somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রবীন্দ্রনাথে নারী ও মানবতার মুক্তি

০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাঙ্গালীর সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে ছোট বেলায় মায়ের সাথে মাথা নেড়ে নেড়ে,‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে।’ কেউ আবার বাবার সাথে সুর মিলিয়ে গেয়েছি ,‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান, শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো তিন কন্যা দান।’

তারপর আরেকটু বড়বেলায় রবিঠাকুর আসেন ফটিকের মর্মান্তিক করুন প্রয়াণে।তারপর আমাদের জীবনের বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন বিভিন্ন ভাবে। যখন কোন অজানা ব্যথায় কাতর হয়েছি তখন চোখ বন্ধ করে ‘যদি জানতেম আমার কিসেরও ব্যথা তোমায় জানাতাম’ নিজের মনে গেয়ে গেয়ে সান্তনা খুঁজেছি। ভালবাসার মানে খুঁজে না পেয়ে রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় নিয়েছি ‘সখী ভালবাসা কারে কয়’, গানে।

কখনো এসেছেন ‘আমার পরানো যাহা চায় তুমি তাই’, আবার কখনো এসেছে ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’ প্রার্থনায়। এভাবে নানা গানে নানা অভিব্যক্তিতে। প্রতিটি দিন, প্রতিটি পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের গানে আমরা খুঁজেছি আমাদের প্রেম, আবেগ, বিরহ, ক্লান্ত মনের সান্ত্বনা।

যখন আনন্দে মেতে উঠেছি, নিজের মনেই কতবার গেয়ে উঠেছি, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ুরের মত নাচেরে’। গ্রামের পথ দিয়ে চলতে চলতে কতবার যে ভাই বোনরা চিৎকার করে করে গেয়েছি ‘গ্রাম ছাড়া ঔ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায়রে’। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের হয়ে থাকেন, আমরা রবীন্দ্রনাথের হয়ে আছি।

রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা বিভিন্ন ঋতুতে এসেছে বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন আবেগে। মানুষের জীবনের এমন কোন অনভুতি, আবেগ সুখ দঃখ নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখে যাননি। রবীন্দ্রনাথ বিরাজ করছেন আমাদের অন্তরে, বাহিরে সর্বত্র।রবীন্দ্র সাহিত্যের অনেক রকম বৈশিষ্ট্যই থাকতে পারে।

তবে নারী জাগরণ আর মানুষের জয়গান গাওয়া এই সাহিত্যের সুশোভিত পরিচয়। আঠারো শতকে নারীর অধিকার যখন অনেকটাই অকল্পনীয়, তখনও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নারীকে তুলে এনেছেন তার লেখনির কেন্দ্রীয় চরিত্রে। নারীকে উপস্থাপন করেছেন : স্বাধীনচেতা, সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ও সাহসী হিসেবে।

প্রেম-প্রকৃতি আর সুন্দরের পূজা করেও নিজের প্রথাবিরোধী লেখনির মাধ্যমে নারীর জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র সাহিত্যে আমরা বেশ ক’জন নারীকে পাই যারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে আলো জ্বালিয়েছেন। আবার রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানবমুক্তি তথা মানবতার গান।

ভারতবর্ষে যখন সংস্কার কিংবা প্রথার বাইরে যাওয়ার চিন্তা অবান্তর ছিল বলা যায়, তখনই নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবলা নারীর সবলা চরিত্র এঁকেছেন তার গল্প, কবিতা এবং উপন্যাসেও। নারী স্বাধীনতা বা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তার লেখনী রীতিমত প্রথা ভাঙ্গার এক অন্যরকম সংগ্রাম। কবিগুরুর লেখায় উঠে আসে সাম্যের সমাজ গড়তে নারীর ক্ষমতায়নের কথা।

রবীন্দ্রনাথের গল্প নারীমুক্তির দরজা খুলেছে। নারীকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তার লেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদী রুপ তুলে এনেছেন। স্ত্রীর পত্রে মৃনাল চরিত্রে এঁকেছেন নারীর রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথা। যেমনটা এনেছেন, ছোটগল্প সমাপ্তির মৃন্ময়ী, ল্যাবরেটরীর সোহিনী, অথবা শাস্তি উপন্যাসের চন্দরা চরিত্রের মাধ্যমে।

আর শেষের কবিতায় লাবন্য এসেছে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সমাজে নারী বন্দীর গতানুগতিক প্রথা ভাঙ্গা আধুনিক, জটিল, চির রহস্যময়ীর ভূমিকায়, যাকে আমরা দেখেছি মুক্ত, স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে। প্রেমের পাশাপাশি লাবন্যের এই পরিচয়টাই ছিল উপণ্যাসের সারগর্ভ। এভাবেই রবীন্দ্র সাহিত্যের সব নায়িকারাই নারী মুক্তির মশাল জ্বেলেই উদ্ভাসিত হয়েছে।

