somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জ্যান্ত পাথর (একটি মাঝারী গল্প)

২৩ শে নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ৮:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.

জ্যোৎস্না আসক্ত রাত্রির পর শিশির ভেজা আজকের সকালটি বেশ স্নিগ্ধ। সকাল সকাল বোকাবাক্সটি চালিয়ে রিমোট ঘুরাই। টিভি স্ক্রিনের স্ক্রল লাইন বলছে 'স্মোকিং কিলস' এবং 'এলকোহল কনজাম্পশন ইজ ইনজুরিয়াস টু হেলথ'। চলচ্চিত্রের প্রারম্ভিক চালচিত্রে দুটি হিতোপদেশ ইদানীং বেশ ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি নির্দিষ্ট দৃশ্যে উক্ত দুই বস্তুর উপস্থিতি থাকলেও স্ক্রল লাইনে সতর্কবার্তার আনাগোনা দেখা যায়। অথচ একটি রেপ অথবা সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্টের দৃশ্য, একটি ঘুষ আদান প্রদানের দৃশ্য, বাল্যবিবাহ এবং যৌতুকপ্রথার দৃশ্য, একটি দূর্নীতি সংক্রান্ত দৃশ্যপট অথবা অন্য যেকোন সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের দৃশ্যও কোন সতর্কবার্তা অথবা আইনবিধির হিতৈষী নোটিফিকেশন ব্যতীতই প্রচারিত হচ্ছে। কয়েকটি চ্যানেলে জীবনভর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে। চলুন ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপন বিরতির কিছু অনুষঙ্গ দেখে আসি। ইলেকশন জেতার অদ্ভুত কৌশল হিসেবে নির্দিষ্ট ব্রান্ডের ঢেউটিন, চেয়ার, সাবান, কাপড় কাঁচার পাউডার, কনডেন্সড মিল্ক ইত্যাদির তুমুল ব্যবহার, ভাইবা বোর্ডে চানাচুরের শক্তি, প্রেমে টুথপেস্ট ও বিস্কুটের শক্তি, পানীয়র সাথে সিংগাপুর- কক্সবাজার-পোখারা-পাটায়া ভ্রমনের অফার, কখনো কখনো ভয়ানক বাংলা ডাবিং এগুলো গা সওয়া হয়ে গেছে। ইদানীং বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর কল্যাণে কাছে আসা কিংবা দূরে থাকার গল্প লিখন প্রতিযোগিতার কল্যাণে কিছু গল্পকারও পাওয়া যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথও এই সেরা গল্প লিখনের পুরষ্কার বঞ্চিত হয়েছেন। মোবাইল কোম্পানীগুলোর তারকা সম্বলিত মাইক্রোস্কোপিক '**শর্ত প্রযোজ্য' পদ্ধতিও এই ক্ষণজন্মা জিংগেল নির্মাতাদের জ্ঞানের ফসল। যে যেভাবে পেরেছেন প্রতিভা ও মেধার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। আজন্ম ক্ষুধার্ত দর্শক গোগ্রাসে সব গিলছেন। নোংরা রাস্তার পাশ দিয়ে হাটলে কাপড় দূর্গন্ধ হয়ে যাবার থিওরিটির আবিষ্কারককে মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে। টিভি বন্ধ করে দিলাম। কেননা ফিরে আসছি বলে যিনি বিজ্ঞাপন চালু রেখে গিয়েছেন, তিনি আধাঘন্টা অবধি নিখোঁজ। বাইরে এলাম। চায়ের দোকানে কয়েকজন মুরুব্বী গণতন্ত্র, দেশ, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে বেশ খোশগল্পে মেতেছেন। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, কোরিয়া, ট্রাম্প, পুতিন সব মিলে সারসংক্ষেপে যেটা দাঁড়ায় সেটা আর গণতন্ত্র থাকে না, সেটা হয় জগাখিচুড়ি তন্ত্র। প্রত্যেক ব্যক্তির জগাখিচুড়ি তন্ত্রে, পৃথক জিনিসের আধিক্য-অচলতা লক্ষণীয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামটির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আজন্ম রিপাবলিকানরা ডেমোক্রেসির দিকে ঝুঁকছেন। ছেলেবুড়ো সবাই রাজনীতি এবং সরকারের মতো জটিল বিষয়গুলো সহজে বোঝার ভান করেন। ভান ধরেনও।

ফেব্রুয়ারিতে অনন্য একটি ঘটনার সম্মুখীন হই। ২১ ফেব্রুয়ারী। বেলা সাড়ে বারোটা। জন্মাবধি ম্যানচেস্টারে বড় হওয়া সিলেট অঞ্চলের জনৈক বাংগালি অভিবাসী আমার রুমে আসেন। বাংলায় পারদর্শী নন। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা এবং ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। হঠাৎ তিনি একটি বইয়ের দিকে তাক করলেন
ঃ - 'হোয়াট ডাজ ইট মিন?'
ঃ- ' সঞ্চয়িতা'।
ঃ- স—ঞ্চ—ই----তা?
ঃ - ইয়া, দ্যাটস এ সিলেক্টেড কালেকশনস বাই ট্যাগোর।
ঃ - ইজ ইট ফিকশন্স অর এডভেঞ্চার?
ঃ - নো দেয়ারস ইউ উইল হ্যাভ এ ক্লাস্টার অভ সিলেকটেড পোয়েমস।

কিছুক্ষণ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে বানান করে করে ভাঙা উচ্চারণে ধীরে ধীরে পড়তে লাগলেন-
"তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।"
....................................................... অনন্ত প্রেম ( রবি ঠাকুর)।

যদিও কো-ইনসিডেন্স। শরীরে শিহরণ টের পেলাম। অন্য অনিন্দ্য অনুভুতি। কড়ি দিয়ে যায় না কেনা। এই অনুভবটি মনে করিয়ে দিচ্ছে জীবনের প্রিয় অনুভবটিকে। অবন্তী, তুমি তো জানো এই প্রিয় অনুভবটির নাম অবন্তী।

২.

