘুরে দেঁৗড়। ধাওয়া পালটা ধাওয়া খেললাম কিছুক্ষন এভাবে।

তারপরে আরেকটু এগুলাম। এবার বুক অব্দি পানি। হঠাৎ বড় একটা ঢেউ এসে আমাকে মাটি থেকে উঠিয়ে নিল। কিছু বুঝার আগেই দেখি প্রবল গর্জনে ঢেউ আমার উপর সওয়ার হয়েছে। চোখ খুলতেই পানির বুদবুদ, চারিদিকে সবুজ পানি। চোখে লবন পানির জ্বালা। মুখে লবন পানি। গড়গড়া করার সময় পানিতে বেশি লবণ পড়ে গেলে যেমন, তেমন। পায়ের তলায় মাটিও নেই, কিছু বুঝার আগেই আমি অক্সিজেনের জন্য ছটফট করতে করতে শ্বাস টেনে ফেললাম লবন পানিতে। আর যাই কোথায়, নাকে মুখে তীব্র জ্বালা! কোন মতে উঠে দাঁড়াতেই টের পেলাম ঢেউটা তখন ফিরতি যাত্রায়। গ্রীষ্মের ভাটার সময়ের ঢেউ, তীরের সব কিছু টেনে নিয়ে যেতে চায়। দিল পা ধরে হেঁচকা টান। আবার লবন পানিতে হাবুডুবু খাওয়া!

আরেকটা ঢেউ আসার আগেই চট জলদি উঠে তীরের দিকে দেঁৗড় লাগালাম। ভাগ্যিস পানির বোতল এনেছিলাম, তাই দিয়ে চোখ মুখ ধুলাম, পানি খেলাম। আবার মুখে ভালো করে সানস্ক্রীন লাগিয়ে পায়ে পায়ে এগুলাম সাগরের দিকে। ব্রিং ইট অন বলতেই আমাকে এভাবে ডুবালেন বুঝি বাবু? আচ্ছা! এবার তাহলে শান্তি। আত্মসমর্পন। ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ভেজা বালুতে পা ছড়িয়ে বসে গেলাম। আমার কোমর পর্যন্ত ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে একটু পর পর। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম চারিদিকে মানুষের ঢেউকে জয় করার প্রচেষ্টা। হঠাৎ মনে হল, সাগরের সত্যিই প্রান আছে, সব টের পেয়েই দুষ্টামি করছে!

ভাইয়া বললো, আয় ঢেউয়ে ভাসি। ওর হাত ধরে গেলাম গলা ডুবানো পানিতে। একটু গভীরে, সেখানে দাঁড়ালে বুঝা যায়, সমুদ্র ফুলে ফেঁপে উঠছে। যেন শান্ত, জীবন্ত সাগর নি:শ্বাস নিচ্ছে বলে এমন ফুলে ফুলে উঠে বুক। এক এক বার ফুলে উঠা নিজের দিকে আগাতেই, ঢেউটা ভাঙার আগেই নিজেকে ছেড়ে দিতে হয় ঢেউয়ের গায়ে। ঢেউ আলতো আদরে একটু উপরে উঠিয়ে নেয়। তারপরে আবার ঠিক তেমনই সন্তপর্নে ছেড়ে দেয় সাগরেরই বুকে। তখন মনে হল এত বিশাল বুকে নির্ভয়ে নিজেকে ছেড়ে দেয়া যায়! আবার কখনও সখনও ঠিক ঢেউ ভেঙে যায়। তখন নাক কান চোখ বন্ধ করে পানির নিচে ডুব। একটু পরে মাথার উপরে তীব্র গর্জন শোনা যায়, তারপরে মাথা তুললেই দেখা যায় সাদা ফেনাগুলো মাথার উপর থেকে সরে গিয়েছে।

এমনি করে মোটেমাটে তিন ঘন্টা কাটালাম প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে। ঝগড়া করে, ভাব ভালবাসার বিনিময় করে। মোটেই যেতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু চোখ টকটকে লাল। সানস্ক্রীনেও বেশি কাজ হচ্ছিল না, মুখ হাত কালো হয়ে শেষ। হাত পা ভেঙে আসছিল ক্লান্তিতে, সাথে তীব্র ক্ষুধা। অতএব, সাগরকে বিদায় জানাতে হলো তখনের মত।

[ইটালিক]এখনও চলছে...[/ইটালিক]
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:৫৫
২৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেড ইন বাংলাদেশ ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:২২


দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা আমাদের দেশে ঋতুভেদে বদলায়। তবে ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী সময়ে আমরা এক নতুন ধরনের সিজনাল দেশপ্রেম দেখলাম। একে বলা যেতে পারে "রিটার্ন টিকিট দেশপ্রেম"। যারা দেশে বিদেশে আরাম-আয়েশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের কৃষি আধুনিকায়ন রোডম্যাপ: একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিপত্র রূপরেখা : পর্ব -১ ও ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১১


প্রস্তাবিত রূপরেখা: কৃষিকে জীবিকানির্ভর খাত থেকে প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু-সহনশীল
ও বৈশ্বিক বাজারমুখী বাণিজ্যিক শিল্পে রূপান্তরের জাতীয় কৌশল প্রস্তাবনা ।

বাংলার মাঠে প্রথম আলোয়
যে ছবি আসে ভেসে
কাঁধে লাঙল, ঘামে ভেজা মুখ
কৃষক দাঁড়ায় হেসে।

সবুজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুদের পর্যবেক্ষণ, শিশুদের ভালোবাসা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩


Two for joy!

আমার চার বছরের নাতনি আলিশবা আমাকে ব্রীদিং এক্সারসাইজ করতে দেখলে সে নিজেও শুরু করে। যতটা পারে, ততটা মনোযোগের সাথে অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। আমি ওকে দেখলে কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

×