পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করলে প্রয়োজনীয় পরিমাণে ফসল উত্পাদন হবে। একই ফসলের ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত থাকবে না। কৃষকরাও ন্যায্য দাম পাবেন। আমার দেশ-কে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে এসব কথা বলেন কৃষিবিদ এমএ বাতেন। তিনি বলেন, সারাদেশে একযোগে আলু ও ধান চাষ করেছেন চাষীরা। ফসল বেশি উত্পাদিত হওয়ায় বাজারে দাম কমে গেছে। অনেক স্থানে আলু নষ্ট হয়ে গেছে। দাম না পেয়ে কৃষক নিজেই রাস্তায় আলু ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু সুষম উত্পাদন হলে এসব পণ্য নষ্ট হতো না, কৃষকও ন্যায্য দাম পেতেন। সঠিক কৃষিনীতি না থাকায় আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন লিয়াকত হোসেন খোকন
কৃষিবিদ এমএ বাতেন ২০০৯ সালে ঢাকার শেরে বাংলানগর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশনের প্রিন্সিপাল পদ থেকে অবসর নিয়ে বর্তমানে ধান, সবজি ও মাছ চাষ করে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামে থাকেন বেশিরভাগ সময়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতত্ত্বের ওপর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর যোগ দেন করিমগঞ্জের থানা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার হিসেবে। এরপর বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন পদে থেকে কৃষকদের সেবা করেছেন। তার সাক্ষাত্কারের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে হাওর এলাকার চাষীদের নানা ধরনের সমস্যার কথা।
এমএ বাতেন বলেন, কৃষকরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী চাষাবাদ করেন। যেখানে যে ফসল ভালো হয় না, সেখানে সেটাই চাষ করেন। এ কারণে আশানুরূপ ফলন হয় না। নিয়ম হচ্ছে, যে জমিতে যে ফসল ভালো উত্পন্ন হয়, সেখানে তো সেটাই চাষ করতে হয়। এ নিয়মনীতি না মানায় কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, কৃষকরা যখন দেখে আলুর দাম বেশি, তার পরের বছর সারাদেশ আলু চাষাবাস হয়। শেষতক দেখা যায়, আলু বিক্রি হয় পানির দরে। এ জন্য চাহিদা অনুযায়ী ফসল উত্পাদনে আগ্রহী করে তোলার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরেরই। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করেন, এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আমাদের দেশে সঠিক কৃষিনীতি না থাকার কারণে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। যে মাটি যে ফসল উত্পাদনে উপযুক্ত সেখানে সেটাই করতে হবে। এ কথাই কৃষককে বোঝাতে হবে। তিনি বলেন, ইংল্যান্ডে শতকরা ৭ থেকে ৮ ভাগ কৃষক। ওখানে বিভিন্ন পর্যায়ে সমিতি আছে। ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সমিতির লোকজন ফসল কিনে নিয়ে সরকারি গুদামে পাঠিয়ে দেয়। কোনো কৃষককে কালবিলম্ব করতে হয় না ফসল বিক্রি নিয়ে। ওখানে প্রত্যেককে দেয়া হয় ন্যায্যমূল্য। ইংল্যান্ডে টার্গেট অনুযায়ী উত্পন্ন হয় সব ধরনের ফসল। মেশিনারি ব্যবস্থাপনা থাকায় লাগানো থেকে শুরু করে উঠানো পর্যন্ত তারা মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। ওই দেশে ফসল ঘরে ওঠার প্রশ্নই ওঠে না। মাঠ থেকেই সমিতি তা নিয়ে যায় এবং টাকাটা সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করে দেয়। ইংল্যান্ডে সুন্দর কৃষিনীতির কারণে কোনো কৃষক বসে থাকে না। চাষাবাদ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো অভিযোগ নেই। ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না—এ অভিযোগ নেই সেখানে।
পরিকল্পিত চাষাবাদ করা প্রয়োজন মন্তব্য বলে তিনি বলেন, জমির মালিকদের প্লান করা উচিত কি কি গাছ লাগাবেন, কোন কোন সবজির চাষাবাস করবেন। তাহলে একবছর মরিচের দাম ২০০ টাকা, পরের বছর ৫০০ টাকা এমনটি আর হবে না। সবাই যদি এটা-ওটা চাষ করেন তাহলে মার্কেট নর্মাল থাকবে। অর্থাত্ হু হু করে সবজির দাম বাড়বে না।
