
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে প্রথম যে শব্দটা ফিরে এসেছিল, সেটা পাখির ডাক নয়। একটা বুলডোজারের শব্দ।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে হবে। নতুন রাস্তা তৈরি হবে। ভেঙে পড়া বাড়িগুলোর জায়গায় উঠবে বহুতল ভবন। শহরটাকে আবার বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।
সবকিছুই ঠিক ছিল। শুধু শহরের মানুষগুলো আর আগের মতো ছিল না।
এক বৃদ্ধ প্রতিদিন সকালে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেন। বাড়িটা তাঁর নিজের ছিল না। যুদ্ধের আগে সেখানে একটা ছোট্ট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছিল। দোকানের মালিকের সঙ্গে তাঁর বিশেষ বন্ধুত্বও ছিল না। সকালে হাঁটতে বেরিয়ে দুজনে মাঝেমধ্যে কথা বলতেন। আবহাওয়া নিয়ে, বাজারের দাম নিয়ে, কখনো ফুটবল নিয়ে।
একদিন দোকানটা বন্ধ হয়ে গেল। পরদিনও। তার পরদিন শহরটার ওপর বোমা পড়ল।
যুদ্ধ থামার পর বৃদ্ধ জানতে পারলেন, দোকানদার আর তাঁর পরিবার কেউ বেঁচে নেই।
কেন জানি না, বৃদ্ধের মনে হয়েছিল, লোকটা ফিরে আসবে। হয়তো কোথাও আশ্রয় পেয়েছে। হয়তো অন্য শহরে চলে গেছে। হয়তো একদিন সকালে দোকানের শাটার তুলে আবার বলবে, ‘কী খবর, আজকাল দেখা যায় না যে!’
কিন্তু কোনো কোনো অনুপস্থিতি এত দীর্ঘ হয় যে একসময় তাকে মৃত্যুর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে হয়।
বৃদ্ধ জানতেন, দোকানটা আর ফিরবে না। তবু প্রতিদিন সেখানে দাঁড়াতেন।
একদিন এক তরুণ সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি এখানে প্রতিদিন আসেন কেন?’
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘লোকটা আমার কাছে কিছু টাকা পেত।’
সাংবাদিক অবাক হয়ে গেল। ‘কত টাকা?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘মনে নেই।’
সাংবাদিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তার ক্যামেরায় বৃদ্ধের মুখটা ধরা পড়ল। পরদিন পত্রিকায় একটা ছবি ছাপা হলো। শিরোনাম ছিল— যুদ্ধের পরও বেঁচে থাকা মানুষেরা।
ছবিটা অনেকেই দেখল। কেউ দুঃখ পেল, কেউ সহানুভূতি জানাল। তারপর অন্য খবর এল। অন্য যুদ্ধ, অন্য মৃত্যু, অন্য কোনো দেশের পতন।
পৃথিবী এভাবেই এগিয়ে যায়।
কেবল বৃদ্ধটি জানতেন, লোকটা তাঁর কাছে কোনো টাকা পেত না। এক শীতের সকালে বৃদ্ধের পকেটে টাকা ছিল না বলে দোকানদার তাঁকে বিনা পয়সায় এক কাপ কফি দিয়েছিল। বলেছিল, ‘থাক, আরেক দিন দেবেন।’
সেই আরেক দিনটা আর আসেনি।
বহু বছর পর সেখানে একটা নতুন ভবন তৈরি হলো। নিচতলায় ঝকঝকে কাচের দেয়াল, ভেতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দোকান। উদ্বোধনের দিন বেলুন উড়ল, ফিতা কাটা হলো। শহরের মেয়র বললেন, এই ভবন প্রমাণ করে, মানুষকে পরাজিত করা যায় না।
কথাটা সত্যি।
মানুষকে পরাজিত করা কঠিন।
কিন্তু মানুষ যখন জয়ী হয়, তখন কাদের কথা মনে রাখে?
