somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানবচরিত

১৩ ই মার্চ, ২০১২ রাত ২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেক দিন পর চুপচাপ বসে আছি । মাথার সব চিন্তার মাঝখানে গোলকধাধার মত ঘুরপাক খাচ্ছি , কেন এমন হল । আমি শতভাবে চেষ্টা করেছি , কিন্ত তবুও হল না । হয়ত সব ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব না , অন্তত্ কিছু তো হবে । নিজেকে অনেক ছোট মনে হচ্ছে ।না , আজ আর বাড়ীতে যাব না । টিউশনীগুলোও থাকুক , যদি সবার জীবন থেকে অবসর নেবার সময় আছে , তাহলে আমিবা বাদ পরি কেন ? দুনিয়ার সব কাজের ভিড়ে আজ নিজেকে অচেনা মনে হয় । যে আমি কল্পনায় জাল বুনে সবাইকে নেতৃত্ব দিয়ে বেরাতাম , আমি কি সেই ? এখন শুধু বুঝি বাবা প্যাঁরালাইজড হয়ে পঙ্গু করে গিয়েছেন আমাদের সকলকে । আমার অবস্থাও তার মত , আকাশে উড়তে পারতাম সেটা অনেক আগেই ভুলে গিয়েছি , কন্ঠস্বর হয়ে গেছে রুদ্ধ , হয়ে গেছি আবেগহীন এক নিষ্পেষেত যুবক । যে বয়সে ভার্সিটির ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেরানোর কথা , আমি তখন অপরিণত সেনার মত যুদ্ধ করেছি বাস্তবতার সাথে , জেনেছি মানুষ কতটা স্বার্থপর , একটা অসহায় মানুষ কতটাভাবে সামান্য টাকার জন্য ঘুরতে পারে । মানুষের ভদ্রতার মুখোশের পিছনে , কন কথার মধ্যে আপনাকে বিদায় জানিয়ে দেয় , আপনাকে নিয়ে খেলতে চায় , সবই আমি মুহুর্তেই বুঝতে পারি । এত প্রবল সচেতনটার ঝাপটা কার গায়ে লাগতে দেই নি , কি মা কি ওদের গায়ে । হ্যা , ওরাও বুঝত , কিন্তু আগুনে পুড়া আর কাউকে পুড়তে দেখার মাঝে তফাৎ আছে । ওদেরকে হয়ত প্রতিদিন মাছ-মাংস খাওয়াতে পারতাম না , কি বছরে এক ঈদেই কাপড় দিতাম , সেকেন্ড হ্যান্ড বই ছাড়া অন্য কোন বই ওরা পেত না ,
তবুও ওদের চোখে আমি লক্ষ্য করেছি কৃ্তজ্ঞতার ছায়া । আমার জীবনে দিনে টানা চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করার পরও নিজে যেই কারণে শধু পরের দিন আমি আবার সবকিছুর মুখোমুখি হতাম, তার প্রধান কারণ ছিল আমার মায়ের চোখে নিশ্চিন্ত থাকার ছায়া । জীবন্মৃত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসার পর আমার ছোট বন যখন ছুটে আসত , নিজের ক্ষুধা তৃষ্ণা সবকিছু তুচ্ছ মনে হত ।কখন মনে হত দুঃখের ভাগিদার করে নেই ওদেরকে ,আবার পরের মুহুর্তেই চিন্তাটা বাদ দিতাম , থাক , বিষাদের মাঝে রঙ্গিন হয়ে থাক না দুটো মিনিট । তারপরও আমার অন্তরাত্মা চেচিয়ে কাঁদত , মা আমি নষ্ট হয়ে গেছি, তোমার ছেলে কবে হারিয়ে গেছে , চামড়ার ভিতরে সে এক রুগ্ন স্ততা , যক্ষা রোগীর চেয়েও ক্ষয়ীষ্ণু । হতে চেয়েছিলাম আরণ্যাকের কাব্য , হলাম ডেভিড কপারফিল্ড । গভীর রাতে , সবাই যখন ঘুমিয়ে , তখন অর্নাসের পড়া করতে গিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকতাম , আমার মত সারশূন্য নগরীর মধ্যে নিজেকে খুজে পেতাম । সকালে বাসের ঠ্যালার মাঝে , কি যখন নিজেকে দোকানদারের কাছে নিজেদের প্রডাক্ট দেওয়ার জন্য্য উত্তেজিত হয়ে উঠতাম , নিজের চেতনা আমাকে কুরে কুরে করে খেত । টি স্টলে বন্ধুদের দেখে পা ভারী হয়ে উঠলেও পাত্তা না দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতাম । কংক্রিটের নগরীতে আমি তখন একজন রোবট ।
হয়ত ধূসর দুঃস্বপ্নের মাঝেও এক চিলতে রোদ হাসে । আমার জীবনেও আমিও দেখা পেলাম , ছাব্বিশ বসন্তের পর । না না প্রেম নয় , লজ্জাবতীদের আশা ছেড়েছি অনেক আগেই । ট্যাক্স কমিশনে চাকরী পাওয়ার পর বাঁকা চোখে তাকিয়েছেলেন অনেকে , কেউ বলেছিলেন গতি হল , আর আমি এগুলোর কিছুই শুনিনি । ছুটে গিয়েছি পার্কে , সারাদিন শুধু পাখিদের উড়াউড়ি দেখে কাটিয়েছি , ভেবেছি এই আমার মুক্তি । প্রথম পোস্টিং হল রাজশাহী । মা আর ছোট ভাইবোনগুলোকে ছেড়ে , আমার আন্ধকার ঘরটা , সামনের রাস্তাটা যেটাতে ক্রিকেট খেলে মানুষের কাচ ভেঙ্গেছি , ছাড়তে কষ্ট হচ্ছিল । আবার এর মাঝেই দেখছিলাম নতুনভাবে নিজের জীবন চেতনা ফিরে পাওয়ার আশা ।

