somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘নতুন’ কারাগারে সবকিছু নতুন, শুধু দুর্নীতিটা থাকছে পুরাতন

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এই নিয়ে দুইদিন কেরানীগঞ্জে স্থানান্থরিত হওয়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলাম। বিশাল আয়তনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নতুন এ কারাগার। স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু সেখানে নতুন। তবে কিছু সময় যেতেই বুঝতে পারলাম, একটা জিনিস বহাল তবিয়তে সেখানে পুরাতন আছে। আর সেটি হচ্ছে লাগামহীন দুর্নীতি।

বন্দীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য একটি টোকেন নিতে হয়। সেটি নিলাম, কিন্তু শুধু টোকেন নিলে তো হবে না। দেখা করার উপায় তো জানতে হবে। খোঁজাখুঁজি করে কোথাও কোনো নির্দেশনা পেলাম না। টোকেনে দেখলাম, একটা আনুমানিক সময় লেখা আছে, যে সময়ের মধ্যে বন্দী সাক্ষাৎ রুমে আসবে। সমস্যা হচ্ছে, সেই বরাদ্দ আধাঘণ্টা সময়ের মধ্যে নাও আসতে পারে, এমন হতে পারে সাক্ষাৎ রুমে ভিড়ের কারণে দেখা হল না, দেখা হলেও কথা বলা এবং শোনা দুঃসাধ্য। সাক্ষাৎরুমটি এমনই সুরক্ষিত যে লোহার গ্রিলের ফাঁক থেকে বন্দীর সাথে কথা বলা খুব কঠিন, তার ওপর এত ভীড় থাকে যে কথা শোনা যায় না। এগুলো অব্যবস্থাপনা, তবে অব্যবস্থাপনা থেকেই মূলত দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। কারাগারে অন্তরীণ বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র পরিবারের, শিক্ষা এবং সচেতনতাও তাদের কম, ফলে তারা ওখানে দুর্নীতির মূল শিকারে পরিণত হচ্ছে।

একজন নারী অনেকক্ষণ ধরে টোকেন হাতে নিয়ে ঘুরছে, কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না। অবশেষে জানতে পেরেছে যে বন্দীদের ভিতরে গিয়ে রুমে না পেলে মাইকিং করে জানানো হয় তাকে দেখা করার কথা। টোকেনে উল্লিখিত সময় পর্যন্ত যদি সাক্ষাৎপ্রার্থী সাক্ষাৎরুমে অবস্থান করে তাহলে বন্দীর সাথে দেখা হতে পারে। জনৈক ঐ মহিলা যতক্ষণে জানতে পেরেছে ততক্ষণে সময়টি অতিবাহিত হয়েছে। ফলে সে আবার স্লিপ নিয়েছে। স্লিপ যে আবার নেওয়া যায় সেটি জানতেও তার নাভিঃশ্বাস উঠেছে। সাক্ষাতের ক্ষেত্রে এরকম মারাত্মক অব্যবস্থাপনা এখনো আছে। তবে নতুন জায়গায় সাক্ষাতের ক্ষেত্রে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেশ কমেছে। অন্তত সাক্ষাৎ রুম পর্যন্ত সাক্ষাৎপ্রার্থী বিনা পয়শায় পৌঁছুতে পারছে।

কারাগারের বাইরে (কারাগারের পরিচালনায়) কয়েকটি দোকান আছে, একটি জায়গা আছে যেখানে মোবাইল ব্যাগ ইত্যাদি রাখতে হয়। প্রতিটি মোবাইল রাখতে লাগে দশ টাকা। মূল সমস্যা হচ্ছে দোকানগুলোতে। পাঁচ টাকা দামের একটি ম্যাটাডোর কলম ওখানে বিক্রি হয় দশ টাকায়। এটি থেকেই অন্যান্য পণ্যের দামের ফারাক সহজেই বোধগম্য। একটি কলা কিনলাম দশ টাকা দিয়ে, কিন্তু সেটি খাওয়া গেল না, মধ্যে শক্ত। চা খেতে দিয়েও একই অভিজ্ঞতা। পনেরো টাকা দাম এক কাপ চা, কিন্তু সেটি অখাদ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার পরিচালিত দোকানে দাম এত বেশি নেওয়া এবং অখাদ্য জিনিস বিক্রি করার জন্য কার দণ্ড হতে পারে, মোবাইল কোর্ট কার জরিমানা করবে বা মোবাইল কোর্ট আদৌ পরিচালনা করা সম্ভব তো?