অমিত, ঠিকানা বদলে নিয়েছে। তুলিকা মিত্তিরের পাত্তা নেই। মোড়ের চায়ের দোকানে বসে চা গিলতে গিলতে ঘড়ি দেখছি। এইখানেই তো সেদিন একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্বীকারোক্তি রেখে গেছে অবন্তী। অবন্তীর ঠিকানা একই আছে। চশমার ফ্রেম চেঞ্জ হয়েছে দুএকবার, রুচিতে আভিজাত্য এসেছে। ইদানীং সস্তার গলিতে, টিপ-চুড়ি-দুলের মনিহারি দোকানে দেখা যায় না। টুকটাক ভালো খাবারের জন্য শহরের নির্ধারিত দু একটি সস্তা হোটেল ভরসা ছিলো, দরদাম করে আভিজাত্যের জাতে ওঠা যায় না জেনেও দরদাম চলতো। অবন্তীর বাঁকা হাসিতে তবু অপমান বোধ হত না, কেননা একজন পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ়ের ক্লান্ত অবয়ব আমার ভীষণ চেনা ছিলো। আজকাল সেইসব হোটেল অবন্তীর ছায়াও দেখে না। কলেজের বারান্দায় মাথা রেখে বিকেল ফুরিয়ে যাবার পর সন্ধ্যের তাড়া খেয়ে ফিরছে ফাল্গুনের বাতাস। সারি সারি সি এন জি, রিকশা, অটো, মানুষ সব ভেদ করেও আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। রোমান্টিক নই জানি, তবু ফাল্গুনের চৈত্রের বাতাসে মন কেমন করা একটা অনুভব থাকে। স্মৃতির অংগন থেকে, প্রিয় থেকে প্রিয় কয়েকশো সন্ধ্যার ঐ কয়েকটি জনপ্রিয় মুখের কথা মনে পড়ে গেছে তাই।
অবন্তী জেঁকে বসে গেছে হৃদয় নামের এক অদেখা অনুভবে। বোধহয়, এই অনুভবটিই শ্রেষ্ঠ। যদিও আমি ওর বদভ্যাস ছিলাম, অবন্তী আমার নিয়ত অভ্যাস। সে যাইহোক, অবন্তীর ঠিকানাও বদলে যাচ্ছে, রাস্তায় চলাচলের পথও বদলে যাচ্ছে। শতকরা হিসেবে ভালোবাসার মাপাজোখা হচ্ছে ইদানীং।যদি পারতাম, মানে পকেটভরা টাকা থাকলে, অভিজাত বিপণি বিতানে ঘুরে, হাজারটাকায় অল্প খেয়েও আঁচল ভরা সুগন্ধি পেতাম। তখন হয়তো এইসব সাহিত্য-জীবনান্দ-কাব্য থাকতো না। অবন্তীকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। গেলাম। নিজেকে আভিজাত্যের মুখোশে ঢেকে। অভিজাত রেস্তোরায় বসে এক কিশোরীর আক্ষেপ শুনলাম। অখ্যাত এক কবির প্রেমে পড়েছে। পরিবার রাজি নয়। তার বান্ধব-সহচরীরা তাকে ঐ নব্য নটোবরের 'চাল চুলো নেই', 'ভবিষ্যৎ নেই' ইত্যাদি বাক্যবানে জর্জরিত করছিলো। কি অদ্ভুত! ইংল্যান্ড নিবাসী জেন্টেলম্যান এর মতো এই বালিকাও জবাব দিলো, “তাহারেই যেন ভালোবাসিয়াছি যুগে যুগে শতবার”। অভিজাত পাড়ার অন্দরে ওই 'কপর্দকহীন'-এর মসির শক্তিতে প্রবেশাধিকার বেশ বুঝিয়ে গেলো "নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস......ওপারেতে......."। যে পারেই থাকুন জনাব "সর্বসুখ চৌধুরী মহাশয়", মানুষের চাহিদার সমাপ্তি চিহ্ন কিন্তু অসীমে বিরাজমান। তাই সসীমে স্বীয়সীমায় যেটুকু অনুভব দিচ্ছে ফাল্গুন চৈত্রের বাতাস ; সেটুকুর সাথে প্রাক্তন সোনালী অর্জন ভালোবাসার একজন অবন্তীর ক্ষত নিয়ে তবু সুখে থাকা যায়। আত্মহত্যার চেয়ে এই ভালো থাকাটা উত্তম। আপাতত এই অনুভবটি নিয়েই পা বাড়ালাম। রাস্তায় বেশ যানবাহনের ভীড়। ভালো লাগছে না। তোমাকে ভীষণ মনে পড়ছে। ভাবছি তোমার নামে যে নদীটার নাম রেখেছি শিমুলডাঙ্গায়, এখনো বয়ে চলেছে কলকল ছলছল, তার সাথে দেখা করবো একবার।

৩.

ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছি। ট্রেন আসেনি। চট্টগ্রামের ট্রেন সিলেট পৌঁছেনি। অন্য অংশের ট্রেনগুলো আসছে আবার ছেড়েও যাচ্ছে। অন্যের প্রেমিকার প্রতি লোভ করে লাভ নেই জেনেও আমরা অন্যের প্রেমিকার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাই। একেক জনের দৃষ্টিভংগি একেক রকম। সেরকমই স্বকীয় দৃষ্টিতে আমি অন্য ট্রেনগুলোর চলে যাওয়া দেখছি। মাইকে কোন শব্দ এলেই তীব্র মনোযোগ দিয়ে শুনছি। অনেক সময় তীব্র মনোযোগ দিয়ে পড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও পরীক্ষায় আসে না। মাইকের ভাষণও অমনোযোগী ছাত্রের এই মনোযোগী কর্ণপাতের সম্মান দিতে পারছে না। বোধকরি এই রকমই কোন একটা কারণে তীব্র বিশ্বাসও ভেঙে যায়। ভাঙা জিনিস জোড়া লাগেই। সেটা যত্নের সংসারে। একটা কাপের তোড়া ভেঙে গেলেও আঠা জুড়ে দিয়ে ব্যবহার করা হয়। তবে জোড়া লাগে না বিত্তবিভবের অহংকার থাকলে, অযত্নের সংসারে। আমি স্বীকার করি। আমি অগোছালো খুব, এই রেলস্টেশনের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা মানুষের বাক্স-পেটরার মতো। তুমি তো গোছগাছ পরিপাটি ছিলে খুব। আমাকেও গুছিয়ে রাখতে দারুণ। আমি বিশ্বাস করতাম। ইবলিশ শয়তান অবিশ্বাস পাঠিয়ে ডিস্টার্ব করতে লাগলেন। একদিন সায় দিলাম। পরিষ্কার জল ঘোলা হয়ে গেলো। আমি জানলাম নতুন শব্দ। মিথ্যেবাদী। তুমি যে ক’জনকে গুছিয়ে চলতে! তুমি অপরাধ করতে। আর আমি আত্মসমর্পণ করে যাচ্ছিলাম। এই ভেবে যে সিঁড়িপথটাই মহান। তুমিও এই সিড়িটায় একসাথে হেঁটেছ অনেকটা পথ। এখন শুধু পায়ের ছাপগুলো আছে, এই যা। ট্রেন আসছে না। তোমার মতো অনন্তকাল দেরী করছে। অবশেষে অপেক্ষার মানুষের আগমনে যেরকম উচ্ছাস হয় সেরকম একটা অনুভব নিয়ে দেখতে পাচ্ছি সর্পিল বস্তুটি। হুইসেল দিতে দিতে প্ল্যাটফরমে পৌঁছুলো। তুমি তো সংকেত দিয়ে আসতেও না, আভাস না দিয়েই চলে যেতে। এখানে তোমার সাথে ট্রেনের বড় অমিল।
রাতের ট্রেন। আহ শিমুলডাঙা! কতদিন পর। জানালায় বাতাসের ঢল নেমেছে। বাইরে চৈত্রের অদ্ভুত জ্যোছনা। রূপশালী ধানে ভরেছে দুপ্রান্ত। চৈত্রের বাতাস হুহু করে ছুটছে মাঠের এ মাথা থেকে ও মাথায়। চৈত্রমাসের জ্যোছনা যারা দেখেছেন, এই বাতাসের কিরকম টান তা জানেন নিশ্চয়ই। ও হ্যা, জ্যোছনা পড়েছে খুব। আজ জ্যোছনা রাতে একাই চড়ি ট্রেনে। ট্রেন চলছে। অনেকদিন পর ফিরছি। অপেক্ষার ঘোলাটে চোখের অপেক্ষায় যার দিন রাত কাটে, তার জন্য অপেক্ষায় কেউ থাকার কোন সম্ভাবনা নেই। অসম্ভবকে যিনি সম্ভব করেন তিনি একজন অভিনেতা। আমি অভিনেতা নই। তাই অসম্ভব সম্ভব হবার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ট্রেন বাঁক নিয়েছে। প্রকান্ড বগিগুলো ভীষন দুলছে। যতদূর দেখা যায় বগির দুলুনি দেখছি। মনে হলো প্রচন্ডভাবে দোলখাচ্ছে কতগুলি দৃশ্যপট। সারিবদ্ধ। এরকম অনেক চড়াই উৎরাই জীবনের ইঞ্জিনে বেঁধে আমিও চলছি। মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাপটা লাগে। আমি দেখতে পাই একরাশ চুল উড়তে উড়তে মুখের উপর লাগছে। কেমন জানি একটা সুগন্ধ ছিলো। ট্রেন থেমো না। চলতে থাকো। অনন্তকাল সে চুল আমার মুখেই উড়ে পড়ুক। ট্রেন কথা রেখেছে। চলছে। শুধু সে কেশবতীজন নেই। নেই সে সুগন্ধি রাত। মানুষ ঘুমালে স্বপ্ন দেখে। আমি সুগন্ধ পাই। স্বপ্নগুলো সুগন্ধ ছড়ায়। রূপশালী ধানক্ষেতে বাতাসের মাতম দেখেও তোমাকে মনে পড়ে গেছে। সবি তো এই বাংগালি সেন্টিমেন্টের ফলাফল। আজ কাল আজ কাল করে করে দহনকাল এলে পরে কাজের কথা মনে হয়। তাই তো ভুলে যাবো যাবো করেও ভুলতে পারছি না, জানো! কেউ ভুল করে না, ভুল করার অভিনয় করে মাত্র। তোমার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেছি। জেগে দেখি ভোর হয়ে গেছে, ট্রেন থেমে আছে। কি যেন একটা আন্দোলনের কারণে পথ আটকে দিয়েছে কেউ। একে তো ট্রেন লেট, তারউপর এই নতুন উপদ্রব। এটা কোন জায়গা? জানতে ইচ্ছে হলেও, কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না। শিমুলডাংগা কতদূর। মনে হচ্ছে পৌঁছতে রাত হবে। ট্রেন থেকে নেমে বাস ধরে আরো তিন ঘন্টার পথ। এরপর আরো কিছুদূর হেটে যেতে হবে।

৪.

