somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নীতির নিঃশব্দতা

২৮ শে অক্টোবর, ২০১৫ সকাল ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

-মা, আমি একটু বাইরে যাই?
-কেন রে, মা? এতো রাতে?
-একটু দরকার ছিলো।
-তাড়াতাড়ি এসে পড়িস।
-আচ্ছা।
নীতি খুব সুক্ষ্ম সাবধানতার সাথে চোখটা মুছে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। সময় তখন রাত আটটা। শহরটা আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ছে যেন একটু আগেই সে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। রাস্তার ডিভাইডারের দুপাশে জ্বলতে থাকা বিপরীতমুখী সোডিয়াম বাতিগুলোকে আজ বিবাদপূর্ণ এক এক জোড়া মানুষ মনে হচ্ছে! এতো সুন্দর সোনালী আভায় তার আজ মন ভিজছেন না।
কিন্তু অন্যান্য সময় হলে নীতি এই সোডিয়াম বাতিগুলোর বাসন্তী রঙের আবছা আলোয় স্নান করতো নগ্ন মস্তিষ্কে, কোনো কিছু না ভেবেই দু হাতকে ডানার মত করে ঘুমিয়ে পড়া শহরটার ফাঁকা বুক জুড়ে উড়ে বেড়ানোর চেষ্টায় নিমগ্ন থাকতো!
আজ তাহলে কি হয়েছে?
নীতির বাবা নেই। না নাহ্, মৃত্যু হয়নি তাঁর, বেঁচে আছেন এখনো। তবে নিজে বাঁচতে গিয়ে তিনি দুজনকে হত্যা করেছেন অনেক আগেই, নীতি আর ওর মাকে! মনটাকে জ্যান্ত নিজ হাতে কবর দিয়েছেন তিনি সেদিনই, যেদিন তিনি তাঁর নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া একটি মেয়ে এবং তাঁর স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যান অন্য কোনো সুখের সন্ধানে। এরপর থেকে নীতির মা অনেক সংগ্রাম করেছেন এই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। নীতিকে ছেড়ে দিয়েছেন স্বাধীনভাবে স্বাধীনতাকে পরখ করে দেখার জন্য , ভুল করার জন্য, শুধরে নেবার জন্য। নীতি সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছে। প্রত্যেক মেয়ের জীবনেরই প্রথম হিরো হিসেবে থাকে তার বাবা। নীতির জীবনের নীতিমালার তালিকার প্রথমটিই যখন ভুল প্রমাণিত হলো, তখন সে এই বিপরীত লিঙ্গকে সবসময় এড়িয়ে চলতেই চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই ক্ষিতির নীতিমালা বড়ই রহস্যময়ী!
তার সেই মৃত মনটিকে জীবিত করতে কেউ একজন নিরবে তার মন ছুঁয়ে দিয়েছিলো।
ভালোবাসার জালটা এমনই একটা জাল, যেখানে প্যাঁচানোর আগে মনে হয়, যে মানুষ জালটা পেতেছে, সে আটকে গেছে, তাকে ছুটাতে হবে। কিন্তু ছুটাতে যখন যাওয়া হয়, তখন নিজেই সেই জালে পেঁচিয়ে যায়! ছুটতে পারেও না, চায়ও না!!
নিঃশব্দ আর নীতির মাঝে এই জালটার বীজ বাসা বেঁধেছিল। পরে তারাই সেই জালে নিজেদের ছোট্ট একটি নীড় গড়ে নেয়। তারা কখনোই কেউ কারো কাছে প্রতিজ্ঞা করেনি যে তারা কেউ কখনো কাউকে ছেড়ে যাবে না। কারণ দুজনই জানতো, কেউ কাউকে ছাড়ার নয়, এ কারণে বন্ধনটা হয়তো আরো শক্ত হয়ে গেছে!
কিন্তু সেদিন নিঃশব্দের হঠাৎ কি যেন হলো! নীতিকে একটি নদীর ধারে ডাকলো, যেখানে প্রথম নিঃশব্দ তার নীতিকে তার জীবনের বৈঠা হিসেবে চেয়েছিলো, আর নীতিও লক্ষী মেয়ের মত দায়িত্বটি মনে বেঁধে নিয়েছিল! নিঃশব্দ সেখানেই তার নীতির গায়ে উষ্ণতার নীল চাদর জড়িয়ে দিয়েছিলো প্রথমবারের মত! প্রথমবারের মত সেই এলোমেলো চুলের বালকটির উষ্ণ নরম ঠোঁট সেই নীল চাদর গায়ে জড়ানো মেয়েটির কপাল স্পর্শ করেছিলো।
