somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফকির ইলিয়াস
আলোর আয়না এই ব্লগের সকল মৌলিক লেখার স্বত্ত্ব লেখকের।এখান থেকে কোনো লেখা লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা, অনুলিপি করা গ্রহনযোগ্য নয়।লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা করতে চাইলে লেখকের সম্মতি নিতে হবে। লেখকের ইমেল - [email protected]

মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিসংগ্রাম ও আগামী

২১ শে জানুয়ারি, ২০১৭ সকাল ৮:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিসংগ্রাম ও আগামী
ফকির ইলিয়াস
==============================================
দেশে আবার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এর আগেও অনেকবার হয়েছে। এতবার কেন হচ্ছে? এর কোনো জবাব নাই। জবাব নাই এ জন্য, আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করি না। জবাব নাই এ জন্য, আমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করি। জবাব নেই এ জন্য, আমরা জানি না আমাদের প্রকৃত গন্তব্য কোথায়?
আমি মনে করি আমাদের মুক্তিসংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। মুক্তির সংগ্রাম মূলত শেষ হয় না। যারা এ সংগ্রাম করেন- তারা আসলে একটি পর্ব শেষ করেন। বাকি পর্বটি অন্য কাউকে শেষ করতে হয়। অন্য কাউকে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। আমাদের অনেকেই তা পারছি না। আর পারছি না বলেই অপশক্তি সেই স্থান দখল করে নিচ্ছে। কীভাবে নিচ্ছে- তার নমুনা আমরা এখন প্রায়ই দেখছি।
একটি সংবাদ আমাদের সম্প্রতি চমকে দিয়েছে। ২০১৬-এর বিজয় দিবসে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে আজীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীর হাত থেকে সম্মাননা নিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ। ১৭ ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাঈদীপুত্র মাসুদ।
গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর সকালে পিরোজপুরের জিয়ানগরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন মাসুদ সাঈদী। এরপর সকাল ৮টায় একটি বিজয় শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে তার নেতৃত্বে উপজেলা পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আওয়ামী লীগ, প্রেস ক্লাব, মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। শোভাযাত্রা শেষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ ও প্যারেড প্রদর্শন হয়। এরপর দুপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের ছবি নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সাঈদীপুত্র মাসুদ। ১৬ ডিসেম্বর দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জিয়ানগর উপজেলা কমান্ড কাউন্সিলের সব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। পুরস্কার নিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান উপজেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব বেলায়েত হোসেন, বর্তমান উপজেলা ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বপন কুমার রায়, সাবেক কমান্ডার মাহবুবুল আলম হাওলাদার (আমার আব্বার মামলার বাদী ও প্রথম সাক্ষী), মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার ফকির। উপস্থিত আছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন বাচ্চু, ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম মিজানুল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট এম মতিউর রহমান, সেক্রেটারি মৃধা মো. মনিরুজ্জামানসহ মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ।’
১৭ ডিসেম্বর অন্য আরেকটি পোস্টে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাঈদীর পুত্র মাসুদ লিখেছেন, ‘মহান বিজয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠান। স্মৃতিচারণা করছেন যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জিয়ানগর উপজেলার সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আব্দুল লতিফ হাওলাদার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জিয়ানগর উপজেলার বর্তমান ডেপুটি কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবু স্বপন কুমার রায়, যুদ্ধকালীন পাড়েরহাট ক্যাম্প কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোকাররম হোসেন কবির।’
এই হলো আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা। এ বাস্তবতাকে কেমন দেখছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় র‌্যালিতে সাঈদীপুত্রের অংশগ্রহণের ছবি নিজের ফেসবুক পেজে তুলে দিয়ে শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ লিখেছেন, ‘বিজয়ের ৪৬তম বছরের প্রথম সকাল হতবাক করেছে। রাজাকারপুত্র এবং মুক্তিযোদ্ধারা একসঙ্গে বিজয় দিবস উদযাপন করছে! আর আমরা দেখছি! কী সুন্দর সকাল হওয়ার কথা ছিল আজ, তাই না!’