দীর্ঘকায় বটগাছটির বয়স জানা নেই কারো। ডাল থেকেই শিকড় বের হয়ে কোথাও কোথাও গুড়িতে পরিণত হয়েছে। চৈত্র মাসের রাত। আকাশে মেঘের ছিটেফোটা নেই। হাঁপিয়ে উঠছে মানুষ, গাছপালা, নদীনালা। শশীদের পুকুরপাড়ের এই গাছটা কালের অনেক ইতিহাসের জলজ্যান্ত স্বাক্ষী। অন্ধকার রাস্তায় পায়ে হাঁটা পথে বাজার থেকে বাড়িটার দূরত্ব মাইলখানেক। আর বটের ছাঁয়াটুকু পেরিয়ে গেলে তারপর শশীদের পুকুর ঘাট। ঘাট পেরিয়ে ডানে বুনোঝাড় দুপাশে নিয়ে সরু পথে দু’এক পা এগোলেই আমাদের বাড়ি। অনেক দিন পর শহরের যান্ত্রিকতা, ইটপাথরের মেসবাড়ি, ড্রেইনের ময়লা গন্ধ, চব্বিশঘন্টার হর্ণ, হুইসেল, সব ছেড়ে পাড়াগাঁয় এলাম। ছুটি কাটাতে আসিনি। হাফ ছেড়ে বাঁচতেও নয়। তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো খুব। কি করবো বলো? সে উপায় নেই। তাই রূপসী নদীটাকেই দেখে যাই।
আমাদের বাড়িটা অনেক পুরোনো। আদিকালের ইটপাথর এখন অনেক বুনো গাছের অবলম্বন। সেকেলে বাড়ির আশপাশে গাছপালার বাড়াবাড়ি সমাহার। আর আছে প্রকান্ড এক লোহার গেট। শুনেছি একসময় আমাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে রাজত্ব করেছেন। বিশাল জমিদারি ছিলো। এখন আদিকালের অট্টালিকার ক্ষুদ্র ভগ্নস্তুপের তিন তলা অবধি অবশিষ্ট কয়েকটি শোবার ঘর, রসুই ঘর, হাম্মামখানা নিয়েই বাড়িটা আমাদের ভার বহন করে যাচ্ছে নিয়মিত। সিংহদরজার মাঝ বরাবর প্রকান্ড একটা পাথুরে সিংহ প্রহরী বিহীন এই সাবেকি হালের বাড়িটিকে নিয়মিত পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। গেটের ঠিক বাঁয়ে, একটা মাধবীর লতাঝাড়, আর ডানে রবি ঠাকুরের বাগানবিলাসী। রাতের মৃদু হাওয়ায় দোতলার জানলার অব্যর্থ লক্ষ্য ভেদ করে এই মাধবীর ঘ্রাণ আমার ঘরে পৌঁছাতে এতটুকু বিলম্ব করেনি কখনো। মূল ফটকে কেউ নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাড়িতে কুকুরের বালাই নেই যে মানুষের উপস্থিতি টের পেলে চিৎকার করে অন্দর মহলের বাসিন্দাদের খবরটা পৌঁছে দিত। ধাক্কা দিতেই সেই পুরোনো শব্দ, জং ধরা কলকব্জার এই শব্দটা আমার শত জনমের চেনা, এই শব্দটাও যেন দারুণ সুরেলা। অনেক দিন পর শৈশবের গন্ধ মেশানো উঠোনে পা দিলাম। এই গাঢ় অন্ধকারে শৈশবের সেই আঁধার ভীতির দিনগুলো, বৈশাখের আম কুড়োনো ভোর, উঠোনে মাদুর পেতে হারিকেন আর কেরোসিন কুপির আলোয় বসে শোনা এ বাড়ির আনাচ কানাচে ছড়িয়ে থাকা হাজার খানেক ভুতের খোশগল্পেরা, যেনো দীর্ঘদিন থেকে আমার পিছু নিয়েছে।
দোতলায় উঠতেই ডাক পেলাম, জেঠিমার।
ঃ- নীলুরে, নীলু।
নীলু আমার জেঠাত ভাই। অনেক বছর আগে একদিন দুপুর বেলা বাড়ি ফিরে দেখি পুকুরে জাল ফেলছে। হয়তো মেহমান আসবে তাই। রাজত্ব নেই তো কি হয়েছে, আভিজাত্য রক্ত থেকে মুছে ফেলা যায় না। পিসির বিয়ের সময় ঠিক এভাবেই জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়েছিলো। জোড়পুকুরের আমরা কেউ যেতাম না। ঠাম্মা বলতো- "ওর টান আছে। ওরে, ভর দুপুরে একা একা ঘাটে যাস না যেন কেউ"। ছোট্ট নীলুর জন্য খোলাঘাটের চারপাশে শক্ত করে বেড়া দেয়া হলো। কিন্তু পুকুরের টানের সাথে বাঁশের কাঠামো, যুদ্ধে হেরে গেলো। জালভরে মাছ নয় নীলুকে তুলে এনেছিল ওরা। ছোট্ট নীলু। ইশ। তারপর কেউ আর দাদাভাই বলে ডাকে নি তো কোনদিন! কত মেলার দিন কেউ বায়না করে নি, ঘুড়ির, লাটিমের, লজেন্সের। জেঠিমা, মানে আমাকে কোলে পিঠে করে বড় করেছেন যিনি, তারপর থেকে যাকে দেখেন, তাকেই নীলু বলে ডাকেন।