কারাগারের মূল সমস্যাটি রয়েছে জামিনপ্রাপ্ত বন্দী মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে। জামিন কোর্ট থেকে পৌঁছুল কিনা সেটি জানার কোনো সুব্যবস্থা নেই, ব্যবস্থা যতটুকু আছে তাও কার্যকর নয়। প্রতিদিন সকালে কিছুক্ষণ পরপর একটি তালিকা টানানোর কথা, কিন্তু ১৫/০২/২০১৭ তারিখে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থেকে কোনো তালিকার হদিশ পেলাম না। ওখানে দায়িত্বরত সুবেদার রফিকুল ইসলাম বললেন, আজকে তালিকা টানানো হয়নি।

স্বজনদের কেউ কেউ (যারা স্বচ্ছল এবং ইচ্ছুক) টাকা দিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ কেউ একটু বেশি খরচ করে বন্দী বের করে নিয়ে আসছে। খুব সহজে এবং স্বাভাবিকভাবে যে কাজটি হওয়ার কথা, সে বিষটি কঠিন করে এবং অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে দুর্নীতি টিকিয়ে রাখতে। যেটা দেখলাম, দায়িত্বপ্রাপ্তরা ওখানে দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না দুর্নীতির সুযোগ থাকায়, কারণ বেশিরভাগ ওখানে সুযোগ খুঁজছে এবং তথ্য না দিয়ে বা ভুল তথ্য দিয়ে স্বজনদের বিভ্রান্ত করছে।

অথচ বিষয়টি খুব সহজে পরিচালনা করা যায়, কারাগারে প্রত্যেকটি বন্দীর রেজিস্টারে স্বজনদের মোবাইল নম্বর থাকা উচিৎ, সে নম্বরটিতে ফোন করে জানিয়ে দিলেই হয় যে বন্দীর জামিননামা কারাগারে পৌঁচেছে এবং বন্দীকে মুক্ত করা হয়েছে। এবং পুরো প্রক্রিয়ার জন্য যে সময়টুকু দরকার সেটিও স্বচ্ছভাবে জানানো যায়। মূল কথা হচ্ছে, মানুষকে তার তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

সকল তথ্য এবং নিয়মকানুন কারাগারের ওয়েব সাইটে অবশ্যই থাকা উচিৎ, পাশাপাশি কারাগারের মূল ফটকে এসব বিষয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা থাকা খুবই জরুরী। তবে সবকিছু থেকে বেশি জরুরী, কর্মরতদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা, তাদের সেভাবে ট্রেইনড করা, দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের সচেতন করা।

সরকারি চাকুরেদের বেতন দিগুণ করে এমনিতেই সমাজে বড় ধরনের বৈষম্য (মানসিক এবং অর্থনৈতিক দুই ধরনেরই) তৈরি করা হয়েছে, তার ওপর যদি দুর্নীতি কমানো না যায়, তাহলে গণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হবেই, কার্যকর কোনো প্রতিবাদ করতে না পারলে এই বিক্ষুব্ধতা থেকে নানান ধরনের সমস্যা এবং সামাজিক অস্থিরতা জন্ম নেয় অবশম্ভাবিভাবে।




সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১১:৩৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতটা নির্লজ্জ বেহায়া ভিসি সারা দুনিয়াতে নেই-- ছি:

লিখেছেন অপলক , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০১

একটা মানুষ কতটা নির্লজ্জ হতে পারে, সেই সাথে ক্ষমতার+ টাকার+ সরকারী সুবিধাদী পাবার কাঙ্গাল হতে পারে, চুয়েটের ভিসি (Vice-Chancellor) কে না দেখলে জানতেই পারতাম না। এতদিন শুধু লোভী বলে বুবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×