কিন্ত আমার মত মানুষের জন্য দুঃখ বেশীদিন লুকিয়ে থাকে না । তৃ্তীয় সপ্তাহে ম্যানেজারের অফিসে ডাক পেলাম ।
" কেমন আছেন আসিফ সাহেব ? নতুন জায়গা , নতুন চাকরী , একটু তো সমস্যা হওয়ারই কথা । লজ্জা পাবেন না , সব সমস্যায় আমরা আছি । এটা অফিস না ফ্যামিলি বলতে পারেন । তা আপনার ভাগের অবস্থা কি ? "
এতগুলো কথার তোড়ে চুপ মেরে থাকলাম । আমার চেহারা দেখে পাশে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বলে উঠলেন , " কেবল জয়েন করেছে তো সেজন্য বুঝছে না স্যার । স্যার তো আমাদের সম্মানীর কথা বলছেন । "
হাতে টাকা গুনার ভঙ্গি , চোখে শয়তানীর ছায়া দেখে আমি কেন , যে কেউ বুঝতে পারবে । আমিও বললাম , " এই জিনিসটা আমার নীতির সাথে যায় না স্যার । এই ফ্যামিলীতে আমি আমার ইনকাম কন্ট্রিবিউট করতে পারব না । সরি "।
স্যারের সেই ফ্যামিলী থেকে এই এক কথার জোরেই পাঠিয়ে দিলেন বান্দরবনে । খালি এটুকু বললেন , " যেভাবে চাকরী পেয়েছ , ওভাবে নিজে চলতে তোমার সমস্যা কোথায় ? "

