অনেক দিন পর চুপচাপ বসে আছি । মাথার সব চিন্তার মাঝখানে গোলকধাধার মত ঘুরপাক খাচ্ছি , কেন এমন হল । আমি শতভাবে চেষ্টা করেছি , কিন্ত তবুও হল না । হয়ত সব ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব না , অন্তত্ কিছু তো হবে । নিজেকে অনেক ছোট মনে হচ্ছে ।না , আজ আর বাড়ীতে যাব না । টিউশনীগুলোও থাকুক , যদি সবার জীবন থেকে অবসর নেবার সময় আছে , তাহলে আমিবা বাদ পরি কেন ? দুনিয়ার সব কাজের ভিড়ে আজ নিজেকে অচেনা মনে হয় । যে আমি কল্পনায় জাল বুনে সবাইকে নেতৃত্ব দিয়ে বেরাতাম , আমি কি সেই ? এখন শুধু বুঝি বাবা প্যাঁরালাইজড হয়ে পঙ্গু করে গিয়েছেন আমাদের সকলকে । আমার অবস্থাও তার মত , আকাশে উড়তে পারতাম সেটা অনেক আগেই ভুলে গিয়েছি , কন্ঠস্বর হয়ে গেছে রুদ্ধ , হয়ে গেছি আবেগহীন এক নিষ্পেষেত যুবক । যে বয়সে ভার্সিটির ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেরানোর কথা , আমি তখন অপরিণত সেনার মত যুদ্ধ করেছি বাস্তবতার সাথে , জেনেছি মানুষ কতটা স্বার্থপর , একটা অসহায় মানুষ কতটাভাবে সামান্য টাকার জন্য ঘুরতে পারে । মানুষের ভদ্রতার মুখোশের পিছনে , কন কথার মধ্যে আপনাকে বিদায় জানিয়ে দেয় , আপনাকে নিয়ে খেলতে চায় , সবই আমি মুহুর্তেই বুঝতে পারি । এত প্রবল সচেতনটার ঝাপটা কার গায়ে লাগতে দেই নি , কি মা কি ওদের গায়ে । হ্যা , ওরাও বুঝত , কিন্তু আগুনে পুড়া আর কাউকে পুড়তে দেখার মাঝে তফাৎ আছে । ওদেরকে হয়ত প্রতিদিন মাছ-মাংস খাওয়াতে পারতাম না , কি বছরে এক ঈদেই কাপড় দিতাম , সেকেন্ড হ্যান্ড বই ছাড়া অন্য কোন বই ওরা পেত না ,
তবুও ওদের চোখে আমি লক্ষ্য করেছি কৃ্তজ্ঞতার ছায়া । আমার জীবনে দিনে টানা চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করার পরও নিজে যেই কারণে শধু পরের দিন আমি আবার সবকিছুর মুখোমুখি হতাম, তার প্রধান কারণ ছিল আমার মায়ের চোখে নিশ্চিন্ত থাকার ছায়া । জীবন্মৃত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসার পর আমার ছোট বন যখন ছুটে আসত , নিজের ক্ষুধা তৃষ্ণা সবকিছু তুচ্ছ মনে হত ।কখন মনে হত দুঃখের ভাগিদার করে নেই ওদেরকে ,আবার পরের মুহুর্তেই চিন্তাটা বাদ দিতাম , থাক , বিষাদের মাঝে রঙ্গিন হয়ে থাক না দুটো মিনিট । তারপরও আমার অন্তরাত্মা চেচিয়ে কাঁদত , মা আমি নষ্ট হয়ে গেছি, তোমার ছেলে কবে হারিয়ে গেছে , চামড়ার ভিতরে সে এক রুগ্ন স্ততা , যক্ষা রোগীর চেয়েও ক্ষয়ীষ্ণু । হতে চেয়েছিলাম আরণ্যাকের কাব্য , হলাম ডেভিড কপারফিল্ড । গভীর রাতে , সবাই যখন ঘুমিয়ে , তখন অর্নাসের পড়া করতে গিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকতাম , আমার মত সারশূন্য নগরীর মধ্যে নিজেকে খুজে পেতাম । সকালে বাসের ঠ্যালার মাঝে , কি যখন নিজেকে দোকানদারের কাছে নিজেদের প্রডাক্ট দেওয়ার জন্য্য উত্তেজিত হয়ে উঠতাম , নিজের চেতনা আমাকে কুরে কুরে করে খেত । টি স্টলে বন্ধুদের দেখে পা ভারী হয়ে উঠলেও পাত্তা না দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতাম । কংক্রিটের নগরীতে আমি তখন একজন রোবট ।
হয়ত ধূসর দুঃস্বপ্নের মাঝেও এক চিলতে রোদ হাসে । আমার জীবনেও আমিও দেখা পেলাম , ছাব্বিশ বসন্তের পর । না না প্রেম নয় , লজ্জাবতীদের আশা ছেড়েছি অনেক আগেই । ট্যাক্স কমিশনে চাকরী পাওয়ার পর বাঁকা চোখে তাকিয়েছেলেন অনেকে , কেউ বলেছিলেন গতি হল , আর আমি এগুলোর কিছুই শুনিনি । ছুটে গিয়েছি পার্কে , সারাদিন শুধু পাখিদের উড়াউড়ি দেখে কাটিয়েছি , ভেবেছি এই আমার মুক্তি । প্রথম পোস্টিং হল রাজশাহী । মা আর ছোট ভাইবোনগুলোকে ছেড়ে , আমার আন্ধকার ঘরটা , সামনের রাস্তাটা যেটাতে ক্রিকেট খেলে মানুষের কাচ ভেঙ্গেছি , ছাড়তে কষ্ট হচ্ছিল । আবার এর মাঝেই দেখছিলাম নতুনভাবে নিজের জীবন চেতনা ফিরে পাওয়ার আশা ।
