somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টিকিট সমাচার

২০ শে মার্চ, ২০১২ রাত ১:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই ঝামেলার শুরু বিপিএল এর পর থেকেই । শুক্রবার সকাল , সপ্তাহের সব ঝামেলার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে কেবল পেপারটা হাতে্ নিয়েছি , অমনি পিঠের মধ্যে কে যেন চড় বসিয়ে দিল , যেটা খেলে মাইক টাইসনও বাপ বাপ করে উঠত । তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে পিছনে ঘুরে দেখলাম , মামা তার তামিল স্টাইল গোঁফ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ।
" কিরে খেলা দেখতে যাবি না ? ইন্ডিয়া-পাকিস্তানটাতো ছাড়া যায় না । তোর আলসেমির কারণে বিপিএলটা তো মিস করলাম । "
"তাই বলে এত জোরে মারতে হবে ? " , আমি তখনও পিঠে হাত বুলাচ্ছিলাম ।
" আরে তুইতো আমার একমাত্র মা ডিয়ার ভাগনে , তকে ছাড়া কিভাবে খেলা দেখি । কালকে থেকে টিকেট ছাড়বে , চল একসাথে টিকিট কাটব । "
"ওরে ওই লাইনে দাঁড়ায় টিকিট কাটাতো মুখের কথা না । এত কষ্ট করতে পারব না । "
"তাহলে বাড়িতেই থাক । আপার রান্না খা আর ব্রয়লার মুরগি হ । তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না ।"
এরপর তো আর বসে থাকা যায় না । এমনিতেই লোকটা মামীর অত্যাচারে ভেজা বিড়াল হয়ে থাকেন । আবেগের একমাত্র প্লাটফর্ম আমি , তার উপর বহুবার ঢাল হয়ে বাবার কাছ থেকে আমাকে বাচিঁয়েছেন আমাকে ।
প্রথম দিন দুই কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গানো কারো পক্ষে সম্ভব হয় নি । আর সকাল দশটায় লাইনে দাঁড়ায় টিকেট পাওয়ার চাইতে শেখ হাসিনার দেখা পাওয়ার চান্স বেশী । তাই দ্বিতীয় দিনে মামার প্রতি আবগেই হোক আর খেলা দেখার জন্যই হোক , তিনটা অ্যালার্মের চোটে আর মামার কলের জ্বালায় গত পাঁচ বছরে প্রথমবারের মত সূর্য দশন করলাম । সব কিছু একসাথে নিয়ে দৌড় দিলাম মামার বাড়ির দিকে ।
মামার পড়নে লাল ট্র্যাকসূট ( যেটা কিনার পর একবারও জগিং করেছেন কিনা জানি না আর শেষ খবরের মতে ওটা ইদুরের উদরস্থ হয়ে ছিল ) , পায়ে কেডস আর চোখে কালো সানগ্লাস । হাসি আর লুকাতে পারলাম না , " এইবার কি জাম্বুর জায়গায় নেমে যাবেন নাকি বাংলা সিনেমায় ? "

সাথে সাথে মুখটা জাদরেল জেনারেলের মত হয়ে গেল । " চুপ বেয়াদব । বহুদিন পর আজকে খোলস ছাড়ে বের হয়েছি । আর শুরুতেই এই কথা । নো টেনশন । চল দেখি । আজকে এই ছয়টায় লাইনে দাড়াব , দেখবি বিশজনের পরই টিকিট পাবো । নাউ , লেটস মার্চ ।"

