somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই শহর বহুদিন পর কবিদের ভিজতে দেখতো।

১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বৃষ্টি থেমে গেছে। বৃষ্টির পর চারপাশ কেমন যেন সাদা হয়ে যায়। আলোয় ভরে ওঠে সবকিছু। আকাশটাকে আরও নীল মনে হয়। পরিষ্কার আলোয় সাদা সাদা মেঘ ছুটে বেড়ায়। বৃষ্টি থামার পরের এই পরিবেশটা আমার ভীষণ ভালো লাগে।

নিউ মার্কেটের ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তার পাশে কলকলিয়ে ছুটে যাচ্ছে বৃষ্টির জল। প্রাইভেট কারগুলো দুপাশে জল-কাদা ছিটিয়ে বেপরোয়াভাবে ছুটে চলেছে। মঙ্গলবার, মার্কেট বন্ধের দিন। অন্য দিনের তুলনায় লোকজন কম। তারপরও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে ওভারব্রিজে। লোকজনের গাদাগাদি না হলেও জটলা তো বটেই।

পাশের লোকটা ফস করে একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়া ইদানীং অসহ্য লাগে। অথচ যখন নিজে সিগারেট খেতাম, তখন এমন মনে হতো না।
সামনেই হকার্স মার্কেট। ওখানকার স্ন্যাকস কর্নারে কত দিন বন্ধুদের সঙ্গে ফুলুরি, কলিজার সিঙ্গারা আর জিলাপি খেয়েছি! জমজমাট হইচই, আড্ডা, চা-সিগারেট। বৃষ্টির দিনে গরম সিঙ্গারা খেতে খেতে কত বিকেল যে ফুরিয়ে গেছে! এখন অনেকের মুখে জিলাপি হয়ে গেছে 'জেলেবি'। আড্ডার বন্ধুদের অনেকেই মুঠোফোন থেকে ডিলিট হয়ে গেছে। নতুন করে সেভ করতেও আর মন চায় না।

পাশের লোকটার সিগারেটের ধোঁয়া চোখে লাগছে। কী সিগারেট কে জানে!
আমি যখন সিগারেট ধরতাম, তখন বাংলা ফাইভের দাম ছিল তিন টাকা। আমি আর তুই ভাগাভাগি করে কত খেয়েছি! অঞ্জন দত্তের ‘শুনতে কি চাও—’ শুনতে শুনতে আয়েশি টান। আমি খাতা-কলম হাতে শব্দ জোড়া দিয়ে দু-চারটি নতুন বাক্য বানানোর চেষ্টা করতাম।

তুই বলতি, ‘দেখি, কী লিখেছিস?’

আমার আপাত-অর্থহীন লেখাগুলোর কত নতুন নতুন অর্থই না আবিষ্কার করতি তুই! অবাক হওয়ার ভান করে বলতি, ‘কী অদ্ভুত লিখেছিস রে! চল, দোস্ত, তোকে সিঙ্গারা খাওয়াই।’
হয়তো বাইরে তখন বৃষ্টি। যাব কীভাবে?
তুই বলতি, ‘ভিজতে ভিজতে যাব। ভিজতে ভিজতে খাব।’

আমরা বৃষ্টিতেই রাস্তায় নেমে আসতাম। হা হা করে হাসতাম। আকাশ থেকে নেমে আসত অঝোর বৃষ্টিধারা। আমাদের মনে হতো, যেন অবিরল কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা। আমরা সেগুলো মিছেমিছি ধরার চেষ্টা করতাম।

তুই বলতি, ‘ধর, ধর, দোস্ত! হাত গলিয়ে যেন বেরিয়ে না যায়।’

আমি বলতাম, ‘আকাশ পরিশুদ্ধ করে বিষাক্ত ক্লেদ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে।’

তুই বলতি, ‘এই বৃষ্টি অনাবাদি ভূমির উর্বরতা বাড়াবে। মাটির বুক ফুঁড়ে মাথা তুলবে সাহসী বীজের অঙ্কুরোদ্গম। যেমন শোষিত মানুষ মাঝে মাঝে সাহসী হয়ে মাথা তোলার চেষ্টা করে।’

