আবারো এসেছে খুশির ঈদ। হানিফ সংকেত সাহেবের পরিবেশনায় থাকবে বিশেষ অনুষ্ঠান, শাইখ সিরাজ সাহেব কৃষকদের সাথে মশকরা করতে মাঠে নেমেছেন, সকল পত্রিকা আর টেলিভিশনের মালিক সম্পাদকগন বাজারের বড় গরুটি কিনেছেন। মেয়ে, জামাই, বাবা মাকে খুশি করেছেন। এরকম শত উদাহরন রয়েছে সাংবাদিকদের চোখের সামনে। কোন কোন গনমাধ্যমের কর্তা, মালিক, আর কিছু মানুষ গনমাধ্যমের চরম সুবিধা ভোগ করে। অনেক গনমাধ্যম ঈদের আনন্দ নাম দিয়ে রমরমা বিজ্ঞাপন ব্যবসা করছে।
বাংলাদেশে ৩০ টির মত টেলিভিশন চ্যানেল থাকলেও, অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল রাজধানীর বাহিরে কর্মরত সংবাদ কর্মীদের কোন বেতন এমনকি সম্মানী পর্যন্ত দেননা। আবার কোন কোন টেলিভিশন ঢাকার বাহিরের কর্মীদের কখনই নিজেদের বলে দাবিও করেন না। কেউ কেউ আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক সংবাদ প্রচার হলেই বেতন পাবে এমনও নিয়ম চালু করেছেন।
টেলিভিশনগুলোর মধ্যে ১। এটিএন বাংলা এবং এটিএন নিউজ জেলা পর্যায়ে বারো হাজার টাকা ২। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন শর্ত সাপেক্ষে পাঁচ হাজার হতে দশ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেন। ৩। সময় টেলিভিশন তিন হাজার টাকা সম্মানী দেন। অবশ্য এসব চ্যানেল থেকে সংবাদ কর্মীদের আরো কিছু বেশি আয় করার সুযোগ রয়েছে।
বিখ্যাত শাইখ সিরাজ সাহেব কৃষি আর কৃষকদের নিয়ে এত বেশি ভাবেন যে, তার টেলিভিশন চ্যানেল আই- হাতে গোনা কয়েকটি জেলা ছাড়া আর কাউকে কোন বেতন বা সম্মানী দেন না। বাকী টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কথা প্রায় সকল সংবাদ কর্মীরাই জানেন। শিকারী কুকুরকে যেমন রঙিন ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, ঠিক সেই রকমই একটি সুন্দর ফিতায় একটি পরিচয় পত্র, আর একটি লোগো দিয়ে এক পাল সাংবাদিক নিয়োগ দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিয়েছেন। যাদের কাউকে কোন বেতন, ভাতা বা সম্মানী দেয়া হয় না। কোন কোন চ্যানেল কর্মরত সংবাদ কর্মীদের কাছ থেকেই নির্দিষ্ট হারে মাসে টাকা নেয়া হয় (নাম উল্লেখ করলাম না)।
সরকার প্রায় দশ হাজার সংবাদপত্র অনুমোদন দিয়েছেন। যার অধিকাংশের নাম জনগন কখনো কখনো শুনে থাকেন। এসকল সংবাদপত্রের মধ্যে ১। প্রথম আলো প্রায় সব জেলাতেই ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি জেলা প্রতিনিধি বা নিজস্ব প্রতিবেদকদের বেতন দেয়া শুরু করেছেন। তবে প্রমোশন বা বেতন বাড়ানোর বিষয়টি বিতর্কিত। ২। ডেইলি ষ্টার প্রথম আলোর মতই বেতন/সম্মানী চালু করেছেন, তবে এখনো সব জেলাতে ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি বেতন ভাতা দেন না। ৩। কালেরকন্ঠ সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করেছেন যে, তারা সারা দেশেই ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি সংবাদ কর্মীদের বেতন দিচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হলো-কালেরকন্ঠের জেলা পর্যায়ে মাত্র ২৩ জনকে বেতন দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কাউকেই ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি বেতন দেওয়া হয় না। তবে বিভাগীয় পর্যায় এবং সম্পাদক ও মালিকের কিছু আপন জন বলে পরিচিত সংবাদ কর্মীকে ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি বেতন দেওয়া হয়। আর অন্যরা সবাইকে প্রতি মাসে ভিন্ন ভিন্ন পরিমান সম্মানী দেওয়া হয়। ৪। বাংলাদেশ প্রতিদিন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে ৭ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি অথবা নির্দিষ্ট পরিমান সম্মানী দিয়ে আসছে। ৫। দৈনিক ইত্তেফাক জেলা পর্যায়ের অনেককেই সর্ব নিম্ন তিন হাজার টাকা সম্মানী দিয়ে আসছে, তবে ৭ম বা ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি কাউকে তারা বেতন দেন না। ৬। ডেইলি সান নামক সংবাদ পত্রিকাটি অধিক বেতনের বিনিময়ে সংবাদ কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে অবশেষে প্রায় সবারই বেতন ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে। ডেইলি সান এখন ডেইলি মোমবাতি হয়ে কোন রকমে টিকে আছে। ৭। দৈনিক জনকণ্ঠ জেলা পর্যায়ে কোন সংবাদ কর্মীকে বেতন দেন না। বাকী পত্রিকাগুলো কোন সংবাদ কর্মীকে কোন বেতন/ভাতা/সম্মানী দেননা।
বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মত অনলাইন পত্রিকার আগমন ঘটেছে। তবে এখন পর্যন্ত জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা বিডিনিউজ২৪ ডট কম সকল জেলা ও বিভাগীয় কর্মীকেই তাদের সাধ্য অনুযায়ি সর্ব নিম্ন চার হাজার একশত টাকা থেকে উর্দ্ধে সম্মানী নিয়মিতভাবে দিয়ে আসছেন। অন্যদিকে বসুন্ধরা গ্রুপের একটি নিউজ পোর্টাল বাংলা নিউজ২৪ সংবাদ কর্মীদের প্রথমে দশ হাজার, পরে পাঁচ হাজার এবং বর্তমানে তিন হাজার দিচ্ছেন।
এতো গেলো ঢাকার বাহিরে কর্মরত সংবাদ কর্মীদের অবস্থা। তবে প্রায় সকল টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ প্রধান কার্যালয়ে কর্মরতদের প্রায় নিয়মিতই বেতন দেন। বিষয়টা এমন যে, ঢাকা শহরে যারা গনমাধ্যমে কাজ করেন, তাদের জীবনের চাহিদা রয়েছে, ঢাকার বাহিরে যারা কর্মরত আছেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনের কোন চাহিদা নেই।
বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাজী মো: হাসানুল হক ইনু, টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বলেছেন যে, বিভিন্ন গ্রেড অনুযায়ি সকল গনমাধ্যম কর্মীর জন্য ২০১৩ সাল থেকে ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি বেতন চালু করা হলো। এ বিষয়ে তিনি তথ্য মন্ত্রনালয়, প্রেস কাউন্সিল সব জায়গাতেই নোটিশ প্রদান করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমে দেয়া চিঠিতে বলেছেন যে সকল সংবাদমাধ্যম তাদের গ্রেড অনুযায়ি ৮ম ওয়েজ বোর্ড চালু করবে না, সে সকল সংবাদ মাধ্যমের ডিক্লারেশন বাতিল করা হবে। সে মোতাবেক তার মন্ত্রনালয়ে প্রতিমাসে সকল গনমাধ্যমের প্রধান অফিস থেকে সংবাদ কর্মীদের বেতন, পত্রিকার সার্কুলেশন সহ বিভিন্ন তথ্য পাঠানো হয়। তিনি কখনো এসব তথ্য যাচাই করে দেখেছেন কিনা-তা ঠিক জানা নাই। তবে, উদাহরন দিয়ে বলা যেতে পারে যে, কালেরকন্ঠ আমাকে ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ি বেতন দেয় নাই, ব্যাংকের সকল নথিপত্র সহ মাননীয় তথ্য মন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করার ৭ মাস পরেও কোন ফল আমি পাইনি। এ থেকে ধরেই নেয়া যায় যে, সরকারের ঘোষনা বা নিয়ম গনমাধ্যম মানছে না অথবা মাননীয় তথ্য মন্ত্রী হাজী মো: হাসানুল হক ইনু সাহেব সম্ভবত: কোন রিপোর্ট যাচাই বাছাই করেন না। তাই আজ পর্যন্ত বেতনের অনিয়ম নিয়ে কোন গনমাধ্যমের ডিক্লারেশন বাতিল বা শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নাই।