সেদিন আবার সেই একই জায়গায় ডেকে নিয়ে নিঃশব্দ তার নীতির হাতে ঠিক ১৪টি কাঁচের চুড়ি পড়িয়ে দিয়েছিলো নীল রঙের আর হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলেছিলো, “বাসায় গিয়ে খুলো। খানিকটা সময়টা আমাকে দাও।”
“ঠিক আছে, বাবুটা,” নীতি জবাব দিলো।
সেদিন তারা অনেকক্ষণ বসে গল্প করলো, রাত আটটা নাগাদ পর্যন্ত। কিন্তু নিঃশব্দ সেদিন আসলেই কেমন যেন নিঃশব্দতা প্রকাশ করছিল, যদিও বুঝতে দিচ্ছিলো না নীতিকে। তবুও নীতি খেয়াল করেছে, সে তো তারই আয়না! সে ভেবেছিল হয়তো ছেলেটি আজকে ক্লান্ত, তাই এমন চুপচাপ হয়ে আছে। তাই আর কিছু বলেনি। সেই রাতের আটটা সময়টার কথা নীতি কক্ষণো ভুলবে না!
ছেলেটা হঠাৎ করেই কিছু না বলেই নীতিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো! খুব বেশি শক্ত করে!! মনে হচ্ছিলো যেন, ‘এই বুঝি ফসকে গেলো!’ ! আর হুঁ হুঁ করে কেমন নিথরভাবে আর্তনাদ করে নোনতা পানিতে নীতির পিঠ ভিজিয়ে দিলো!! নীতি তখনও কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। কি হচ্ছে এসব? আপাতত প্রশ্নটিকে অবজ্ঞা করে সেও নিঃশব্দকে খুব নিজের করে জড়িয়ে নেয়। জিজ্ঞেস করলো সে, “কি হয়েছে তোমার হঠাৎ? কাঁদছো কেন?” নিঃশব্দ নিঃশব্দই থাকে, কোনো জবাব দেয় না। খানিকক্ষণ পর ছেড়ে দেয় নীতিকে, হাতটিও ছেড়ে দেয়! এরপর হেঁটে চলে যায় কিচ্ছুটি না বলে …
বাসায় এসে নীতি চিঠিটি খোলে খুব ভয়ে ভয়ে। চিঠির লেখাগুলো এমন ঃ
“প্রিয় নীতি,
চিঠিটি যখন লিখছি তখন চোখের পর্দায় রাস্তায় জ্বলতে থাকা সোডিয়াম বাতির আলো এসে পড়ছে। আমার এই পিচ্চি খুকিটার তো সোডিয়াম বাতির আলো খুব পছন্দের, তাই না? তাই আজ সোডিয়াম বাতির আলোয় সিক্ত হওয়া একটি কাগজে তোমাকে লিখছি ঠিক ডিভাইডারের মাঝখানটিতে বসে! তুমি যদি এখন সামনে থাকতে, তাহলে হয়তো বলতে, “এই পুচকে পাগল,তুমি ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে কি করো? জানো না, ওটা আমার কাছে দুই রাস্তার মিলনপথের বাঁধা দানকারী ভিলেন মনে হয়? নেমে আসো! ”
হয়তো, উপরের কয়েকটি লাইন পড়ে মুচকি করে হেসে দিচ্ছো। ইশশ্!! যদি আর একটাবার সেই দু তিলের ঠোঁটের হাসিটা দেখতে পারতাম!
আজ তোমার নিঃশব্দের সাথে তোমার জীবনের অতিক্রান্ত হওয়া চৌদ্দতম মাসের শেষ দিন। তাই তোমায় চৌদ্দটি চুড়ি দেওয়া। চুড়িগুলো তোমার হাতে খুব মানাবে।
জানো নীতি, তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন মনে হয়েছিল তুমি খুব অহংকারী হয়তো, তাই কারো সাথে অতোটা মেশো না, কিন্তু পরে ধারণাটি পুরোপুরি পাল্টে গেলো যেদিন তুমি প্রথম আমার সাথে কথা বলেছিলে। মনে হয়েছিল, তুমিই সেই মেয়েটি যে কিনা আমার এলোমেলো চুল আঁচড়ে দিবে, আমার চশমার কাঁচ মুছে দিবে, দুপুরে খেতে দেরি করলে অভিমান করে থাকবে আর মিষ্টি করে বকে দিবে! তাই তোমাকে আমার জীবনের হাল ধরতে তোমার হাত ভিক্ষা করেছিলাম আর তুমিও আমাকে নিরাশ করোনি। এই মেয়ে, তুমি সেদিন আমাকে নিষেধ করলে না কেন? কেন বললে না যে, ‘আর কক্ষণো আমার সামনে আসবে না’ ? তাহলে হয়তো অনেক কিছুর শুরুও হতো না আর আজ সেই অনেক কিছুরই শেষও হতো না!!
হুমম্, তুমি ঠিকই পড়ছো! তবে “শেষ” বলে কি আসলেই কিছু আছে, মণি?
আমার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে, বেশিদিন আর সার্ভাইভ করছি না হয়তো। তাই বাবা মায়ের কাছে আজ রাত দশটার ফ্লাইটেই অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছি।
