somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার শেষ ভাইফোঁটা

১২ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ১২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের শ্যামবাজারের বাসা বাড়িটা আমার শৈশবের স্মৃতি নিয়ে আজও মাথা তুলে দঁড়িয়ে আছে । জানিনা কোনদিন হয়তো ওটা আধুনিক কোন বহুতল বাড়ি হয়ে যাবে।

কিন্তু আমার শৈশব ঐ বাসাবাড়িতেই ফেলে এসেছি । তাই তাকে বারেবারেই খুঁজতে যাই ওখানে। আমার ছোটভাই গৌর ছিল সত্যিই দুরন্ত। মাঝে মাঝেই বেশ দুষ্টুমি করতো।কিন্তু মা দেখতাম খুব সহ্য করতেন।একদিন মা রান্না বান্না সেরে রেখেছেন ও কোথ্থেকে এসে তার ওপর ময়লা ছড়িয়ে দিল। ঠাকুমা রেগেমেগে বলতে লাগলেন ওকে বেশ করে মারো। মা দেখলাম কিছুই করলেন না। শুধু ঐ রান্না ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে রাঁধতে বসলেন। মা বলতে লাগলেন দুষ্টুমির জন্য তো ওকে সবাই বকে আবার আমরাও যদি বকি তবে ও দাঁড়াবে কোথায় ।যাবে আমার গতর আর ওর বাবার পয়সা। সত্যি বাবাও দেখতাম এ ব্যাপারে মার সাথে একমত ছিলেন। গৌর একদিন আলুকাবলিওয়ালার ঝুড়িতে ময়লা ফেলেছিল, আলুকাবলিওয়ালা তো আর মা না, সে বাড়িতে এসে খুব চেঁচামেচি করতে লাগলো।বাবা তাকে সমস্ত আলু আর মশলার দাম দিয়ে দিলেন কিন্তু গৌরকে কিছু বললেন না।

ছোটবেলায় গৌর কথা শিখেছিল অনেক দেরি করে।বাবা ওকে বলতেন একটা করে কথা বললে একটা করে টাকা দেব।বাবা মা ওকে খুব ভালোবাসতেন।কিন্তু ওর দুষ্টুমির জন্য মা বাবা ছাড়া অন্যদের কাছে ভালই মারধোর খেত। একদিন হয়েছে কি, ও কি একটা অন্যায় করেছে এখন আমার ঠিক মনে নেই ।ছোটকাকা দেখি ভীষণ রেগে গেছে।ছোটকাকা যে কি রাগী তা আমরা সবাই জানতাম। এবার তো জানি ছোটকাকা ওকে খুব মারবে।কিন্তু ছোটকাকা ওকে মারধোর না করে একটা বড় ট্রাঙ্কে ভরে তালা দিয়ে দিলেন। আমি আর মা কাঁচুমাচু মুখ করে ট্রাঙ্কের দিকে তাকিয়ে রইলাম।বুঝতে পারছিলাম ছোটকাকা রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছেন।কিন্তু কিছু বলার সাহস নেই। এসময় ঠাকুমা এসে ছোটকাকাকে বকতে লাগলেন ও যদি মরে যায় তবে তো তোর ফাঁসি হয়ে যাবে। ঠাকুামার বকা অথবা ফাঁসি হওয়ার ভয় যে কারণেই হোক ছোটকাকার চৈতণ্য হল। ছোটকাকা ট্রাঙ্কের তালা খুলে দিলেন। মা আর আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

আমার আর এক ভাই ছিল কেষ্ট।আমার থেকে প্রায় পনেরো বছরের ছোট।ওরও জন্ম শ্যামবাজারের ঐ বাড়িতেই।ওরজন্মের পরেই মা অসুস্হ হয়ে পড়েছিলেন।তাই আমিই ওকে তুলোয় করে দুধ খাইয়ে বাঁচিয়ে ছিলাম। কেষ্ট আমায় ডাকত দিদি বলে কিন্তু মায়ের মত ভালোবাসত। আমার প্রথম সন্তানের ভালোবাসা বোধায় ওকেই দিয়েছিলাম। মাত্র তেরো বছর বয়সে ও ক্যান্সারে মারা যায়। কেষ্টর স্মৃতি আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনা। ও পড়ত সেন্ট পলস্ বোর্ডিং স্কুলে। ছুটিতে বাড়ি আসত আর কিছুতেই ফিরে যেতে চাইত না। মনে আছে আমার বিয়ের সময়, তখন ও বছর ছয়েকের। বিয়ের পর বরের গাড়ি কিছুতেই ছাড়তে দেবেনা। আমার দিদিকে কোথাও নিয়ে যেতে দেব না বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল, কারুর বারন শোনেনা। শেষে আমার শ্বশুরমশাই মিষ্টি খেও বলে ওর হাতে টাকা গুঁজে দিতেই সব ভুলে গিয়ে আমাকে ছেড়ে দিল। শেষ বার ভাইফোঁটা নিতে এলো যে বছর, আমার বাড়ি এসেছিল প্রায় পাঁচবার। প্রথমবার অন্য ভাইদের সাথে তারপর, একাই চারবার। আমার শ্বশুরবাড়ি ছিল বাড়ি থেকে একটা মাত্র স্টেশন। ও যতোবারই আসে প্রতি বারই শ্বশুরমশাই ওকে মিষ্টি টিষ্টি খাইয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসেন। ও ঘন্টাখানেক পরেই এসে উপস্থিত হয়। শেষে আমিই অকে আলাদা করে বুঝিয়ে বললাম, ভাই কুটুমবাড়ি কি একদিনে এতোবার আসতে আছে, লোকে কি বলবে? ও কি বুঝল কে জানে, আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, দিদি আসতে নেই না, আর আসবনা। তারপর আর ও আসেনি। জানুয়ারী মাস নাগাদ ওর গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে। গায়ে প্রচন্ড জ্বর থাকায় কিছুতেই ray দেওয়া গেল না। আট মাস ভুগে শেষে ১২ই সেপ্টেম্বর পূজোর ঠিক আগে আগেই ও চলে গেল।

সেই থেকে আমি আর ভাইফোঁটা দিইনা।




১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×