কিন্ত ব্যাংকের সামনে গিয়ে লাইন দেখি প্রায় দেড়শ লোকের লাইন । মামার দেশের জনসংখ্যা জনিত হতাশা শোনা বাদ দিয়ে সামনে গিয়ে খবর নিয়ে জানলাম , এই টিকিটের জন্য আজকে অনেক উদ্বাস্ত এখানেই রাত কাটিয়েছে । তবুও লাইনে দাড়ালাম । কখনো হাটাহাটি করে , পেপার পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করলাম । দেওয়ার কথা নয়টায় , শুরু হল দশটায় । তারপর যখন আমরা আর মাত্র তিরিশ জনের পিছনে , তখন কেউ এসে ঘোষণা দিল , আজকের ২০০ টিকিট বিক্রি শেষ । ভোর থেকে ২টা পর্‍্যন্ত দাড়ানোর কারণে মামার মাথা গরম হয়ে গেছে , " এটা কি এই দেশ কোন কিছু কি নিয়ম মত চলবে না ? আমরা কি বসে বসে ঘাস খাচ্ছি ? " ইত্যাদি ইত্যাদি । মামার চারিদিকে উত্তেজিত জনতার ভিড় জমার আগেই আমি কোনমতে বগলদাবা করে নিয়ে আসলাম । হাজার হোক , পুলিশ হলে মানা যেত , কিন্ত আনসারের কাছে মার খেলে কি আর মানইজ্জত বাকি থাকে ?

পরে রাতে মামার কোন , " আয় আজকে আবার রাত ১২ টায় লাইনে দাঁড়াব ."
" আমার পক্ষে আর সম্ভব না । একলাই যান ", ঘুম জড়ানো স্বরে আমি " , বলে চুপ হয়ে গেলাম ।
" ঠিক আসে আমি একাই যাবো । এই বয়সে কিছুই পারস না , ভবিষ্যতে তোর হবে কি ? " আরো কিছু শোনার আশা করছিলাম , কিন্ত লাইনটা কাটে গেল ।
পরদিন ক্লাস । প্রফেস্যারের ঘুমপাড়ানি গান শুনতে শুনতে মামাকে ফোন দিলাম , " কাজ হইছে ? "
" আজকে ঢুকতে পারছি । কিন্ত ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের টিকিট সব শেষ । "
এরপর আমি নিজেই কাটলাম । লোকটা একটা খেলার জন্য এত কষ্ট করছে , আর আমি আঙুল চুসব , তাতো হয় না । খবর নিয়ে জানলাম , আর্কির পলাশ ভাইয়ের কাছে টিকিট আছে ।
আধাঘণ্টা ধরে খুঁজার পর উনাকে পেলাম । তারপর বহুক্ষণ তেল মালিশ করে টিকিটের
প্রসঙ্গ তুললাম ।
" সব টিকেট তো নিয়ে গেছে যে যার মত , আর দুইটা আছে । "
"আমার দুইটাই লাগবে ।"
" আমি আর অর্পা যাবো রে । অনেক দিন পর রাজি হইছে ।"
ইচ্ছা হল যেন বলি আপনার তিন বছরের সেমিক্রাশের কোন ভবিষ্যত নাই । কালকেই আপুকে আবার জামান ভাইয়ের সাথে বিএফসিতে হাসাহাসি করতে দেখছি । দাঁত চাপে চলে আসলাম ।
বাসায় যাওয়ার পথে আরিফের সাথে দেখা হল । আমি ডাক্তার হলে এদের গোটা ফ্যামিলীকে পাগলাগারদে ঢুকায় রাখতাম । ও আমাদের মতই টিকেট পায়নি । বলল ," দোস্ত একটা নাম্বার পাইছি । কথা বললাম । ৪০০ টাকার সাউর্দানেরটা ৮০০ টাকায় বেচবে । "
" কয়টা টিকেট আছে ? "
" দশটাতো বলল । এখন জানি না ।"
সাথে সাথে ওকে ধরে সোজা মামার অফিসে চলে আসলাম । সব ঘটনা শুনে মামার চোখ আবার জ্বলজ্বলে হয়ে গেল । ওই লোকের সাথে কথা বলে মামা বলল , " আরে এটাতো জুনিয়র ছোকড়া । ভার্সিটির পোলা । এ্লিফ্যান্ট রোডের পাশের গলিতে যাইতে বলছে । "
