somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে জীবনটা আমাকে ছাড়তে চায় না

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




সন্ধ্যায় পিকুর কফির দোকানে বসেছিলাম।
কিছুক্ষণ আগেই একটা ট্রেন চলে গেছে। প্ল্যাটফর্ম মোটামুটি ফাঁকা। স্থানীয় কয়েকজন আড্ডাবাজ ছাড়া তেমন কেউ নেই। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ কফি, কেউ ক্যারামবোর্ড খেলছে। ট্রেন চলে যাওয়ার পর স্টেশনগুলোকে আমার সবসময় একটু বিষণ্ণ লাগে। যেন অনেকগুলো মানুষকে একসাথে কোথাও পাঠিয়ে দিয়ে স্টেশন নিজে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

প্ল্যাটফর্মের একপাশে সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটা মেয়ে বসে ছিল। পুরো প্ল্যাটফর্মে একমাত্র মেয়ে।
চুপচাপ।
হয়তো অপেক্ষা করছিল।
পিকু এক কাপ গরম কফি এনে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আরেক কাপ নিয়ে মেয়েটার কাছে গেল। তখন বুঝলাম, মেয়েটা প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে আসে। পিকুর বউ।
দুজনের আলাদা কোনো কথা নেই। তবু যেন প্রতিদিন সন্ধ্যায় দুজনের দেখা হয়ে যায়।

কফির দাম ত্রিশ টাকা।
পঞ্চাশ টাকা দিলাম।
পিকু বিশ টাকা ফেরত দিল না।
বলল, “ত্রিশ টাকা কফির দাম, বিশ টাকা আমার।”
পিকু ওমনি আছে।

ফেরার সময় বললাম, “কোনো একদিন জোছনা রাতে ঢাকার ট্রেন থেকে তোর দোকানে আবার নামব।”
পিকু বলল, “সমস্যা নাই। আমার দোকান চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে।”
প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, জোছনা নামতে সবসময় পূর্ণিমার দরকার হয় না।
কিছু কিছু রাতে মানুষের ভেতরেই জোছনা নামে।

কিছুক্ষণ পর সিগন্যাল পড়ে গেল। দূরে কোথাও হুইসেল শোনা গেল। কিছুক্ষণ পর অন্তঃনগর ট্রেন আসবে। তাড়াহুড়ো করে মানুষ উঠবে, নামবে। ট্রেন বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না।
জীবনের ট্রেনগুলোরও বোধহয় একই নিয়ম।
বেশিক্ষণ থামে না।

আমাদের খড়ি রাখার ঘরটা এখন কুকুর-বিড়ালের লেবার রুম।
রাজ্যের কুকুর-বিড়াল সেখানে বাচ্চা দেয়।
একটা মা কুকুর ছয়টা বাচ্চা দিয়েছে। খড়ির ঘরের নিচে ছানাগুলোকে নিয়ে শুয়ে আছে। বাইরে বাপ কুকুর পায়চারি করছে। লেজ নাড়ছে। পাহারা দিচ্ছে।
আমাকে দেখে পায়ের কাছে এসে শুয়ে পড়ল।
মনে হলো, বাপ হয়েছে—খুব আনন্দ।

মা কুকুরটা বেশ রুগ্ন। দুধ কিনে এনে দিলাম। চুকচুক করে খেল।
বাপ কুকুরটা একবারও মুখ বাড়াল না।
এরকম আমি আগেও দেখেছি।
মা কুকুরের খাবারে বাপ কুকুর মুখ বাড়ায় না।
দূরে দাঁড়িয়ে দেখে।

কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে পুরোনো সংজ্ঞাটা বোধহয় এটাই—নিজের জন্য রাখা খাবারটুকুও অন্যের জন্য রেখে দেওয়া।