ছোটবেলায়, খুব ছোটবেলায়, যখন বুঝতে শিখিনি ভালোভাবে, অন্য ভাইবোনদের সাথে ঠাম্মার মুখে এ বাড়ির শান শওকতের কথা, আনাচ কানাচের হাজারো ভুতের গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম, তখন কেউএকজন কোলে তুলে বাড়ির টিকে থাকা একমাত্র পালঙ্কে রেখে আসতেন। গভীর রাতে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে হাতড়ে হাতড়ে ছেলেটা আলুথালু ঘুমন্ত নারী অবয়বটি জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে আবার ঘুমিয়ে পড়তো। তখন হয়তো সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ঘুমের অতলে তিনি। সেই ঘুমন্ত মাংস পিন্ডটা জড়িয়ে ধরে ছেলেটা বোঝার চেষ্টা করতো মা নামক তার একান্ত আপন এক সম্পদ আছে। সকালে রসুই ঘরে মাটির চুলোয় রান্না চাপানোয় ব্যস্ত থাকা মার কাছে রেলিং ধরে ধরে পৌঁছে যেতো। তারপর মা, মা বলে খুশিতে রেলিং ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতো। মা, তার কাজ ফেলে ছেলেটার গাল টিপে নাক টিপে বলতেন- 'রঞ্জু, রঞ্জু। যাদু আমার।' ছেলেটা বলতো – “মা, নন্দু নন্দু”। বলেই খুশিতে খিলখিল করে হেসে উঠতো। ছেলেটার দুষ্টুমি ভরা চোখে মার চোখ আটকে যেতো স্থির স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্নালু চোখ দুটি বুজে একদিন সকালবেলা জলখাবারের পর উঠোনে বেতের মাদুরে ঠিক রাত্তিরের পালঙ্কের মতো আলুথালু বেশেই ঘুমিয়ে ছিলেন মা। ছেলেটা হামাগুড়ি দিয়ে মার গায়ে হাত দিয়ে বলছিলো- 'মা, মা, নন্দু নন্দু।' 'রঞ্জুরে, জাদুরে, মানিকরে' বলে সেই তখন থেকে আর কোনদিন মায়াবী হাতে জড়িয়ে নেয়নি কেউ। ছেলেটা মার জবাব না পেয়ে, নাকি এত ভীড় দেখে হু হু করে কেঁদে উঠলো, কেউ জানে না সেকথা। তবু হয়তো ওর কান্না দেখে উঠোনভর্তি লোকেদের চোখেও জল এসেছিলো সেদিন। ছেলেটা আমি। জন্মের ঠিক দেড় বছরের মাথায় নির্ভয় সুগন্ধী আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হলো রঞ্জু।

এগুলো সব কাকি, ঠাম্মার মুখে শোনা কথা। তারপর জেঠিমাই আমাকে মানুষ করার ভার নিলেন। ছোট্ট রঞ্জু কখন যেনো জেঠিমাকে মা বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছে তা হয়তো নিজেও জানতো না। একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। আমি তখন সবে শিমুলডাঙ্গার পাঠশালার গণ্ডি পেরিয়ে বোর্ডস্কুলে ভর্তি হবো। লম্বা ছুটি। সময় কাটে না তাই আমাদের এই প্রাচীন অট্টালিকার আনাচে কানাচে খুজে বেড়াই যখের ধন। যখ তো জোটেইনি। না জুটেছে মহরের ঘড়া। কতকগুলো ফোটোগ্রাফ পেয়েছিয়াম। সেকালের। দু'জন বাদে আর সবাইকে চিনতে পারি। ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলেন না। আমাদের বাড়ির কাজের লোক বিধু কাকাই কেবল চোখ মুছতে মুছতে বললো, “রঞ্জু, এটা তোর মা, আর এটা তোর বাবা”। সেই বুঝ হবার পর জন্মের প্রায় এগারো বছরের মাথায় প্রথমবারের মতো সাদাকালো ফোটোগ্রাফে মাকে আর বাবাকে দেখলাম। শশীদের ঘাটে বসে সেদিন সুগন্ধী নির্ভয় আশ্রম মায়ের কোলটায় মাথা গুঁজে অবুঝ বয়েসের অনুভুতিটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। অথবা চেষ্টা করছিলাম বুঝতে যে, আমাকে বুকে জড়িয়ে মার কেমন লাগতো। সেসব পুরোনো দিন। সেসব মনে থাকেনি কেনো? কার উপর প্রচণ্ড অভিমান হচ্ছিলো, কার উপর রাগ হচ্ছিলো খুব বুঝতে পারছিলাম না। আমার চোখে টলমল বিশুদ্ধ ভালোবাসার জল। কাঁদার সময় কাউকে জড়িয়ে ধরলে মন ভরে কাঁদা যায়। আমার নিঃসঙ্গতা ছাড়া আঁকড়ে ধরার মতো আর কিছুই ছিলো না। চোখটা বুঝে সাদাকালো ফোটোগ্রাফের ওই মায়াবী সুগন্ধের আবেশটা জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। ওই বটগাছ এই ঘটনার স্বাক্ষী। এখনো যখন রাতের বাতাস জানলা ভেদ করে মাধবীর ঘ্রান নিয়ে আমার ঘর ঘুরে যায়, পরম আবেশে চোখ বুজে আসে। হয়তো মায়ের ঘ্রাণ ছিলো মাধবী ফুলের মতো । হয়তো সেজন্যই; বাবা ঠিক একারণেই মাধবীর লতা এনে লাগিয়েছিলেন।

