এই ঝামেলার শুরু বিপিএল এর পর থেকেই । শুক্রবার সকাল , সপ্তাহের সব ঝামেলার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে কেবল পেপারটা হাতে্ নিয়েছি , অমনি পিঠের মধ্যে কে যেন চড় বসিয়ে দিল , যেটা খেলে মাইক টাইসনও বাপ বাপ করে উঠত । তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে পিছনে ঘুরে দেখলাম , মামা তার তামিল স্টাইল গোঁফ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ।
" কিরে খেলা দেখতে যাবি না ? ইন্ডিয়া-পাকিস্তানটাতো ছাড়া যায় না । তোর আলসেমির কারণে বিপিএলটা তো মিস করলাম । "
"তাই বলে এত জোরে মারতে হবে ? " , আমি তখনও পিঠে হাত বুলাচ্ছিলাম ।
" আরে তুইতো আমার একমাত্র মা ডিয়ার ভাগনে , তকে ছাড়া কিভাবে খেলা দেখি । কালকে থেকে টিকেট ছাড়বে , চল একসাথে টিকিট কাটব । "
"ওরে ওই লাইনে দাঁড়ায় টিকিট কাটাতো মুখের কথা না । এত কষ্ট করতে পারব না । "
"তাহলে বাড়িতেই থাক । আপার রান্না খা আর ব্রয়লার মুরগি হ । তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না ।"
এরপর তো আর বসে থাকা যায় না । এমনিতেই লোকটা মামীর অত্যাচারে ভেজা বিড়াল হয়ে থাকেন । আবেগের একমাত্র প্লাটফর্ম আমি , তার উপর বহুবার ঢাল হয়ে বাবার কাছ থেকে আমাকে বাচিঁয়েছেন আমাকে ।
প্রথম দিন দুই কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গানো কারো পক্ষে সম্ভব হয় নি । আর সকাল দশটায় লাইনে দাঁড়ায় টিকেট পাওয়ার চাইতে শেখ হাসিনার দেখা পাওয়ার চান্স বেশী । তাই দ্বিতীয় দিনে মামার প্রতি আবগেই হোক আর খেলা দেখার জন্যই হোক , তিনটা অ্যালার্মের চোটে আর মামার কলের জ্বালায় গত পাঁচ বছরে প্রথমবারের মত সূর্য দশন করলাম । সব কিছু একসাথে নিয়ে দৌড় দিলাম মামার বাড়ির দিকে ।
মামার পড়নে লাল ট্র্যাকসূট ( যেটা কিনার পর একবারও জগিং করেছেন কিনা জানি না আর শেষ খবরের মতে ওটা ইদুরের উদরস্থ হয়ে ছিল ) , পায়ে কেডস আর চোখে কালো সানগ্লাস । হাসি আর লুকাতে পারলাম না , " এইবার কি জাম্বুর জায়গায় নেমে যাবেন নাকি বাংলা সিনেমায় ? "
সাথে সাথে মুখটা জাদরেল জেনারেলের মত হয়ে গেল । " চুপ বেয়াদব । বহুদিন পর আজকে খোলস ছাড়ে বের হয়েছি । আর শুরুতেই এই কথা । নো টেনশন । চল দেখি । আজকে এই ছয়টায় লাইনে দাড়াব , দেখবি বিশজনের পরই টিকিট পাবো । নাউ , লেটস মার্চ ।"
কিন্ত ব্যাংকের সামনে গিয়ে লাইন দেখি প্রায় দেড়শ লোকের লাইন । মামার দেশের জনসংখ্যা জনিত হতাশা শোনা বাদ দিয়ে সামনে গিয়ে খবর নিয়ে জানলাম , এই টিকিটের জন্য আজকে অনেক উদ্বাস্ত এখানেই রাত কাটিয়েছে । তবুও লাইনে দাড়ালাম । কখনো হাটাহাটি করে , পেপার পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করলাম । দেওয়ার কথা নয়টায় , শুরু হল দশটায় । তারপর যখন আমরা আর মাত্র তিরিশ জনের পিছনে , তখন কেউ এসে ঘোষণা দিল , আজকের ২০০ টিকিট বিক্রি শেষ । ভোর থেকে ২টা পর্্যন্ত দাড়ানোর কারণে মামার মাথা গরম হয়ে গেছে , " এটা কি এই দেশ কোন কিছু কি নিয়ম মত চলবে না ? আমরা কি বসে বসে ঘাস খাচ্ছি ? " ইত্যাদি ইত্যাদি । মামার চারিদিকে উত্তেজিত জনতার ভিড় জমার আগেই আমি কোনমতে বগলদাবা করে নিয়ে আসলাম । হাজার হোক , পুলিশ হলে মানা যেত , কিন্ত আনসারের কাছে মার খেলে কি আর মানইজ্জত বাকি থাকে ?
পরে রাতে মামার কোন , " আয় আজকে আবার রাত ১২ টায় লাইনে দাঁড়াব ."
