
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও শিক্ষার মানদণ্ড
ফকির ইলিয়াস
=========================================
এটা আমরা সবাই জানি, একটি জাতি শিক্ষিত হলে সেই রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন ঘটে। মানুষ যখন তার অধিকার বিষয়ে সচেতন হয় তখন সে অনেক দাবিও আদায় করতে পারে। অথবা নিজেই চেষ্টা করে ফেরাতে পারে নিজের ভাগ্য। কিন্তু একটি প্রজন্মকে সঠিকভাবে শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে কি? কিংবা তাদের সঠিক তথ্য জানিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে কি? এমন অনেক কথাই আসছে। বাংলাদেশে দুটি শিক্ষাপদ্ধতি বিদ্যমান। একটি স্কুল শিক্ষা আর অন্যটি মাদ্রাসা শিক্ষা। বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডও রয়েছে। এ যে দুটি পদ্ধতি, তা কি পরস্পরবিরোধী নয়? এ নিয়ে অনেক কথাই বলা যেতে পারে। শিক্ষা বিষয়ে আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা একটু পড়া যাক-
ক. রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।
এখানে আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর বলতে আমরা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রাইমারি শিক্ষাব্যবস্থাকে বুঝতে পারি। সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা হবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, অবৈতনিক, বাধ্যতামূলক এবং দেশের সকল শিক্ষার্থীর জন্য একই পদ্ধতির। কিন্তু আমরা প্রাথমিক পর্যায়েই দেখছি- প্রাইমারি স্কুলের পাশাপাশি কওমী মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশে চালু আছে। সেই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন ধারার অপরিকল্পিত শিক্ষা, শিক্ষাক্রম ও দর্শন পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়হীনতা প্রকট রূপ ধারণ করছে কোথাও কোথাও।
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার যে ধারাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেটা হচ্ছে আলিয়া মাদ্রাসার ধারা। সরকার যখন মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলে, তা মূলত আলিয়া মাদ্রাসার ধারাকেই বুঝিয়ে থাকে। হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা সরকারের নজরদারির বাইরে এবং তারা কোনো প্রকার পৃষ্ঠপোষকতা চায়ও না।
বেশ শঙ্কার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের একটি রক্ষণশীল আধুনিক মুসলমানরা নিজেদের জন্য শহরগুলোতে গড়ে তুলেছেন এক ধরনের মাদ্রাসা ব্যবস্থা। যেগুলো ‘ক্যাডেট মাদ্রাসা’ ও নানা নামে পরিচিত। এসব প্রতিষ্ঠানে কখনও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় আধুনিক পাঠদান করা হয়। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ আধুনিক। এখানে সহশিক্ষা চালু আছে এবং মেয়েদের আলাদা ঘরে শিক্ষা দেওয়া হয় না। টিভি-কম্পিউটার-নাটক-নৃত্য-স্পোর্টস-ছবি আঁকা এগুলোর কোনোটাই এখানে ধর্মবিরোধী নয়। খালি একটি বিষয়ই তারা লক্ষ রাখেন, সেটা হচ্ছে ‘ইসলামের পুনরুজ্জীবন’ এবং সমাজে, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে আদর্শগতভাবে ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা। ইসলাম তাদের কাছে একটি মৌলবাদী বিশ্বাস। সে দিকে থেকে এই ধারাটিকে ‘আধুনিক রাজনৈতিক ইসলাম’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এবং সেই সঙ্গে ক্রমশ মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী মানসিকতাও গড়ে তোলা হয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে যেসব জঙ্গি কার্যক্রম সাধিত হয়েছে- এসব ঘটনার হোতারা কিন্তু এ আধুনিক ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত।
সবচেয়ে বেদনার বিষয় হচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা যেমন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র সংবিধানের খণ্ডিত রূপও তারা স্বীকার করে না। বিজয়, স্বাধীনতা, শহীদ দিবসে দল বেঁধে ফুল দেওয়া, প্রভাতফেরি, কুচকাওয়াজ ও মাঠে যাওয়া, জাতীয় সংগীত গাওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চেতনামূলক কর্মসূচি আয়োজনকে তারা ইসলামবিরোধী মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের ধারণা একমুখী, অনেকটা এ অঞ্চলে ইসলাম বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভাষা ও স্বাধীনতা সম্পর্কে তাদের ধারণা খণ্ডিত। তারা সুযোগ পেলেই তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা দখলের কথা বলতেও কসুর করে না। আরো শঙ্কার কথা হচ্ছে- এ ভূতের আছর এখন প্রাথমিক শিক্ষাস্তরেও পড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি সাপ্লাইকৃত সরকারি বইয়ে যে ভুল দেখা গেছে- তা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় কথা হছে প্রতিদিন। নতুন পাঠ্যপুস্তকে ভুলের জন্য শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্ট সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের কেউ দায়িত্ব নিতে চাইছে না। তারা একে অন্যের উপর দোষ চাপাচ্ছেন।
ফলে পাঠ্যবইয়ের ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি কমিটি করলেও কারা দায়ী, তা বই বিতরণের পর আজ পর্যন্ত চিহ্নিত হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবির প্রাথমিক উইংয়ের ২৪টি পদের ২০টিতেই নিজেদের ‘অযোগ্য’ কর্মকর্তাদের বসিয়ে রাখায় প্রাথমিকের বইয়ে ভুল থেকে গেছে। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছেন, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেরিতে পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার তা যাচাই-বাছাই না করেই ছাপাখানায় পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