এভাবেই যোগ হতো আমাদের অধিবিদ্যার পঙ্‌ক্তিমালা। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা পৃথিবী বদলে দেওয়ার কথা বলতাম। অথচ নিজেদের জীবনে কী অপেক্ষা করছে, তার কিছুই জানতাম না।

তোর সঙ্গে বহুকাল যোগাযোগ নেই।

শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন আমরা গোল্ডেন ট্রিনিটি নিয়ে কথা বলেছিলাম। তুই সেদিন খুব আনমনা ছিলি। সিগারেট টানছিলি ভাবলেশহীনভাবে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলি, ‘ভাতের দাম খুব বাড়ছে রে দোস্ত।’
তারপর বলেছিলি, ‘তুই ভালো থাকিস।’
হনহন করে চলে গিয়েছিলি। একবারও পেছনে ফিরে তাকাসনি।

পাশের সিগারেট টানা লোকটার ধূমপান শেষ। সে-ও চলে যাচ্ছে কিছুটা যান্ত্রিকভাবে। ঠিক তুই যেভাবে চলে গিয়েছিলি। কোথায় যেন ভীষণ তাড়া!
ওভারব্রিজের নিচে বাস, ট্যাক্সি, স্কুটার, অটোরিকশা অবিরাম ছুটে চলেছে। যে গাড়িটা চলে যাচ্ছে, মুহূর্তেই সেটা আর দৃশ্যমান থাকছে না।
তোর মতো।

আমি তাকিয়ে থাকি সায়েন্স ল্যাব পেরিয়ে মিরপুর রোড ধরে বহুদূরে। তোর কথা খুব মনে পড়ছে। কী করছিস, কেমন আছিস? এখনও কি ভাতের দাম বাড়লে তোর দুশ্চিন্তা বাড়ে? পয়সার অভাবে কি আজও প্রতিদিন পেট ভরে খাওয়া হয় না তোর?
মনে আছে, একদিন সন্ধ্যায় তুই এসে ভাত খেতে চেয়েছিলি। আমি মেসে খেতাম। হিসাবের রান্না। তোকে নিয়ে হোটেলে গিয়েছিলাম।
সাধারণত তুই দুই প্লেট ভাত খেতিস। কিন্তু সেদিন এক্সট্রা প্লেট খেয়েও বলেছিলি, ‘দোস্ত, আজ খাওয়ার পরে একটা সিগারেট ভাগ করে খাব। তিন টাকা তো বাঁচবে। বরং আর এক প্লেট ভাত বলি। সারাদিন খাওয়া হয়নি তো।’
আমি কিছু বলিনি।
কীই-বা বলতাম!

আমরা মাঝে মাঝে রাস্তায় হাঁটতাম আর বলতাম, ‘দেখিস বন্ধু, আমরা একদিন এই শহরের সমস্ত রাস্তাঘাট কিনে ফেলব।’
এই শহর খ্যাপাটে কবিদের অভিমান জমা করে। চাইলেই খ্যাপাটে কবিরা এই শহরকে কিনে নিতে পারে।

জানিস, ওই সিগারেট খাওয়া লোকটার মতো তুই যদি এখন আমার পাশে এসে দাঁড়াতি!
বিশ্বাস কর বন্ধু, সেদিন আর গোল্ডেন ট্রিনিটির মানে খুঁজতাম না। মানিক-রবি-অঞ্জন-সুমন বাদ দিয়ে বলতাম, ‘চল, তোকে পেট ভরে ভাত খাওয়াই।’
তুই হয়তো বলতি, ‘বৃষ্টি তো, যাব কী করে?’
আমি বলতাম, ‘ভিজতে ভিজতে যাব। ভিজতে ভিজতে খাব।’
তারপর দুজনে আগের মতো হা হা করে হাসতে হাসতে নেমে জুতাম রাস্তায়।

এই শহর বহুদিন পর কবিদের ভিজতে দেখতো।

হঠাৎ মেঘের গর্জনে ভাবনায় ছেদ পড়ে। চেয়ে দেখি, আকাশে আবার মেঘ জমছে। ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে শহর। আবার বৃষ্টি হবে বোধহয়।বৃষ্টির আগে শহর ঝাপসা হয়ে যায়। চোখ আর শহরের কী অদ্ভুত মিল!
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪৪
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×