আমার লাগানো এগারোটা পেঁপে গাছের পাঁচটা বেঁচে আছে।
তিনটা ফল দিচ্ছে।
ছয়টা আমের চারার মধ্যে দুটো টিকে আছে। খেয়ে ফেলে রাখা খিরসাপাতি আমের আঁটি থেকে জন্মানো গাছ দুটো দুই বছরে বেশ বড় হয়েছে।
তেজপাতা গাছে নতুন পাতা।
এলাচ গাছে ফলন আসতে এখনও দেড় বছর।
নতুন নারিকেল গাছে কুড়ি দেখা দিয়েছে।
পুকুর পরিষ্কার করে মাছ ছাড়া হয়েছে।
বানে লাউয়ের পাতাগুলো লকলক করছে।
কুলগাছটায় পাখির আনাগোনা।
হঠাৎ চোখ আটকে গেল।
বসন্তবৌরী।
অদ্ভুত সুন্দর একটা পাখি চুপচাপ ডালে বসে আছে।
আমার চোখ ভিজে উঠল।
কেন জানি না।
আসলে জানি।

অনেক বছর আগে আব্বা আমাকে একদিন কুলগাছের একটা পাখি দেখতে ডেকেছিলেন।
আমি রাগ করে যাইনি।
সেই পাখিটা কী ছিল, আজও জানি না।
কিন্তু এত বছর পর বুঝেছি, আমার কষ্টটা পাখিটাকে দেখতে না পাওয়ার জন্য নয়।
কষ্টটা ছিল—
আব্বা ডেকেছিলেন, আর আমি যাইনি।
সেদিনের সেই না-যাওয়া আমার সঙ্গে বড় হয়েছে।
আজ বসন্তবৌরীকে দেখে মনে হলো, হয়তো আব্বার সেই ডাকের উত্তর দিতে এতগুলো বছর লেগে গেল।

সকালের রোদ একটু একটু করে বাড়ছিল।
আর কয়েকদিন পর এই রোদেই কুকুরের ছানাগুলোকে তাদের বাপটা হাঁটতে শেখাবে।
আলতো রোদে দাঁড়ানো শেখাবে।
ঘেউ ঘেউ করতে শেখাবে।
ছানাগুলো গা ঘেঁষে থাকবে।
আমি জানি না কুকুরেরা এসব শেখায় কি না।
তবু আমার মনে হলো, শেখায়।
সব বাবা-ই বোধহয় কোনো না কোনোভাবে শেখায়।

আমার আব্বাও শিখিয়েছিলেন।
কীভাবে মানুষের সামনে দাঁড়াতে হয়।
কীভাবে নিজের সম্মান রাখতে হয়।
কীভাবে অন্যের সম্মান করতে হয়।
কীভাবে একজন দপ্তরির বেতন নিজের চেয়ে কম দেখে লজ্জা পেতে হয়।
কীভাবে একজন বন্ধুকে হারিয়ে শিশুর মতো কাঁদতে হয়।
কীভাবে ছেলের জন্য সিগারেট ছেড়ে দিতে হয়।
আর কীভাবে শেষ বয়সেও পুরোনো মানুষগুলোর কথা লিখে রেখে যেতে হয়।

করোনার সময় চাকরি ছিল না।
দুই বছর বাড়িতে ছিলাম।
মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেত। ঘর থেকে বের হয়ে দেখতাম আব্বা লাঠি ভর দিয়ে বাথরুমে যাচ্ছেন।
আমাকে দেখে বলতেন,
“ঘুম হচ্ছে না?”
আমি বলতাম, “না।”
তিনি বলতেন,
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তখন মনে হতো জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে।
এখন মনে হয়—
শৈশবের পর জীবনের সবচেয়ে ভালো দুই বছর হয়তো তখনই কেটেছিল।

কারণ আমার ছেলে তখন দাদুকে পেয়েছিল।
দাদার কাছ থেকে একটা শৈশব পেয়েছিল।
আব্বা নিয়মিত পাবদা মাছ কিনতেন।
পাবদা মাছ শুধু তিনজন খেতাম—
আব্বা, আমি আর আমার ছেলে।
আমরা চলে আসার পর আব্বা আর পাবদা মাছ কেনেননি।
মাছওয়ালা এখনও কখনো কখনো হাঁক দিয়ে যায়।
কিন্তু নিয়মিত পাবদা মাছ কেনা মানুষটা আর তাকে থামান না।
কিছু শব্দ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় না।
শুধু যাঁর জন্য শব্দটা উঠত, তিনি থাকেন না।