জন্মের পর এই বাড়ি, এই গ্রাম, গঞ্জের পাঠশালা ছাড়া আমার পৃথিবীতে আর কিছুর জায়গা ছিলো না। তারপর মফস্বলের বোর্ড স্কুলে এসে গজ ফিতা দিয়ে মেপে ফেলা এই শিমুলডাঙ্গার বাইরের পৃথিবীর সাথে ধীরে ধীরে যোগাযোগ বাড়ে। আমি অবাক হয়ে দেখে গেছি, ঠেকে শিখেছি, এত বৈচিত্র্য! মাপতে পারি নি কোন পরিমাপে। জেঠিমা ডেকেই যাচ্ছেন- নীলুরে, নীলু। আমি বললাম - মা, এইতো আমি। “কোথায় ছিলি বাবা, জাদুসোনা? কতদিন তোর পথ চেয়ে বসে আছি! ক্ষিদে লেগেছে নিশ্চয়ই। খাবি না, আয় তোকে খেতে দি”।
জেঠিমা নিজ হাতে খাইয়ে দেন নীলুকে; মানে আমাকে । আর আমি আমার গল্পে শোনা, সাদাকালো ফটোগ্রাফের মার কথা ভাবতে থাকি। এইসব সময় জেঠিমা, বেশ খোশ মেজাজে থাকেন। তার নীলুকে তিনি কতদিন পর যত্নাআত্তি করে খাওয়াচ্ছেন!

বাইরে এলাম।হাটতে হাটতে নদীর কাছাকাছি চলে এলাম। নদীর নাম গুঞ্জন। কেমন সুন্দর নাম না? কে কখন কেন গুঞ্জন নাম রেখেছিলো জানা নেই। নদী চলার পথে নূপুরের একঘেয়ে সুরের মত তান ধরে চলছে সেই কবে থেকে, বোধহয় এজন্যেই এর নাম গুঞ্জন। নদীর ধীর বহমান জলরাশি থেকেও একঘেয়ে সুরের মতো শব্দ আসছে- রঞ্জুরে, রঞ্জু। জোড় পুকুরের জলের স্পন্দনেও সেই একই ডাক- রঞ্জুরে, রঞ্জু। ঘরে ফিরলাম অনেক রাতে। বিছানায় পড়তেই রাজ্যের ঘুম। ঘুমের সাথে স্বপ্ন। দেখি, পৃথিবীর যত উৎস্য আছে সব জায়গা থেকে একটা কথা আমাকে জেঁকে ধরেছে- রঞ্জুরে, রঞ্জু। সে শব্দে একটা বিষাদের গল্প আছে। এই কয়েকটি শব্দ আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে আজন্ম। তুমি নেই , বোধকরি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত আশ্রয়ই আমার ভরসা ছিলো। এই আশ্রমটি আছে, আশ্রয়টি নেই। আশ্রয়টিকে যে চিনতো সে নন্দু, সে মায়ের রঞ্জুসোনা, বুকেরমানিক। আমার শৈশবের ওই নন্দুকে হিংসে হয় খুব। সে মাকে চুমু খেয়েছে, সে মায়ের চুমু খেয়েছে। আমারু খুব ইচ্ছে করে নন্দুর মতো মাকে চুমু খাই। মায়ের উপরও অভিমান হয়। সে নন্দুকে ভালোবাসতে পারলো, রঞ্জুকে ভালোবাসার জন্য আর কটা দিন থেকে গেলে কি এমন হতো !
কোথাও কেউ নেই। নিঃসংগতাও নিঃসঙ্গতর হতে হতে নিঃসঙ্গতম হবার ভয়ে আমাকে ছেড়ে যাবে মনে হচ্ছে। সবটুকু জুড়ে নস্টালজিক সময়। আমি পারছি না ভালো থাকতে। অবন্তী, ফিরে এসো প্লিজ।
৫.