এদিকে, প্রাথমিকের বইয়ে ভুল নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্বিগ্ন ও বিব্রত হয়েছে। তা জানিয়ে এ ভুলের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে তারা।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবকে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘২০১৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে বেশ কিছু ভুল সম্পর্কে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্বিগ্ন ও বিব্রত। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এর দায় এড়াতে পারেন না।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীরবতার সমালোচনা করে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এবার প্রাথমিকের বইয়ে বেশি ভুল থাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কোনো তৎপরতাই দেখাচ্ছে না, অথচ এনসিটিবি তাদের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান।’
এভাবেই চলছে পরস্পরকে দোষাদোষী। কিন্তু এ প্রজন্ম কি তা চাইছে? না চাইছে না। দেশবাসী উন্নয়ন চাইছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন উন্নয়নের কথা। সম্প্রতি একটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের জেলা-উপজেলায় উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘আজকে আমরা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদবিরোধী যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি, এক্ষেত্রেও আমি মনে করি প্রত্যেকের একটা সামাজিক চেতনা গড়ে তোলা উচিত, সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত। এজন্য জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য সব শ্রেণি পেশার মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন- ‘দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ, সকলের সহযোগিতা আমি কামনা করি। সহযোগিতা চাই এ জন্য যে, দেশকে আমরা যে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি এ গতি যেন থেমে না যায়। এ উন্নয়নের গতিধারা সবসময় যেন অব্যাহত থাকে।’
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন- ‘বাংলাদেশকে আজকে আর কেউ দরিদ্রের দেশ বা দুযোগ-দুর্বিপাকের দেশ বলে অবহেলা করতে পারে না। বরং আমাদের উন্নয়ন আজকে তাদের কাছে দৃশ্যমান।’ এসময় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এবার এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) গ্রহণ করা হয়েছে।
‘উন্নয়ন যেন টেকসই হয় এবং জনগণ যেন সুফল পায় সে বিষয়টি মাথায় রেখেই নিয়মিত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করে যাওয়া হচ্ছে।’ যোগ করেছেন তিনি। উন্নয়ন মেলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মেলার ফলে জনগণ জানতে পারবে তাদের অধিকারটা কী এবং যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে তারা অবহিত হতে পারবে। আমরা মুখে বলে যাচ্ছি এসডিজি। কিন্তু এটা কোন কোন খাতে সে বিষয়টা সম্পর্কেও মানুষ জানতে পারবে।’
শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রত্যেক জেলায় কিছু নিজস্ব ইতিহাস, ঐহিত্য এবং পর্যটনের বিষয় রয়েছে। এসব বিষয় তুলে ধরা এবং যেসব এলাকায় যে যে পণ্য উৎপাদিত হয় সেসব পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলবো। আমরা বাঙালিরা কখনো ভিক্ষুক জাতি হবো না।’
এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। তাই জাতির প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানিয়ে বড় করে তুলতে হবে। যারা আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে- তাদের পড়াশোনা করতে হবে। রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের জন্য কিছু পূর্বপ্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আর তা হচ্ছে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা। জানা এবং বোঝা বিশ্বরাজনীতির পরিবেশ, পরিস্থিতি। গ্রন্থাদি পাঠ। বিজ্ঞ রাজনীতিকদের জীবন র্শন ঘনিষ্ঠভাবে অবলোকন করা। এ দেখার মাঝে লুকিয়ে থাকে জীবনের জাগরণ। যে জাগরণ আরো সহস্র জীবনকে জাগায়। ডাক দেওয়ার সাহস জোগায়। মার্কস, লেনিন কিংবা মাও সে তুংয়ের আদর্শ মানা না মানা পরের কথা। আগে জানতে হবে- তারা কী বলেছিলেন। কী ছিল তাদের মুখ্য চেতনা। সমাজ বদলে শত বছর আগে কী ভেবেছিলেন সেই সময়ের আলোচিত রাজনীতিকরা। কী দর্শন রেখে গেছেন তারা।
আমাদের এখনো অনেক পথ বাকি। আজ যারা বাংলাদেশকে ডিজিটাল করে গড়ে তোলার কথা বলছেন, তাদের আগে এনালগ হাতগুলো মজবুত করতে এগিয়ে আসতে হবে। যে হাতগুলো এ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে এ বাংলাদেশ। সেফ এন্ড সিকিউরড ইনভেস্টমেন্ট জোন গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে। কারণ সামাজিক নিরাপত্তা না পেলে কোনো প্রজন্মই শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশে এখনো অন্যতম সমস্যা নিরক্ষরতা। শিশুশ্রম এবং শিশুমৃত্যুর হার, নারীর বঞ্চনা, পুঁজিপতিদের দাপট এসব বিষয়গুলো তো আছেই। সমাজ বদল করতে হলে এর কাঠামো ঠিক করতে হবে আগে। মানুষকে শিক্ষিত সচেতন করার পাশাপাশি, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মনে রাখতে হবে এনালগ হাতগুলোই ডিজিটাল আলোর প্রধান রশ্মি। আর যদি ভুল শিক্ষা কিংবা আদিম শিক্ষার বীজ রোপণ করা হয়- তাহলে এর ফসল কী উঠতে পারে তা ভাবতে হবে সবাইকে।
---------------------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক খোলাকাগজ ॥ ঢাকা ॥ ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ সোমবার
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