এরপর সেই পাহাড়ী এলাকায় বসবাস । একদিকে অফিসে একঘরে অবস্থা , মায়ের অপারেশেনের চিন্তায় আমার নিজের চোখে অন্ধকার নেমে আসল । আমিও ঘুষ খাওয়া শুরু করলাম । প্রথমে লজ্জা পেতাম , পরে লোকজন না দেখলেই বুঝে যেত । আর যেগুলো বুঝতো না , ওগুলোর ফাইল ঝুলিয়ে রেখে দিতাম। কি সরকারী কর্মকর্তা , কি মাস্তান পুষা ব্যবস্যায়ী , কাউকেই কেয়ার করতাম না ।
টাকার মায়ায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি । আর্দশের বুলি শুনলে মারতে ইচ্ছা হত । সবার সাথে শিয়ালের মত হুক্কা হুয়া ডাকতাম । নিজের ট্রান্সফার করে আনলাম ঢাকায় । গোটা ফ্যামিলীর চোখে ছিল খুশি , ওরা জানতো না , কিভাবে সংসার চলে ।
সবকিছুরই শেষ আছে । বিপত্তি ঘটল এক চাচাতো বোনের এনগেজমেন্টে । তার বেয়াই , আমার এক বেয়াড়া এবং খাপ্পা ক্লায়েন্ট , আমাকে দেখেই আমার সব রহস্য ফাস করে চলে গেলেন ছেলের হাত ধরে , আর বললেন এমন ফ্যামিলীতে তিনি ছেলের বিয়ে দিবেন না ।
কিছুই মাথায় ধুঁকছিল না । বংলা সিনেমার মত কেউ একটা চড় কষিয়ে দিলে ভাল হত , কিছুটা হলেও দুঃখ কমত । কিছু না বলে আমিও ছিটকে বের হয়ে পড়লাম । বাউন্ডুলের মত সারা বিকাল , রাত হাটলাম । আর এখন পুকুরের মাঝখানে খালি সিগারেট সই করছি । পাশে হঠাৎ মোবাইলের দিকে চোখ পড়ল । ২৭ টা মিসকল , ১৩ তা মেসেজ । খুলেই দেখলাম " ভাইয়া বাড়িতে আসো । তোমাকে ছাড়া ভাত খাবো না । "
রাত সাড়ে বারটায় , একটা অন্ধকারচ্ছন পরিবেশে মাদকাসক্ত দলের পাশে এই মেসেজটা পড়ে সব দূর হয়ে গেল । এক নিমেষে সব খারাপ জিনিস ছেড়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করলাম । উঠতে গিয়ে পিছনে দেখলাম , কে যেন চাকু ধরে আছে । " তোর মোবাইল আর মানিব্যাগটা দে ।"
সাথে সাথে দিয়ে দিলাম দুইটা । ভয়ে ভয়ে বললাম , " খুচরা টাকাগুলো যদি দিতেন । বাড়ি অনেক দূরে ।"
সাথে সাথে হুঙ্কার , " ধূর কুত্তার বাচ্চা ! আজিজ ভাই খুচরা ছাড়া কোন মাল দেয় না । দূর হ "

সেই থেকে আমি রাস্তায় হাটছি । যতই পাঁচ মাইল দূর হোক , এখন আমার কাছে তা কিছুই না । হয়ত নিয়নের হলুদ বাতিতে আমি আজ আমি ছদ্মবেশী হিমু ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১২ রাত ১১:৪৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিকিৎসকের অবহেলা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২১



বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবিদের দৈনিক ডিউটি টাইম বা কাজের সময় কতো ঘন্টা? সমগ্র বাংলাদেশে, সমগ্র বাংলাদেশে যে কোনো সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারগণ দৈনিক কতো ঘন্টা ডিউটি করেন?

সরকারি হাসপাতালে পড়ালেখা করে, সরকারি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২৭

" অদেখা দূরত্ব "

তুমি ছিলে আমার সেই নাম যা আমি উচ্চারণ করতে পারিনা,
তবে বুকের ভিতর হাজার বার জপ করি।
তুমি আমার সেই আলো যা আমি চোখে দেখিনা,
লুকিয়ে রাখি হৃদয়ের অভ্যন্তরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালছাল মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৬

প্রথম পাতায় ব্যান ব্লগারের একটি পোস্টে ব্লগার রাজীব নূর মন্তব্য করে বলেছেন - “ওদের কে ‘বালছাল’ লিখতে দেন। বিনোদন নষ্ট করবেন না।”

বাহ! কী চমৎকার গণতান্ত্রিক দর্শন! এতদিন জানতাম দেশে তথ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×