তুমি ইদানীং আরো জেঁকে বসে যাচ্ছো। কদিন নদীটার সাথে কাটিয়ে চলে এলাম মাটির গন্ধ ছেড়ে শহরের জঞ্জালে। টেবিলের উপর তোমার দেয়া হাত ঘড়িটা তোমার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, অবন্তী। অবন্তী, আমি ভালো নেই। কোথথাও মনোঃসংযোগ করতে পারছি না। চায়ের কাপ থেকে উত্তাপ চলে গেলে হুশ হয়। তুমি চলে যাবার পর সকাল বিকেল রাত একই রকম লাগে। ভোর অথবা গোধূলির রাঙ্গা আসমান দেখে মন কেমন কেমন করে না আর। তোমার মনে আছে? আমাদের একসাথে প্রথম সমুদ্র দেখার স্মৃতি? একটি সাদা ঝিনুক, পিঠে এসিডে ঝলসানো দুটো অক্ষর। এরকম আরো একটি ঝিনুককে মনে পড়ছে। ঝিনুকের বদলে ঝিনুকের স্মৃতি রেখে আসার দিন ঠিক আজকের এরকম কোন নিঃসঙ্গতাই ডেকে এনেছিলো মন কেমন করা বিষাদ। প্রবালের রাজ্যে ঝিনুকের বাড়ি যেখানে, সে বালিয়াড়ি সৈকতের টুকরো টুকরো কথা মনে পড়ছে। জোয়ারে উত্তাল, ভাটায় শান্ত , ভারসাম্যের সূত্রটি মেনে চলা সমুদ্রের কথা মনে পড়ছে। সে এক অনন্য অনুভূতি। ঐ বিস্তীর্ণ জলের সুবিশাল রাজ্যে কত নদী ঠিকঠাক নিজে নিজে পথ চিনে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। আমি চিরচঞ্চল যে নদীটি কিনতে চেয়েছি, সে তুমি। অবন্তী, তুমি আমার দেখা প্রথম নদী, থামতে জানো নি। তোমার চিরযৌবনা উচ্ছল তরঙ্গ কোন সাগরের, কোন ঝিনুকের তা বোধগম্য ছিলো না। তবু তোমার দেয়া এই শ্বেতকায় ঝিনুকটি যে হৃদয়ের দাবিদার তা ঠিক বলেই জানি। ঠিক ক'বার দিক বদলেছো ! আচ্ছা, তোমাকে তো বলা হয়নি। একটা নদের গল্প বলেছিলাম, মনে আছে? ওর নাম দিয়েছি গুঞ্জন। গুঞ্জনের কাছে তোমার গল্প বলেছিলাম। ভাবলাম তোমার নামটা ওকে শিখিয়ে যাই।
"গুঞ্জন, বলো- অবন্তী, অবন্তী"। সে বলে 'কলকল ছলোছল', 'কলকল ছলোছল', । গুঞ্জন একবারও অবন্তীর মত সুর তোলে না। শেষটায় হাল ছেড়ে দিয়ে সুনীলের কবিতার মতো নদের বিনিময়ে পাহাড় কিনে নিলাম একটা। পাহাড়ের কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলি" অবন্তী "। সাথে সাথে অনেক সুরে পাহাড় উত্তর ফেরত দিলো অবন্তী, অবন্তী, অবন্তী। কান পেতে শোনো, আমার বুকের ভেতর সেই পাহাড়ের অনেক সুরের, অনেক স্বরের বিষাদ ব্যথা। তুমি যেদিন চলে গেলে, সুদীর্ঘ দুঃসহকাল বেদনার করাঘাতে কাঁদতে ভুলে যাওয়া আমি অনেক দিন পর আবার কেঁদেছি। অবন্তী, চলে যাবার জন্য অজুহাত লাগে না কোন। শুধু সুযোগ বুঝে অজুহাতটাকে পাকাপোক্ত কারণ বানিয়ে দিয়েই চলে যাওয়া যায়। সম্পর্কগুল গড়ে উঠছেই কেবল স্বার্থের জন্য। ভাঙছেও ঠিক স্বার্থের জন্যই। আমি নই শুধু, চেয়েছিলাম তুমিও ভালোবাসবে। নিঃস্বার্থ নয় কেবল। নিখাদও বটে। শুধু চেয়েছি কেউ একজন আমার থাকুক। অল্পই হলেও ভালোবাসুক।

খুব নিঃসঙ্গ মনে হলে আমার ছাদ থেকে কাছের দূরের অট্টালিকার গাঁথুনি দেখি, আর ভাবি এত এত বাসাবাড়ির এত এত মানুষগুলোর ভেতর সুখে আছে কি কেউ? মাঝে মাঝে ধবল জ্যোৎস্নার রাতে মৃদু বাতাসে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।কখনো কখনো মলিন সাদাকালো ফোটোগ্রাফের মত কুয়াশা ভেদ করে ঝুলিভরতি দুঃসহকালের আগেকার সোনালী কাল থেকে স্বপ্নেরা ঘিরে ফেলে আমাকে। দেখি মহাকাল থেকে একটা ত্রিচক্রযান আমাকে পেছনে ফেলে দ্রুত পাশ কাটিয়ে যাবার সময় চীৎকার করে ওঠে, "শামসু কটেজ"। কেউ আমাকে তোমার ছবি চিনিয়ে দিচ্ছে। কখনো বাতাস ছাপিয়ে বিষাদ কন্ঠের একটা ডাক শুনি। তিনটে অক্ষর খোদাই করা সে ঝিনুকের ওপর যে নামটি, সে নামের সাথে এই ডাকেরও অদ্ভুত মিল। ওটা আমারই কন্ঠ । নিজের স্বর শুনে নিজেই আতকে ঊঠি। চিনতে কষ্ট হয় । শুধু ভাবছি নিষেধের পর অবুঝ আমি বুঝের মতো নিষেধ মেনে, নিষেধ বেধেও দিলাম। কখনো একলা সময়ে অসম্ভব কল্পনা করেই ফেলি, অবন্তী, ফিরে এসে বলছে- 'আমি কিন্তু বারবার ফিরেছি।

৬.