মামার গাড়িতে করে আমরা দশ মিনিটে সেই গলিতে । এরপর সেই ছেলের দেখা পেলাম , পেল্লাই ভুড়ি আর টাইট জিন্সের প্যান্টে এক নরখাদক । পরিচয়ের সময় কথা শুনে ছেলেটাকে ভদ্র মনে হল । " ভাইয়া একটু কষ্ট করে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত চলেন । টিকিটগুলো ওখানেই আছে ।"
মামা প্রথমে আপত্তি তুললেও পরে টিকিট মিশনের আশ্চর্য সফলতায় গদগদ হয়ে র‍ওনা দিলেন ।
বাড়িতে পা দিয়েই দেখলাম , তিনজন ষণ্ডামার্কা লোক দাঁড়া হয়ে আছে ।
" কি ব্যাপার ? এরা কারা ? " সবার মনেই সন্দেহের ঝিলিক ।
" টাকা যা আছে দিয়ে দেন । টিকেটের কথা ভুলে যান ।"
" মানে ? " মামা চেচিয়ে উঠলেন ।
" ওই শাওন । যা ত , বুঝায় দে । "
ঠাস করে হাতের পিছনে রাখা রড দিয়ে মামার ঘাড়ে বাড়ি । পরের দৃশ্য সবাই বুঝতে পারছেন , মানিব্যাগ দূর্বত্তদের হাতে হস্তগত করে আমাদের অলিম্পিকীয় স্টাইলে পলায়ন ।
মোড়ে আসে তিনজনেরই প্রশ্ন , কি হইল এইটা ? আর আমাদের দেখে পানওয়ালার মন্তব্য , " হে হে , আপনারা এই সপ্তাহে জসিম ভাইয়ের তিন নম্বর কেস । মোবাইল আছে না ওইটাও গেছে ? "
" মানে ! এইটা কি ব্যাবসা ? " আমি বললাম ।
লোকটা উত্তর না দিয়ে আমাদের দিকে তাকায় সর্বজান্তা টাইপের হাসি দিল । ওই মূহূর্তে উনাকে হিটলারের চেয়েও নিষ্ঠুর মনে হল আমদের ।
পরের দৃশ্য - ইন্ডিয়ার সাথে বাংলাদেশের জয় । দুই উত্তেজিত মামা ভাগ্নেকে মার জিজ্ঞাসা , " কিরে তোরা ফাইনাল দেখতে যা । বাংলাদেশতো উঠতে পারবে বলে মনে হয় । "
অমনি আমাদের সব হাসি নিভে গেল । কিভাবে বলি - টিকিট কিনতে গিয়ে দুনিয়ার টিকিটিই হারাতে বসছিলাম !
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১২ রাত ২:৪৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিকিৎসকের অবহেলা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২১



বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবিদের দৈনিক ডিউটি টাইম বা কাজের সময় কতো ঘন্টা? সমগ্র বাংলাদেশে, সমগ্র বাংলাদেশে যে কোনো সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারগণ দৈনিক কতো ঘন্টা ডিউটি করেন?

সরকারি হাসপাতালে পড়ালেখা করে, সরকারি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২৭

" অদেখা দূরত্ব "

তুমি ছিলে আমার সেই নাম যা আমি উচ্চারণ করতে পারিনা,
তবে বুকের ভিতর হাজার বার জপ করি।
তুমি আমার সেই আলো যা আমি চোখে দেখিনা,
লুকিয়ে রাখি হৃদয়ের অভ্যন্তরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালছাল মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৬

প্রথম পাতায় ব্যান ব্লগারের একটি পোস্টে ব্লগার রাজীব নূর মন্তব্য করে বলেছেন - “ওদের কে ‘বালছাল’ লিখতে দেন। বিনোদন নষ্ট করবেন না।”

বাহ! কী চমৎকার গণতান্ত্রিক দর্শন! এতদিন জানতাম দেশে তথ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×