জানো, আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে, সোনা! খুব ইচ্ছে করে, তোমার ভালোবাসায় সিক্ত হতে , ইচ্ছে করে সোডিয়াম বাতির আলোয় একসাথে স্নান করতে , ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে তোমার বকা শুনতে , একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতে খুব করে ইচ্ছে করে, নদীর ধারে তোমার গায়ে নীল চাদর জড়িয়ে দিয়ে চোখজোড়াকে শান্ত করতে ইচ্ছে করে ….
কিন্তু আমি জানি, আমি আর পারবো না। কখনোই পারবো না।
আমি জানি, তুমি আমাকে কতোটা ভালোবাসো, তাই কষ্ট পাবে ভেবেই কিছু জানাইনি তোমাকে। আমাকে ক্ষমা করে দিও, প্লিজ। আর, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, নীতি … অন্নেক ভালোবাসি।
ভালো থেকো সবসময়।
ইতি –
তোমার পুঁচকে পাগল ”
এরপর নীতি একটাবার ফোনও দিয়ে দেখেনি নিঃশব্দকে। নিঃশব্দের নিঃশব্দতা তার মনটাকে ঘিরে ফেলেছিলো চতুর্দিক থেকে।
একটু আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে একটা ফোন এসেছিলো । নিঃশব্দের মামা ফোন করেছে। একটু আগেই ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন!!
নীতির মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি অনুভূত হচ্ছিল। হৃদয়টা আগেই ভেঙে গিয়েছিল। তবুও আজ আবারো ভাঙলো, কিন্তু নিঃশব্দে!! কোনো আওয়াজ নেই। শব্দটির মাত্রা বোধ করি পৃথিবীর এক কোণে থাকা এক জোড়া কবুতর ছাড়া অন্য কারো শ্রাব্যতার সীমার নিচে ছিলো।
নীতির তখন মনে হচ্ছিলো, নিঃশব্দ সেই সোডিয়াম বাতির নিচেই বসে আছে এখনো! ডেথ সার্টিফিকেট পেয়েই সে তার নীতির কাছে ফিরে এসেছে!!
নীতি এখনো সেই ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে আছে আর ভাবছে,
“ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। শেষ বলতে কিছু নেই আসলেই। সময়টাই যা বেঈমানী করে মাঝেমাঝে! "


•৯ডিসেম্বর,২০১৩
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০১৫ সকাল ১১:৫৫
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার যতসব অপরাধ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



আজ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বলতে গেলে সব মিডিয়াতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। উহা দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেন টু কক্সবাজার: টিকিট পেলাম না, পেলাম বিকল্প পথের সন্ধান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। তবে এবার লক্ষ্য ছিল একটু আলাদা—বাসে নয়, বিমানে নয়; ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে সমুদ্রের শহরের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই সহজ পরিকল্পনার প্রথম বাধাই হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেয়ার বাজারকে গতিশীল করতে স্টক ব্রোকারদের নিয়ে বৈঠকে বসছে ডিএসই আজ ১৪-০৯-২০২৬

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মন্দার কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকা

একটি দেশের অর্থনীতিকে যদি একটি জীবন্ত দেহ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তার শেয়ারবাজার অনেকটা হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের মতো। অর্থনীতির কোথায় প্রাণশক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×