যে সৈনিক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে, সে জানে না তার গুলিতে কার মৃত্যু হয়েছে। যে রাষ্ট্র বিজয় ঘোষণা করে, সে জানে না কতগুলো বাড়িতে আর কোনো দিন সন্ধ্যার বাতি জ্বলবে না। যে পতাকা আকাশে ওড়ে, তার ছায়া পড়ে কারও কারও কবরের ওপরেও।
আর যে শিশু যুদ্ধের মধ্যে বড় হয়, তার কাছে পৃথিবী মানে হয়তো একটা আশ্রয়কেন্দ্র, কিছু অপরিচিত মুখ আর মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার অভ্যাস।
তাকে আমরা একদিন বলব, যুদ্ধ শেষ হয়েছে।
সে হয়তো বিশ্বাস করবে।
শুধু কোনো এক রাতে দূরে বজ্রপাত হলে তার ঘুম ভেঙে যাবে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারপর নিজেকেই বোঝাবে, ওটা কেবল মেঘের ডাক।
আমরা পৃথিবীকে সভ্য বলি। আমাদের শহর আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, জাদুঘর আছে, মহাকাশযান আছে। আমরা দূর গ্রহে প্রাণের সন্ধান করি। অথচ এই গ্রহে একজন মানুষের নিরাপদে ঘুমানোর অধিকার নিশ্চিত করতে পারি না।
আমরা নক্ষত্রের কাছে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিই, অথচ পাশাপাশি বসে থাকা দুজন মানুষের মধ্যে একটা সীমারেখা টেনে দিতে আমাদের কয়েক সেকেন্ডও লাগে না।
তারপর সেই সীমারেখা রক্ষার জন্য অস্ত্র তৈরি হয়। অস্ত্র রক্ষার জন্য আরও অস্ত্র। আর অস্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা শান্তির কথা বলি।
পৃথিবীটা কারও একার ছিল না।
কোনো পতাকা আকাশের মালিক নয়। কোনো সীমান্ত নদীকে তার উৎস ভুলিয়ে দিতে পারে না। কোনো বিজয় মৃত মানুষের কাছে গিয়ে ক্ষমা চায় না।
তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে।
ধ্বংসস্তূপের পাশে একটা শিশু গাছের চারা পুঁতে দেয়। সে জানে না, গাছটা কত বড় হবে। জানে না, যে মাটিতে সে চারাটা পুঁতছে, সেই মাটির নিচে কত মানুষের স্মৃতি চাপা পড়ে আছে।
সে শুধু জানে, গাছ বড় হলে ছায়া হবে।
হয়তো একদিন সেই ছায়ায় এমন দুজন মানুষ বসবে, যাদের পূর্বপুরুষ একসময় পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তারা নিজেদের পরিচয় দেবে, গল্প করবে, একে অন্যের ভাষা শিখবে। তারপর বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরে যাবে।
তাদের কেউ জানবে না, বহু বছর আগে একটা শিশু এই গাছটা লাগিয়েছিল।
জানার প্রয়োজনও নেই।
পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সব সময় নায়ক হতে হয় না। কখনো কখনো শুধু এমন কিছু করে যেতে হয়, যার উপকার ভোগ করবে এমন মানুষ, যাদের সঙ্গে তোমার কোনো দিন দেখা হবে না।
যুদ্ধ থেমে যাবে। পতাকা বদলাবে। মানচিত্র নতুন করে আঁকা হবে।
কিন্তু একদিন যদি কোনো শিশু পৃথিবীর ইতিহাস পড়তে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘এত কিছু জানার পরও মানুষ যুদ্ধ করত কেন?’
আমাদের হাতে হয়তো অনেক উত্তর থাকবে।
শুধু এমন একটা উত্তর খুঁজে পেতে কষ্ট হবে, যেটা বলতে গিয়ে আমাদের চোখ নামিয়ে নিতে হবে না।
সেদিন পর্যন্ত পৃথিবীটা আমাদের সবার।
আর তার ধ্বংসের দায়ও।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