মাননীয় তথ্যমন্ত্রী যা ঘোষনা দিয়েছেন এবং তাই পালন করা হচ্ছে-এটাই দেশের মানুষকে বোঝানো হচ্ছে। অথচ আমি একজন সাংবাদিক হয়ে নিজ দায়িত্বে বলছি যে, গনমাধ্যমের জন্য সরকার যে বেতন কাঠামো ঘোষনা করেছেন, গনমাধ্যম মালিকপক্ষ সরকারের ঘোষনা আজো পালন করেননি। রাজধানী ঢাকা থেকেই প্রায় সকল গনমাধ্যম প্রকাশিত এবং প্রচারিত হচ্ছে। সরকারের ঘোষনা পালন না করার বিষয়টি সরকারের কোন দুর্বলতা অথবা তথ্য মন্ত্রনালয়ের দুর্বলতা অথবা সরকারি আমলাদের দুর্বলতা রয়েছে-তবে প্রকাশ্যে সরকারের এমন ঘোষনা গনমাধ্যম পালন করছেন না- বিষয়টিতে সরকারকে চরম ধৃষ্ঠতা দেখানো হয়েছে। সরকার কোন ভূমিকা না রাখায়, সরকারও সমালোচনার উর্দ্ধে নন।
ইতোমধ্যে আমার জীবনের পরিবর্তনের কথা হয়তো অনেকেই জানেন। আমি এতটা অন্যায়ের শিকার হয়েছি যে, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, তথ্য মন্ত্রনালয় এমনকি আদালতেও কোন বিচার আমি পাইনি। একমাত্র কন্যা সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে আমি বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে এখন গ্রামে বাস করি। বলাই যায় যে, এক সময়ের আলোচিত ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক এই আমি এখন সংবাদমাধ্যমে অনেকটাই অনিয়মিত। তারপরেও মিডিয়া বেশ্যা বলে খ্যাত মানুষদের নির্মুল করতে আমি একদিন মাঠে নামবো। কারণ, এই জাতিয় মিডিয়া বেশ্যাদের কারণে দেশের গনমাধ্যম আজ কলংকিত।
যাহোক, গ্রামীন জীবন যাপনের প্রয়োজনে আজ শহরে গিয়েছিলাম সামান্য কিছু জিনিস কিনতে। দেখা হলো- (নাম অপ্রকাশিত) একজন সাংবাদিকের সাথে। সে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেন। কখনো কোনদিন তাকে বেতন দেওয়া হয়নি এবং বেতন কি জিনিস তা সে জানেও না। দেখা হতেই হাত ধরে এক পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বললো যে, সে কয়েক বছর আগে বিবাহ করেছিল। একটি কন্যা সন্তান হয়েছিল। স্ত্রী আর সন্তানের খরচ বহন করতে না পেরে সংসারে কলহ লেগেই ছিল। কিছুদিন আগে, তার স্ত্রী তাকে তালাক দিয়ে, কন্যা সন্তানটিকে নিয়ে চলে গেছে। তার জীবনের এমন পরিনামের কথা বলতে বলতে সে কেঁদে ফেললো। তাকে সান্তনা দেবার ভাষা আমার ছিল না। কারণ, প্রায় একই অবস্থার শিকার হয়ে আজ আমি শহর ছেড়ে গ্রামে বাস করছি। মনের ভেতরের কষ্ট মাঝে মাঝে তাড়া করে। নিরবে কাঁদি। দৈনন্দিন জীবনের কথা বাদই দিলাম। একটা মানুষের তো বটেই, যে কোন পশু পাখির জৈবিক চাহিদা থাকে, সুখ থাকে, আনন্দ থাকে। সব মিলিয়ে একটা পারিবারিক জীবন থাকে। এসবের কোনটাই আমার নাই।
গত সপ্তাহে ছোট ভাই বাজার থেকে কোরবানির ছাগল কিনে আনলো। আমাকে বারবার করে সে জিজ্ঞেস করলো, আমি যেন কোন খরচ না করি। এটা কি ভাবা যায় ? এই আমি, একজন প্রতিভাবান, অনুসন্ধানী এবং আলোচিত একজন সাংবাদিক, আজ আমার কোন ক্ষমতা নাই যে, ঈদের আনন্দে আমি সামিল হবো। বাবা, মাকে খুশি করবো। সন্তানকে নতুন কাপড় উপহার দিবো !
কিছুক্ষন পরে নিচে তাকালাম। দেখলাম যে, আমার পায়ে জড়ানো চামড়ার স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেছে। মুচির কাছে গেলাম। সে বললো, এটাতে আর সেলাই করার জায়গা নাই। তাকে বললাম, আঠা লাগিয়ে দাও। সে তাই করলো।
আমার এমন অবস্থা দেখে, সেই সাংবাদিকের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পরলো। আমিও অশ্রু সংবরন করতে না পেরে দ্রুত সেখান থেকে গ্রামে ফিরে এলাম।
পকেট হাতড়িয়ে দেখি দশ টাকা রয়েছে। ৯ টাকা দিয়ে এক প্যাকেট বিড়ি কিনলাম। পকেটে এখন মাত্র এক টাকা।

সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ২:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


