আমার গত পোস্টটি ছিল স্বাধীনতা দিবস সম্পর্কে। এত এত তথ্য বিভ্রাট হচ্ছে যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা কিছুই ঠাহর করতে পারছিনা। তাই ব্লগার বন্ধুদের সাহায্য চেয়েছিলাম। অনেকেই চেষ্টা করেছেন সাহায্য করতে হয়ত কিন্তু তা মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না। আমি কৃতজ্ঞতার সাথে ধন্যবাদ জানাই তাঁদের।
অনেক তথ্য আছে কিন্তু নির্ভরযোগ্য পাওয়া খুব মুশকিল। তাই শুধু অথেনটিক বা বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে জানার চেষ্টা করছি। কিন্তু সেখানেও মহা বিপদ। তথ্য সংশ্লিষ্ট যৌক্তিকতা খুবই দুর্বল, অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী বা স্ববিরোধী। তার কিছু নমুনা দেখি আমরা...
১.
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর দলীয় সাইটে বলা আছে ১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
২.
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর সাইটে বলা আছে আরও একধাপ এগিয়ে। একেবারে দিনক্ষণ সময় উল্লেখ করে। বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেবার অপরাধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১-১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২নং বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে।
*** এখানে কিছু স্ববিরোধী তথ্যও আছে। যেমন প্রথমতঃ আওয়ামীলীগ বলছে ২৬শে মার্চ গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তাহলে তাঁরা কেন বলেন যে ২৫শে মার্চ সেই কালো রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে ঘুমান্ত মানুষের উপর পাকবাহিনী নারকীয় হামলা করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে। এখানে গ্রেফতার দেখানোর সময় আপনারা বললেন ২৫শে মার্চ রাত আবার স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য বললেন ২৬শে মার্চ।
তাহলে তো বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পরে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন?
*** এখানে ছাত্রলীগ বলছে, বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেবার অপরাধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১-১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২নং বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। এখানেও তথ্য বিভ্রাট যেমন রাত ১২টা ২০মিনিটে মানেও তো ২৬ তারিখ হওয়ার কথা নিশ্চয়। আবার গ্রেফতার হলেন ১-১০ মানে তো ২৬ তারিখ, কিন্তু সব সময় এবং সব রেকর্ড পত্রে এমনকি আপনারও তো বলছেন বঙ্গবন্ধু ১৯৭১সালে ২৫শে মার্চ গ্রেফতার হয়েছিলেন। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী হাজী মোরশেদ বলেছেন ১.১৫মি! বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হয়েছিলেন সাথে তিনিও।
৩.
২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু কোন প্রকৌশলীর সহায়তায় খুলনা থেকে আনা একটি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন আর ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। (প্রথম আলো ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫)
*** এখানেও তথ্যের গরমিল, ২৫ মার্চ যদি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করে থাকেন এবং ২৭ মার্চ যদি মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে থাকেন তাহলে...
কেন ২৬ মার্চ আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করে থাকি?
আবার সেই রাতেই সবার প্রিয় নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ একটি চিরকুট লিখে এবং টেপ রেকডার নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা চেয়েছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু করেননি।
৪.
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। প্রধানমন্ত্রী গান্ধী শেখ মুজিবের জনসমর্থন সৃষ্টির লক্ষ্যে পৃথিবীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন রাজধানী সফরকালে ৬ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় পরিস্কার বলেন, ‘The cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as I know, has not asks for independence even now.’ (Ref: Bangladesh Documents Vol-II, Page-275, Ministry of External Affairs, Government of India-1972).
*** এই তথ্য হয়ত অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে আবার কারও কাছে হবে না। তবে এই তথ্য বঙ্গবন্ধু কে কিন্তু ছোট করেছে তা আমি মানিনা। যিনি সরকার প্রধান, দল প্রধান এবং তাঁর দলের অধীনে দেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে কিন্তু সব কাজ ই যে একজন নেতাকেই করতে হবে তা আমি বিশ্বাস করি না।
৫.
১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমীতে মুক্তিযুদ্ধের ১১ জন সেক্টর কমান্ডার বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডারদের উপস্থিতিতে যখন জিয়াউর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়, “২৫ মার্চ পাক বাহিনীর বর্বর হামলার পর চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনাকারী ও তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৃতিত্বের অধিকারী কর্নেল জিয়াউর রহমান”(সূত্রঃ দৈনিক বাংলা ২০/২/১৯৭২)।
আপনারা নিশ্চয় বাবু ভাই কে চিনেন, হ্যাঁ মোজাম্মেল (বাবু) ভাই এর কথায় বলছি, যিনি ৭১ টিভি’র মালিক, একজন নামকরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক তাঁর কথাই বলছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছের লোক। কেমন কাছের লোক জানতে চান? জনাব প্রায়াত সাংবাদিক ও আওয়ামীলীগ এর সাবেক সাংসদ এ বি এম মুসা, তাঁকে টেলিভিশনের লাইসেন্স দেননি অথচ এই বাবু ভাইকে দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই ৭১ টেলিভিশন এখন আওয়ামীলীগ সরকারের মিডিয়া মুখ্যপাত্র হিসেবে কাজ করে। সেই ৭১ টেলিভিশনে গত বছর সারা মার্চ মাস ধরে শত শত বার প্রচার করা হচ্ছে যে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।(যদিও বি এন পি সমর্থকরা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মানতে নারাজ। তাদের অনেকের দাবী বঙ্গবন্ধু নাকি স্বাধীনতা চাননি তো ঘোষণা দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা)। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, মুজিব নগর সরকারের প্রধান। তাই যুদ্ধকালীন দেশের জন্য যে যাই করেছে তা ছিল বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে। আর স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের একটি মাত্র অংশ, তবে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যিনি বাংলাদেশের স্থপতি তাঁকে যারা টেনে একটি মাত্র অংশের দাবীদার করতে চাই ওরাও মূর্খ, ওরা আওয়ামীলীগের শত্রু, ওরা তোষামোদকারী, ওরাই বঙ্গবন্ধু কে হত্যা করেছে।
আমি বরাবরই বিশ্বাস করি যে ডাক দেয় আর যে বা যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয় এই দুই কখনো এক হতে পারে না। যারা এক করে দেখতে চায় তাঁরা নির্বোধ পশু, হউক সে আওয়ামীলীগ সমর্থক, বি এন পি সমর্থক বা অন্যকোন দল।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