শাওনের পোস্টে মন্তব্যের ঘরে সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল লিখেছেন- ‘শহীদ বীর আলতাফ মাহমুদের কন্যা কাঁদছে, কেন? সবই তো আগের মতোই আছে!’ সেখানে একজন তাকে প্রশ্ন করেন, “আগের মতোই আছে? পূর্ব পাকিস্তানের মতন? তাহলে ‘বাংলাদেশ’ নামটা হয়েছিল কোন দুঃখে?” উত্তরে বুলবুল লিখেছেন, ‘আমি এখন যুদ্ধরত, জিতলে কথা হবে, অনেক।’
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল যে মুক্তিসংগ্রামের কথা বলেছেন- সেই যুদ্ধ চলছে। অবশ্যই চলছে। এ যুদ্ধ না চললে একটি জাতি তার অতীত ভুলে যায়।
এর পরের সংবাদ থেকে আমরা জানছি- জিয়ানগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীর কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মাননা নেওয়ায় ক্ষমা চেয়েছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সমীর কুমার দাস বাচ্চু। পিরোজপুর প্রেসক্লাবে জিয়ানগর উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করা সংবাদ সম্মেলনে তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চান। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বলেন, ‘মাসুদ সাঈদী মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মাননা দিয়েছেন তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের গায়ে কালিমা লেপন করা হয়েছে।’ ক্ষোভের সঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধাও কি ছিল না বিষয়টিতে প্রতিবাদ করার। যেসব মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আমরা এখনও জানি না। তবে এটুকু জানি, আমাদের চারপাশে বৈভব দেখিয়ে এমন অনেকেই এখন দখলের ত্রাস সৃষ্টি করছে। আমরা দেখছি- প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, আবেদনকৃত ও তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীক্ষণ হচ্ছে। তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে উপজেলা, জেলা-মহানগর যাচাই-বাছাই কমিটি করেছে সরকার। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ১২ জানুয়ারি এসব কমিটি গঠনের আদেশ জারি করে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ে এর আগে গঠিত সব কমিটি বাতিল করেছে।
আদেশে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের আওতাধীন কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা প্রতিনিধি এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি (সংসদ সদস্য ছাড়া) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত হবেন। বলা হয়েছে ‘এই কমিটিকে ইতোপূর্বে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কর্তৃক প্রেরিত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তথ্যাবলি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই নির্দেশিকা ২০১৬ অনুরসণ করে যাচাই-বাছাই করতে হবে।’
মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও একেক সময় একেক রকম তথ্য পাওয়া পাওয়া গেছে। এরশাদের আমল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ দফায় তালিকা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে সনদ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন প্রায় ২৬ হাজার। এর মধ্যে সাময়িক সনদ পেতে ১৭ হাজার এবং যুদ্ধাহত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আরো ৮ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় এ সংখ্যা ছিল প্রথম দফায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জন। পরে তা ২ লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনে উন্নীত হয়। এর আগে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভোটার তালিকায় ৮৬ হাজার এবং ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের খসড়া তালিকায় ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নাম।
এরশাদ সরকারের সময় ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতীয় কমিটি কর্তৃক প্রণীত তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মুক্তিবার্তা (লাল মলাটে) পত্রিকায় প্রকাশিত নামের তালিকাকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। লাল মুক্তিবার্তায় ১ লাখ ৫৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় মুক্তিবার্তার লাল মলাটের বাইরে যারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেয়েছেন তাদের অনেকে এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যমান গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় প্রায় ৪০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ঢুকে পড়েছে। ডিজিটাল ডাটাবেজ তালিকায় যাদের বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাই হোক, মুক্তিযোদ্ধারা আসলে কেমন আছেন? বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা দিন কাটাচ্ছেন অনাহারে অর্ধাহারে। এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত। সম্পদ ও কর্মহীন অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার তাদের পরিবারের সদস্যদের খাদ্যের জোগান দিতে এখনো ভিক্ষাবৃত্তি, দিনমজুরি, রিকশা চালানোসহ অনেক কঠোর পরিশ্রমের পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবনযাপন করছেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধ্বংস করে, মনগড়া কল্পিত ও মিথ্যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করে আদর্শহীন, দুর্নীতিবাজ একটি শ্রেণি ব্যক্তি ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত, নষ্ট ও ধ্বংস হয়েছে এদের হাতেই।