কিন্ত আমার মত মানুষের জন্য দুঃখ বেশীদিন লুকিয়ে থাকে না । তৃ্তীয় সপ্তাহে ম্যানেজারের অফিসে ডাক পেলাম ।
" কেমন আছেন আসিফ সাহেব ? নতুন জায়গা , নতুন চাকরী , একটু তো সমস্যা হওয়ারই কথা । লজ্জা পাবেন না , সব সমস্যায় আমরা আছি । এটা অফিস না ফ্যামিলি বলতে পারেন । তা আপনার ভাগের অবস্থা কি ? "
এতগুলো কথার তোড়ে চুপ মেরে থাকলাম । আমার চেহারা দেখে পাশে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বলে উঠলেন , " কেবল জয়েন করেছে তো সেজন্য বুঝছে না স্যার । স্যার তো আমাদের সম্মানীর কথা বলছেন । "
হাতে টাকা গুনার ভঙ্গি , চোখে শয়তানীর ছায়া দেখে আমি কেন , যে কেউ বুঝতে পারবে । আমিও বললাম , " এই জিনিসটা আমার নীতির সাথে যায় না স্যার । এই ফ্যামিলীতে আমি আমার ইনকাম কন্ট্রিবিউট করতে পারব না । সরি "।
স্যারের সেই ফ্যামিলী থেকে এই এক কথার জোরেই পাঠিয়ে দিলেন বান্দরবনে । খালি এটুকু বললেন , " যেভাবে চাকরী পেয়েছ , ওভাবে নিজে চলতে তোমার সমস্যা কোথায় ? "
এরপর সেই পাহাড়ী এলাকায় বসবাস । একদিকে অফিসে একঘরে অবস্থা , মায়ের অপারেশেনের চিন্তায় আমার নিজের চোখে অন্ধকার নেমে আসল । আমিও ঘুষ খাওয়া শুরু করলাম । প্রথমে লজ্জা পেতাম , পরে লোকজন না দেখলেই বুঝে যেত । আর যেগুলো বুঝতো না , ওগুলোর ফাইল ঝুলিয়ে রেখে দিতাম। কি সরকারী কর্মকর্তা , কি মাস্তান পুষা ব্যবস্যায়ী , কাউকেই কেয়ার করতাম না ।
টাকার মায়ায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি । আর্দশের বুলি শুনলে মারতে ইচ্ছা হত । সবার সাথে শিয়ালের মত হুক্কা হুয়া ডাকতাম । নিজের ট্রান্সফার করে আনলাম ঢাকায় । গোটা ফ্যামিলীর চোখে ছিল খুশি , ওরা জানতো না , কিভাবে সংসার চলে ।
সবকিছুরই শেষ আছে । বিপত্তি ঘটল এক চাচাতো বোনের এনগেজমেন্টে । তার বেয়াই , আমার এক বেয়াড়া এবং খাপ্পা ক্লায়েন্ট , আমাকে দেখেই আমার সব রহস্য ফাস করে চলে গেলেন ছেলের হাত ধরে , আর বললেন এমন ফ্যামিলীতে তিনি ছেলের বিয়ে দিবেন না ।
কিছুই মাথায় ধুঁকছিল না । বংলা সিনেমার মত কেউ একটা চড় কষিয়ে দিলে ভাল হত , কিছুটা হলেও দুঃখ কমত । কিছু না বলে আমিও ছিটকে বের হয়ে পড়লাম । বাউন্ডুলের মত সারা বিকাল , রাত হাটলাম । আর এখন পুকুরের মাঝখানে খালি সিগারেট সই করছি । পাশে হঠাৎ মোবাইলের দিকে চোখ পড়ল । ২৭ টা মিসকল , ১৩ তা মেসেজ । খুলেই দেখলাম " ভাইয়া বাড়িতে আসো । তোমাকে ছাড়া ভাত খাবো না । "
রাত সাড়ে বারটায় , একটা অন্ধকারচ্ছন পরিবেশে মাদকাসক্ত দলের পাশে এই মেসেজটা পড়ে সব দূর হয়ে গেল । এক নিমেষে সব খারাপ জিনিস ছেড়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করলাম । উঠতে গিয়ে পিছনে দেখলাম , কে যেন চাকু ধরে আছে । " তোর মোবাইল আর মানিব্যাগটা দে ।"
সাথে সাথে দিয়ে দিলাম দুইটা । ভয়ে ভয়ে বললাম , " খুচরা টাকাগুলো যদি দিতেন । বাড়ি অনেক দূরে ।"
সাথে সাথে হুঙ্কার , " ধূর কুত্তার বাচ্চা ! আজিজ ভাই খুচরা ছাড়া কোন মাল দেয় না । দূর হ "
সেই থেকে আমি রাস্তায় হাটছি । যতই পাঁচ মাইল দূর হোক , এখন আমার কাছে তা কিছুই না । হয়ত নিয়নের হলুদ বাতিতে আমি আজ আমি ছদ্মবেশী হিমু ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১২ রাত ১১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