" আমার পক্ষে আর সম্ভব না । একলাই যান ", ঘুম জড়ানো স্বরে আমি " , বলে চুপ হয়ে গেলাম ।
" ঠিক আসে আমি একাই যাবো । এই বয়সে কিছুই পারস না , ভবিষ্যতে তোর হবে কি ? " আরো কিছু শোনার আশা করছিলাম , কিন্ত লাইনটা কাটে গেল ।
পরদিন ক্লাস । প্রফেস্যারের ঘুমপাড়ানি গান শুনতে শুনতে মামাকে ফোন দিলাম , " কাজ হইছে ? "
" আজকে ঢুকতে পারছি । কিন্ত ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের টিকিট সব শেষ । "
এরপর আমি নিজেই কাটলাম । লোকটা একটা খেলার জন্য এত কষ্ট করছে , আর আমি আঙুল চুসব , তাতো হয় না । খবর নিয়ে জানলাম , আর্কির পলাশ ভাইয়ের কাছে টিকিট আছে ।
আধাঘণ্টা ধরে খুঁজার পর উনাকে পেলাম । তারপর বহুক্ষণ তেল মালিশ করে টিকিটের
প্রসঙ্গ তুললাম ।
" সব টিকেট তো নিয়ে গেছে যে যার মত , আর দুইটা আছে । "
"আমার দুইটাই লাগবে ।"
" আমি আর অর্পা যাবো রে । অনেক দিন পর রাজি হইছে ।"
ইচ্ছা হল যেন বলি আপনার তিন বছরের সেমিক্রাশের কোন ভবিষ্যত নাই । কালকেই আপুকে আবার জামান ভাইয়ের সাথে বিএফসিতে হাসাহাসি করতে দেখছি । দাঁত চাপে চলে আসলাম ।
বাসায় যাওয়ার পথে আরিফের সাথে দেখা হল । আমি ডাক্তার হলে এদের গোটা ফ্যামিলীকে পাগলাগারদে ঢুকায় রাখতাম । ও আমাদের মতই টিকেট পায়নি । বলল ," দোস্ত একটা নাম্বার পাইছি । কথা বললাম । ৪০০ টাকার সাউর্দানেরটা ৮০০ টাকায় বেচবে । "
" কয়টা টিকেট আছে ? "
" দশটাতো বলল । এখন জানি না ।"
সাথে সাথে ওকে ধরে সোজা মামার অফিসে চলে আসলাম । সব ঘটনা শুনে মামার চোখ আবার জ্বলজ্বলে হয়ে গেল । ওই লোকের সাথে কথা বলে মামা বলল , " আরে এটাতো জুনিয়র ছোকড়া । ভার্সিটির পোলা । এ্লিফ্যান্ট রোডের পাশের গলিতে যাইতে বলছে । "
মামার গাড়িতে করে আমরা দশ মিনিটে সেই গলিতে । এরপর সেই ছেলের দেখা পেলাম , পেল্লাই ভুড়ি আর টাইট জিন্সের প্যান্টে এক নরখাদক । পরিচয়ের সময় কথা শুনে ছেলেটাকে ভদ্র মনে হল । " ভাইয়া একটু কষ্ট করে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত চলেন । টিকিটগুলো ওখানেই আছে ।"
মামা প্রথমে আপত্তি তুললেও পরে টিকিট মিশনের আশ্চর্য সফলতায় গদগদ হয়ে রওনা দিলেন ।
বাড়িতে পা দিয়েই দেখলাম , তিনজন ষণ্ডামার্কা লোক দাঁড়া হয়ে আছে ।
" কি ব্যাপার ? এরা কারা ? " সবার মনেই সন্দেহের ঝিলিক ।
" টাকা যা আছে দিয়ে দেন । টিকেটের কথা ভুলে যান ।"
" মানে ? " মামা চেচিয়ে উঠলেন ।
" ওই শাওন । যা ত , বুঝায় দে । "
ঠাস করে হাতের পিছনে রাখা রড দিয়ে মামার ঘাড়ে বাড়ি । পরের দৃশ্য সবাই বুঝতে পারছেন , মানিব্যাগ দূর্বত্তদের হাতে হস্তগত করে আমাদের অলিম্পিকীয় স্টাইলে পলায়ন ।
মোড়ে আসে তিনজনেরই প্রশ্ন , কি হইল এইটা ? আর আমাদের দেখে পানওয়ালার মন্তব্য , " হে হে , আপনারা এই সপ্তাহে জসিম ভাইয়ের তিন নম্বর কেস । মোবাইল আছে না ওইটাও গেছে ? "
" মানে ! এইটা কি ব্যাবসা ? " আমি বললাম ।
লোকটা উত্তর না দিয়ে আমাদের দিকে তাকায় সর্বজান্তা টাইপের হাসি দিল । ওই মূহূর্তে উনাকে হিটলারের চেয়েও নিষ্ঠুর মনে হল আমদের ।
পরের দৃশ্য - ইন্ডিয়ার সাথে বাংলাদেশের জয় । দুই উত্তেজিত মামা ভাগ্নেকে মার জিজ্ঞাসা , " কিরে তোরা ফাইনাল দেখতে যা । বাংলাদেশতো উঠতে পারবে বলে মনে হয় । "
অমনি আমাদের সব হাসি নিভে গেল । কিভাবে বলি - টিকিট কিনতে গিয়ে দুনিয়ার টিকিটিই হারাতে বসছিলাম !
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১২ রাত ২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