ঢাকায় ফেরার দিন আব্বা কোচস্ট্যান্ড পর্যন্ত আসেননি।
আগে আসতেন।
কোচ ছাড়ার সময় অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতেন।
আমি জানতাম, তিনি তাকিয়ে আছেন।
শুধু আমার দিকে তাকাচ্ছেন না—এমন ভান করছেন।
ভেড়ামারা থেকে বাস ছাড়ল।
এক এক করে পরিচিত সবকিছু পিছনে পড়ে যেতে লাগল।
আমার হাতে মোবাইল।
এক ঘণ্টা পর পর ফোন আসবে না—
“কতদূর এলে?”
“কোথায় আছো?”
“আর কতক্ষণ লাগবে?”
এই প্রশ্নগুলো আর কোনোদিন আসবে না।

ঢাকায় আমার ছেলে অপেক্ষা করছে।
বাবা, বাবা করছে।
কী অদ্ভুত জীবন!
একজন বাবাকে পেছনে ফেলে একজন ছেলে সামনে যাচ্ছে।
আর সেই ছেলের নিজের ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে।
জীবন যেন একটা সুতো।
এক প্রান্তে বাবা।
মাঝখানে ছেলে।
অন্য প্রান্তে আরেক ছেলে।
কেউ কাউকে ধরে রাখে না।
তবু কেউ পুরোপুরি ছেড়েও যেতে পারে না।

ভেড়ামারার শেষ প্রান্তে এসে ফকির লালন শাহের প্রতিকৃতিটা দেখা গেল।
সামনে টোলপ্লাজা।
তারপর লালন শাহ সেতু।
ভেড়ামারা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কুষ্টিয়াও পিছনে পড়ে যাবে।
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম।
মনে হলো, পৃথিবীর কোথাও কোনো এক বাউল হয়তো এখনও হেঁটে যাচ্ছে।
কোনো এক মেঠোপথে।
গাইছে—
“ও জীবন রে…”
জীবনকে ছেড়ে না যাওয়ার গান।
হয়তো মানুষ সারাজীবন এই গানটাই গায়।
বাবাকে ধরে রাখার জন্য।
ছেলেকে ধরে রাখার জন্য।
শৈশবকে ধরে রাখার জন্য।
একটা পাখির ডাককে ধরে রাখার জন্য।
একটা পুরোনো সাবানের গন্ধকে ধরে রাখার জন্য।
একটা পাবদা মাছের দুপুরকে ধরে রাখার জন্য।
একটা কোচস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে ধরে রাখার জন্য।

কিন্তু জীবন কোনো স্টেশনেই বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না।
সিগন্যাল পড়ে যায়।
হুইসেল বাজে।
ট্রেন ছেড়ে দেয়।
আমরা হাত নাড়তে নাড়তে দাঁড়িয়ে থাকি।
তারপর একদিন বুঝতে পারি—
যে মানুষটার কাছ থেকে সারাজীবন “কতদূর এলে?” শুনেছি,
সেই মানুষটার কাছেই আসলে ফিরতে চেয়েছিলাম আমি।
আর ট্রেনটা ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে।

-----
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এটা একটা ফাকিবাজি পোষ্ট

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫



বাংলাদেশে একটার পর একটা বিষয়বস্তু সামনে আসে, আর সবাই সেটা নিয়ে ঝাপায়ে পড়ে। দেখে বিমলানন্দ অনুভবস করি। ''অনুভবস'' বললাম, কারন ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধুরা কোন বিষয়ে ওভার-ক্যাজুয়ালি ফানি আলাপ করলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ভালোবাসার কাব্য=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১১


মন পিঞ্জরে করবো বন্দি, পালাবি আর পাখি?
জানিস কী তুই তোকে নিত্য, নজরবন্দি রাখি!

স্বাধীন ডানায় উড়িস ঘুরিস, আমায় দূরে ফেলে,
আমারও তো ইচ্ছে লাগে, উড়ি ডানা মেলে!

মনের ভিতর ঘূর্ণি তুফান, বেসুরো সুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২৭

" অদেখা দূরত্ব "

তুমি ছিলে আমার সেই নাম যা আমি উচ্চারণ করতে পারিনা,
তবে বুকের ভিতর হাজার বার জপ করি।
তুমি আমার সেই আলো যা আমি চোখে দেখিনা,
লুকিয়ে রাখি হৃদয়ের অভ্যন্তরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×