somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটু পড়ুন, কেমন?...হুঁ..??

০৪ ঠা আগস্ট, ২০১১ রাত ৮:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে৷

কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিত্কার করে উঠেছিল;- আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি৷
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না৷

বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনলো না৷
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি৷
সেই একই ভাঙাপথ, একই কালোমাটির আল ধরে
গ্রামে ফেরা, আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি৷

আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ-শোঁ করছে হাওয়া৷
অনেক বদলে গেছে বাড়িটা,
টিনের চাল থেকে শুরু করে পুকুরের জল,
ফুলের বাগান থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই কোনখানে৷

পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে-পড়া বেলিফুলের গাছ থেকে
একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লক্লকে জিভ দেখালো৷
স্বতঃস্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির চতুর্দিকে ঘাস, জঙ্গল,
গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে অনায়াসে; যেন সবখানেই
সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে এখানে শাসন করছে গোঁয়ার প্রকৃতি৷
একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়,
আমাকে দেখেই পালালো একজন, একজন গন্ধ শুঁকে নিয়ে
আমাকে চিনতে চেষ্টা করলো- যেন পুলিশ-সমেত চেকার
তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল৷
হাঁটতে- হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম,
অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া অশোক,
একসময়ে কী ভীষন ছায়া দিতো এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারতো এর ছায়ায়৷
আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত
এ-গাছের ছায়ায় লুকিয়ে ছিলুম৷
সেই বাসন্তী, আহা, সেই বাসন্তী এখন বিহারে,
ডাকাত স্বামীর ঘরে চার- সন্তানের জননী হয়েছে৷

পুকুরের জলে শব্দ উঠলো মাছের, আবার জিভ দেখালো সাপ,
শান্ত-স্থির-বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে
একটি এরোপ্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে – -৷
আমি বাড়ির পেছন থেকে দরোজায় টোকা দিয়ে
ডাকলুম,— “মা’৷
বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি,
বহুদিন যে দরোজায় কোন কন্ঠস্বর ছিল না,
মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেলো৷
বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি,
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম;
সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম৷

মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে
লুকিয়ে রেখে অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে
পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন; আমি ঘরের ভিতরে তাকালুম,
দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল,
সেখানে লেনিন, বাবার জমা- খরচের পাশে কার্ল মার্কস;
আলমিরার একটি ভাঙ্গা- কাচের অভাব পূরণ করছে
ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি৷

মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহকুমা শহর থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ ঝুলবে তেমনি৷
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন,
পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে৷
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য৷
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস৷
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:
– আমাদের ভবিষ্যত্ কী?
– আইয়ুব খান এখন কোথায়?
– শেখ মুজিব কি ভুল করেছেন?
– আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?

আমি কিছুই বলবো না৷
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্য়্ত্কে চেয়ে চেয়ে দেখবো৷
উত্কন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিত্কার করে
কন্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলবো:
‘আমি এসবের কিছুই জানি না,
আমি এসবের কিছুই বুঝি না৷’
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে, আইনও কি সঙ্গে নিয়ে গেছেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০৬


প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলেই দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে । সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলেই কিছু নেতাকর্মী যেন নিজেদের দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৪


৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়া কখনো খালি থাকে না
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নাটকীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তখন

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৬

তখন
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তখন আলিফ লায়লা হতো
দেখতাম বিটিভিতে বাংলা মুভি
মিনা কাটুন, হারকিউলিস, রবিন হুড
নাটক, ইত্যাদি, বেশ আনন্দ পেতাম।
খেলাধুলা করতাম বন্ধুদের সাথে
বিবিধ রকম, সবসময় থাকতাম প্রাণবন্ত!
যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম তাদের
একটি সাদা-কালো টিভি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওকে নিয়ে চীনের আবেগ, শেখ মুজিবকে নিয়ে আমাদের বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২২


ফরাসি ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁকে নিয়ে কোন মিমটি দেখে সবচেয়ে বেশি হাসি পেয়েছিল। ফরাসি অনুষ্ঠান The Bridge এর ব্যাকস্টেজ ভিডিওতে তিনি বলেন, একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোটগল্প - চক্ষুহীন লোকটি

লিখেছেন ফাহমিদা বারী, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩




মি পারসনস যখন হোটেল থেকে বের হলেন, ভিক্ষুকটি তখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সে ছিল একজন অন্ধ ভিক্ষুক। অন্ধদের চিরাচরিত সাদা ছড়ি ছিল তার হাতে। সেটা দিয়ে সামনের পথটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×