হাওর অঞ্চলের বোরো চাষ সম্পর্কে কৃষিবিদ এমএ বাতেন জানান, বোরো ফসলের বিরাট একটা অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৪টি উঁচু এলাকায়। বাকি উপজেলাগুলো হাওরের মধ্যে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ আরও কয়েকটি জেলায় রয়েছে হাওর বিল। এসব জায়গায় প্রচুর বোরো ফসল হয়। কিন্তু ধান কাটার আগে হাওরের বাসিন্দারা বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। বান, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে হাওরের মানুষের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট ও দুর্দশা। হাওর এলাকায় দীর্ঘদিন চাকরি করার সুবাদে খুব কাছ থেকে তাদের দুঃখ-কষ্ট দেখার সুযোগ হয়েছে। হাওরের কৃষকরা ধানের দাম ঠিকভাবে পাবে কিনা, উত্পাদনের খরচ উঠবে কিনা—এ নিয়ে আজও তারা দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটান। উঁচু এলাকায় ধানের মণ ৬০০ টাকা থাকলে হাওরে মণপ্রতি ধানের দাম থাকে মাত্র ৩০০ টাকা। অথচ সরকার যদি কৃষকের উত্পাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দর নির্ধারণ করে দিত তাহলে কৃষকরা চিত্কার দিয়ে বলতেন না, ‘ধানের দাম পাচ্ছি না’। অন্তত তাদের উত্পাদন খরচের সঙ্গে কিছু লাভ তো দিতে হবে, না হলে কৃষক চাষাবাদ করবেইবা কেন! এ বছর ধান উত্পাদন করে অনেকেই পাননি ন্যায্য দাম, যে জন্য ওঠেনি তাদের উত্পাদন খরচ। কৃষি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফসল উত্পাদনকারীরা ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা উত্সাহ হারাচ্ছেন।
আবাদি জমি কমছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছর পর আমাদের আবাদি জমির সিংহভাগ চলে যাবে বাড়িঘর, শিল্প-কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনায়। কৃষি নীতিমালা না থাকায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এক সংসারের ৩ ছেলে আলাদা হয়ে পাশের জমি নষ্ট করে বাড়িঘর করছে। এভাবে ধানি জমিও আমরা হারাচ্ছি। তাই বাংলাদেশর আবাদি জমি রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কৃষিনীতি বাস্তবায়ন জরুরি। সরকারের পলিসি থাকতে হবে, যেমন—আবাদি জমি নষ্ট না করে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হবে। এ জন্য গ্রামাঞ্চলে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কৃষিবিদ এমএ বাতেন বলেন, কৃষিবিদরা অনেকেই ঢাকার বাইরে যেতে চান না। ঘুরেফিরে ঢাকার খামার বাড়িতে থাকেন, এটা ঠিক নয়। এই ধরেন, নিজ বাড়িতে এ সময় ৬টি পুকুরে মাছ চাষ করেছি। পুকুর পাড়ে লাগিয়েছি ৬০০ নারকেল গাছ। এছাড়া ক্ষেতে করছি ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ। মেহগিনি গাছও লাগিয়েছি শতাধিক। ২ কি ১ বছর পর বিক্রি করলে প্রতিটি গাছ থেকে আয় হবে ২০ হাজার টাকা করে। দুঃখ করে তিনি জানান, কৃষকরা লেখাপড়া জানেন না বলে এ সুযোগে তাদের জমি দখল করে নেয় ভূমিদস্যুরা। ভূমি অফিস কম্পিউটারাইজড করা হলে হয়তোবা একজনের জমি আরেকজন নিতে পারবে না।
কৃষি কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে কৃষিবিদ বাতেন বলেন, যেসব কর্মকর্তার পোস্টিং ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় তাদের মধ্যে অনেক কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় রাখেন। তারা এটা-ওটা ছুতা দেখিয়ে অফিস খোলার দিনও ঢাকায় থাকেন। শুনি, হঠাত্ হঠাত্ তারা কর্মস্থলে যান। তাহলে ওই কর্মকর্তা কীভাবে মাঠ পরিদর্শন করবেন। দেখা গেল পোস্টিং ঢাকার আশপাশে কোনো জেলায়, থাকেন ঢাকায়। আজকাল যে যানজট তাতে ঢাকা থেকে পার্শ্ববর্তী যে কোনো জেলায় পৌঁছতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। এ অবস্থায় ওই কৃষি কর্মকর্তা মাঠে গিয়ে কৃষকদের কখনইবা সময় দেবেন। আমার তো মনে হয়, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য মফস্বলে কর্মরত কর্মকর্তা ব্যক্তিটি তার নিজ এলাকায় যাতে থাকেন, এটা নিশ্চিত করা জরুরি প্রয়োজন। যেখানে যার চাকরি তিনি সেই স্থানে আছেন, কি নেই—এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হঠাত্ ঝটিকা অভিযান চালালে কৃষি কর্মকর্তারা নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকতে বাধ্য হবেন। তাহলেই দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন আরও দ্রুত ঘটবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