অন্যদিকে রাজাকার আলবদর গোষ্ঠীর নেতারা টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে কতিপয় মুক্তিযোদ্ধাকেও। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে একটি বিশেষ অংশগ্রহণ ছিল নারী সমাজের। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের ৩০ লাখ মানুষের গণহত্যার শিকার হয়, যার অন্তত ২০ শতাংশ নারী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সরকারি নথিপত্রে এর কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। বিভিন্ন ভাষ্যমতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দুই লাখ মা-বোন নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু মাঠভিত্তিক গবেষণা চালাতে গিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের গবেষণাকর্মীদের মনে নিশ্চিত ধারণা জন্মেছে মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা যা এতদিন বলা হয়ে আসছে, আসলে তা এর চেয়েও অনেক বেশি।
তবে এতদিন পর তথ্য-প্রমাণ দিয়ে হয়তো এসব প্রমাণ করার সুযোগ কম। তাছাড়া নির্যাতিতরা সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার কারণেই চান না এতদিন পর এসব নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি হোক। এসব কারণেই অনেক নির্যাতিত নারী তাদের ওপর নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী গবেষণাকর্মীদের কাছে মুখে মুখে বললেও তা টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করতে বা লিপিবদ্ধ করতে দিতে চাননি।
আজ যে সাঈদীপুত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দিচ্ছেন, একাত্তরে কেমন ছিল সেই সাঈদীর ভূমিকা? আমাদের মনে আছে প্রসিকিউশন তাদের স্টেটমেন্টে বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াত নেতা সাঈদী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাড়েরহাট বন্দরের বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিয়মিত যৌননির্যাতন করতেন। বিপদ সাহার বাড়িতেই আটকে রেখে অন্যান্য রাজাকারসহ ভানু সাহাকে নিয়মিত ধর্ষণ করতেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। একসময় ভানু সাহা দেশত্যাগে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।
স্টেটমেন্টে আরো বলা হয়, সাঈদী একাত্তরে অসংখ্য হিন্দুকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেছিলেন, নামাজ পড়তেও বাধ্য করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করে এবং কেউ কেউ ভারতে চলে যান।
এই হলো আমাদের মুক্তিসংগ্রামের একটি খণ্ডচিত্র। কী মূল্য দিয়ে কেনা আমাদের স্বাধীনতা! অতীতে যে তালিকাগুলো হয়েছে সেগুলো কি স্বচ্ছ ছিল। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অনেক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকলেও তাতে ঠাঁই হয়নি কুড়িগ্রামের বীর প্রতীক তারামন বিবির নাম। ২০০৫ সালের ২১ মে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ৩৭৫৫ নম্বর থেকে ৩৮৭৪ নম্বর পৃষ্ঠায় কুড়িগ্রাম জেলার ৩ হাজার ৬১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ তালিকায় বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত তারামন বিবির নাম নেই, তা ধরা পড়ে জেলা পোর্টাল তৈরি করতে গিয়ে। এই হলো আমাদের তালিকার অবস্থা!
মুক্তিযোদ্ধারা চিরদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু তাদের কর্ম, তাদের স্বপ্ন, তাদের গৌরবগাথা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। জাগ্রত থাকবে তাদের চেতনা। থাকতেই হবে। না থাকলে বাংলাদেশ থাকবে না। বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব থাকবে না। সেই প্রত্যয় এবং ঐতিহ্যের শক্তিই প্রজন্ম ধরে রাখতে চায়।
তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে হবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। আমরা দেখছি আজ রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বুলি পাল্টে এরাই হতে চাইছে মুক্তির নিয়ামক। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সম্মান চান। যে দেশে কোটি কোটি টাকা লুটেরা শ্রেণি প্রতিদিন লুটপাট করে সেই দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধা যথার্থ সম্মানী ভাতা পাবেন না, তা মেনে নেওয়া যায় না। তাই হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়, রাষ্ট্রীয় সম্মান, রাষ্ট্রের মানুষের সম্মান বাড়ানোর জন্যই জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক পুনর্বাসন খুবই দরকারি। দরকার পরলোকগত মুক্তিযোদ্ধদের পোষ্য, সন্তান, পরিবারকেও সার্বিক সহযোগিতা করা। কারণ একাত্তরের বীর সেনানীরা বারবার জন্ম নেবেন না।
আগেই বলেছি, মুক্তিসংগ্রাম একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশকে সেই শক্তি ও সাহস নিয়েই এগোতে হবে। এ প্রজন্মকে করতে হবে সেই মন্ত্রে দীক্ষিত।
---------------------------------------------
দৈনিক খোলাকাগজ ॥ ঢাকা ॥ ২০ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জানুয়ারি, ২০১৭ সকাল ৮:৪৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×