দেশ কাল সমাজ মানুষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার কেন্দ্রস্থল ছিল মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা ‘নোঙচিকের চিঠি’ ও ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক বিখ্যাত রচনার কথা অনেকেরই জানা। ‘রাশিয়ার চিঠি’র প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখতে পাই সেখানে ফুটে উঠেছে নতুন সমাজ গঠনের সাহসী উদ্যোগ, যেখানে মানবতার উন্মেষ ঘটাতে সনাতনকে কিভাবে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে তার চিত্ররূপ।

মানবতার বিস্ময়কর মানব বাউল সাধকের প্রতি কবির ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। সেই শ্রদ্ধার জায়গাটি আবেগসিক্ত করে রাখতেই রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের খাতা সংগ্রহ করেছিলেন। যে খাতা দুটি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত রয়েছে। এই খাতা নিয়ে অনেক বিতর্ক অভিযোগ আছে ।

আবার আমরা দেখেছি, রবীন্দ্রনাথ যখন চীনে গেলেন (১৯২৪) তখন সেখানেও কিছু কাণ্ড ঘটেছিল। এ পর্বে চীনের রাজনীতি সুস্থির ছিল না। সাংহাইতে সম্বর্ধনায় রবীন্দ্রনাথ যে ভাষণ দিলেন তাতে বললেন চীন ও এশিয়ার প্রতিবেশী জাতিগুলোর সঙ্গে ভারতের মৈত্রীর পথ উন্মোচন করার জন্য তিনি চীনের যুবমনকে আহ্বান করছেন।

তখন চীনা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একাংশ ভাবতে চাইল, রবীন্দ্রনাথের এই সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্যটা কি? রবীন্দ্রনাথ পরের দিনের বক্তৃতায় তার উত্তর দিলেন। কোনো রাজনৈতিক সুবিধা সংগ্রহের জন্য তিনি আসেন নি, এসেছেন স্বার্থশূন্য প্রেম ও মৈত্রীর জন্য। যা মূলত বিশ্ব মানবতার পক্ষে।

আজকাল অনেককেই দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের বিদেশ প্রীতি নিয়ে নানা কথা বলে নিজেকে বিশেষ পন্ডিত বানাতে চান। একজন আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক হিসেবে, মানুষ হিসেবে বিদেশ ও বিদেশের কৃষ্টি কালচার তাকে প্রভাবিত করেছে বটে, দাসে পরিণত করেনি। তার প্রমাণ পাই ১৯১৯ সালে।

বৃটিশরা যখন নির্বিচারে মহাভারতের মানুষদের হত্যা করেছিল, যা ইতিহাসে জালীয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড নামে পরিচিত হয়ে আছে। তখন কবিগুরুকে বৃটিশরা তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘নাইট’ উপাধী প্রদান করেছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের হত্যা খুনের রাজনীতিকে ঘৃণা জানিয়ে ‘নাইট’ উপাধী প্রত্যাখান করেছিলেন। এখানে রবি ঠাকুরের দেশপ্রেমের জয়। এখানে জয় মানবতার। যে শাসকের হাত নিরীহ মানুষের রক্তে, স্বজাতির রক্তে রঞ্জিত হয়েছে সেই শাসকের যোদ্ধা উপাধী কবিকে সম্মানিত করতে পারেনি।

অতঃপর, রবীন্দ্রনাথ নারী মুক্তির আসমান-যেখানে নারীরা কালো মেঘের আঁধার কেটে ডানা মেলেছেন জীবনের উচ্ছল স্বাধীনতায়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব মানবতার বিস্ময় পূরুষ! যার জীবন-কর্ম-সাহিত্যের কাছে মানুষ এসে ভালবাসার ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে।

এবছরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একশত বায়ান্নতম জন্ম জয়ন্তীতে ব্যাপক আয়োজন আর কর্মসূচী ছিল এপার-ওপার দুই বাংলার সরকার ও রবীন্দ্রপ্রেমীদের। পাশাপাশি এই বছরেই ‘গীতাঞ্জল’তে কবির নোবেল জয়ের শত বর্ষ পূর্ণ হয়েছে।

কবিগুরুর জন্ম জয়ন্তীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সেই সাথে কবির নোবেল জয়ের শত বর্ষ পূর্তিতে গর্ববোধ করতে চাই-নোবেল জয়ের মাধ্যমে কবি আমাদের সারা বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলে।

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ২:০৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্ত-গায়েব-গুম এবং পিওর ও শিওর লাভ

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৬


৭ মাসে বাংলাদেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ !!!
এমন রোমহর্ষক, চমকে যাওয়া এবং অন্তরে কাপুনি ধরানোর মতো তথ্য বা কথা বার্তার কোনও মানে হয় ??!!
গরীব পরিবারের শিশুদের কথা বাদ দেই-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারী অফিসারদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০০

দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরকারী অফিসারদের হাত ধরেই হয়। সেজন্যে, এই পদগুলো যোগ্য মানুষদের হাতে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েক দশকে দেশের টপ ট্যালেন্টদের বেশির ভাগই কোনক্রমেই সরেকারী অফিসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×