আমার সাথে মিথ্যে বলার প্রয়োজন ছিলো না। তুমি আমার কাছে চাইলেই আমি তোমাকে যেতে দিই। অথচ মিথ্যে বললে? এটা আশাতীত ছিলো। এত কিছুর প্রয়োজন ছিলো না। যার বা যাদের কাছ থেকে আমাকে মুক্ত করতে চেয়েছিলে, তুমি তাদের কাছেই হেরে গেলে। কথা দিচ্ছি আমি কোন সমস্যার কারণ হবো না। আমি ঝড়ের মতো এসেছি। সব শেষবারের মত আড়ম্বর করে আর শেষ হলো না। সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। আমার যা আপন ছিলো তাও রইলো না। আমি ঠিক পথ চিনে চিনে একা একা অনেক দূর এসেছি। আরো যেতে পারবো। বৈশাখের কালবৈশাখী আমার ছিলো, আছে। অনেক অনেক কঠিন জিনিস ও আমার আছে। অথচ এত সরল তুমি থাকলে না। পাশ কেটে যাওয়া যানবাহন যন্ত্রের কাছে আমার হাঁটার গতি হেরে গেছে। আমার সাথে হাঁটলে তাল মিলাতে হিমশিম খেতে। অনুযোগ করে বলতে 'আস্তে হাটতে পারিস না?' তোমার সাথে তাল মিলাতে মিলাতে এখন জীবনের সাথে তাল মিলাতে হিমশিম খাচ্ছি। আর আমার সাথে তাল মিলাতে মিলাতে তুমি হুশ করে পাশ কাটিয়ে চলে গ্যাছো বহুদূর। তোমাকে অভিনন্দন।
একটি জীবন পেরোতে কতস্টেশনে থামবে! তোমার স্বস্তির নিঃশ্বাসের অহংকার এই পাহাড়ি স্টেশন। কেননা পাহাড়ের জল হাওয়ায় একটা বিশুদ্ধতা আছে। তুমি এসে থেকে গেলে ক্ষণকাল। অথচ কি এক প্রচণ্ড বিশ্বাসে আর কাউকে থামতে বলিনি। এখন এ স্টেশনে কেউ থামতে চাইলে বলি- "এখানে এক পৃথিবী মিথ্যের ক্ষত। জল ফুরিয়ে গেছে, বাতাসও।"

তোমাকে ভীষণ পাথর মনে হয় মাঝে মাঝে। হঠাৎ দেখি তুমি পাথর নও। তুমি তো নদী আমার, বয়ে যাও ছলোছল। শৈলপ্রপাতের যে পাথরের উপর জল গড়িয়ে যায়, সে পাথর স্থির। গড়িয়ে গেলে আর ফেরে না জল। আমি তোমায় ছেড়ে আর কোথাও যাই নি তো। বুকে শ্যাওলার জন্মকথা লিখে রেখে তুমি গড়িয়ে গেলে নদী, আর আমি হলাম জ্যান্ত পাথর। আকড়ে ধরবো ভেবেছি, অথচ তুমি পিছলে গেছো। হয়তো আমার এই আঁকড়ে ধরাটাই ভুল। এভাবে নিঃসঙ্গ শব্দহীন বেঁচে থাকাটাকেও তুমি জীবন বলছো। অবন্তী আমি বেঁচে আছি। আমিই পাথর। জ্যান্ত পাথর। জ্যান্ত পাথরের মৃত্যু নেই।


ভভ

সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ৮:২৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চাদ–লিবিয়া যুদ্ধ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ২:০৭



ছবি: যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে টয়োটা যুদ্ধের সময়ে একটি টয়োটা পিকআপ থেকে চাদীয় সৈন্যরা

চাদ–লিবিয়া যুদ্ধ ছিল ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে লিবীয় ও চাদীয় বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত কয়েক দফা বিক্ষিপ্ত যুদ্ধ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসরায়েলী ভোট, নাতানিয়ানাহু পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:০৬



***আপডেট: ৯৫% ভোট গণনা হয়ে গেছে। ( সেপ্টেম্বর ১৯)

লিকুদ দল পেয়েছে: ৩১ সীট
নীল-সাদা দল পেয়েছে: ৩২ সীট
বাকী দলগুলো: সর্বাধিক ৫৭ সীট... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের ইতিহাস : ঘটনাপঞ্জি ও জানা অজানা তথ্য। [২]

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:১৮


[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/Rafiqvai/30280327|মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের ইতিহাস : ঘটনাপঞ্জি ও জানা অজানা তথ্য। [১]]
২য় পর্ব
যুক্তফ্রন্ট গঠনঃ
৪ ডিসেম্বর, ১৯৫৩।
প্রধান সংগঠকঃ মাওলানা আব্দুল হামিদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশে হচ্ছেটা কি!!!

লিখেছেন সাকলাইন তুষার, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৩৪

বাংলাদেশের জাতীয় ডাটা সেন্টারে নাকি অনেক অনেক ভুয়া ভোটার আইডির ইনফরমেশন পাওয়া গিয়েছে,এদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। এই আইডি ব্যবহার করে পাসপোর্ট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পেপারও বের করে নিয়ে যাচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরীচিকা ( পর্ব - ২৮ )

লিখেছেন পদাতিক চৌধুরি, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:০৭



সেদিন ইচ্ছে করে কিছুটা খোঁচা দিতেই মিলিদিকে জিজ্ঞাসা করি,
-আচ্ছা মিলিদি, রমেনদাকে তোমার কেমন লাগে?
আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে মিলিদি বরং কিছুটা উদাস ভাবে ম্লান মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×