দুর্ভেদ্য প্রাচীর কি কখনো নিজেই নিজেকে ক্ষয় করে, অথবা দেহ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে? প্রাচীরের বুকে যদি ফাটল দেখা দেয়, তবে অবশ্যই তা বাহ্যিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলাফল। মুসলিম জাতির জন্য প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে "এক দেহ"-এর তুলনা দিলেন আর জিহাদের ময়দানের তুলনায় আল্লাহর বাণী "(সীসা নির্মিত) মজবুত প্রাচীর"; এ "দেহ" আর এ "প্রাচীর"-এ ভাঙ্গন ধরাতে নিরন্তর তৎপর যে দূরাত্মার, তার নাম ইবলীশ অথবা শয়তান। শিখা থেকে সৃজিত বলে প্রতিপালকের আদেশে একদা মাটির মানবকে সিজদা করতে পারলো না যে অবাধ্য; তার সবটুকু মনোযোগ নিবদ্ধ জাগতিকতার আদি থেকে অন্তে একমাত্র আমাদের প্রতিই। নিজে জাহান্নামী বলে মানবের জাহান্নাম গমন নিশ্চিতকরণই তার একমাত্র সাধনা। সে সাধনায় হেন পন্থা নেই যা তার জানা নেই, মানব শরীরের হেন স্থান নেই যেখানে তার প্রবেশকৌশল জানা নেই। কি অসহায় তাহলে আমরা শয়তানের কৌশলে; এমন ভাবনা প্রতিপালক ও তাঁর দয়া সম্পর্কে অজ্ঞজনেরই হতে পারে, মুমিনের নয়। মানব জাতির প্রতি তাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ তা'আলার প্রেরিত নেয়ামতের পরিপূর্ণতা আনয়নকারী সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ধ্বংস হওয়ার অনিবার্য কারণসমূহ থেকেই সতর্ক করেননি; বরং ধ্বংস-আশঙ্কার যাবতীয় বর্জনীয় কার্যাদি সম্পর্কেও সতর্ক করে গিয়েছেন আমাদেরকে। আমরা কি তা জানতে পেরেছি??
পিতা-মাতা হতে হলে জন্ম দিতে হয়, অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে সেরূপ বন্ধনের আশ্রয় নিতে হয়, কিন্তু কোন ধরনের মাধ্যম ছাড়াও যে সম্পর্ক পাতা যায় হা হলো আপন ভাইয়ের সাথে সাথে অন্য যে কাউকেই 'ভাই-বোন' বানানোর সম্পর্ক। জীবনের এই দুর্গম পথে যার নিকট নির্ভর করা যায়, অন্তরের সব কথা খুলে বলা যায়, চাওয়া-পাওয়ার যাবতীয় লেনাদেনায় সবচেয়ে সহজ যে সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ব্যতীত সে পথের সাথী আর কোন কিছুতেই পাওয়া যায় না। মক্কার সুদীর্ঘ তেরটি বছরের নিদারুণ নির্যাতনেও মুমিনগণ ছিলেন পরস্পরের সহযোগী, কিন্তু সে সময়টা ছিল ধৈর্য্যের, সহ্যের আর নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদেরকে এমন উত্তম প্রশিক্ষণই না দিয়েছিলেন; মদীনায় হিজরতের পর যখন প্রয়োজন হলো পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা প্রদর্শনের, তখন তিনি তার প্রভুর নির্দেশে ঘোষণা করে দিলেন অমুক অমুকের ভাই, অমুক অমুকের ভাই, ব্যস- এতদিনের অজানা-অচেনা মানুষগুলো পৃথিবীতে ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেললেন। সম্পদ, সুযোগ আর সচ্চলতায় তো ছিলেনই; বরং ভাইয়ের স্ত্রী নেই অথচ এখন সামর্থও নেই যে (মাহ্র আদায় করে) বিয়ে করবে, তাই আপন দুই স্ত্রীর মধ্য থেকে ভাইয়ের পছন্দানুযায়ী একজনকে তালাক দিয়ে ভাইয়ের সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করার প্রস্তাবনার নজীর পৃথিবীতে মুসলমানরাই সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।
তাহলে এমন কি কারণে মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ الْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ((ফেৎনা হত্যার চেয়েও গুরুতর।)) [সূরা আল-বাকারাঃ ১৯১] হত্যার বৈধ কারণগুলোর এটি একটি আর অন্যটি হলো কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যা। এ দু'টো বৈধ হত্যাই ইসলামী রাষ্ট্র অথবা মুসলিম শাসকের আদেশ সাপেক্ষ। এর বাইরে যেখানেই যা কিছু ঘটছে, কোথাও হত দায়ী, কোথাও হন্তারক, কোথাও উভয়ে, কোথাও নিতান্তই ঠাট্টায় নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে। মানব সত্তায় যে দুর্বলতা বিদ্যমান তা বিভিন্ন নামে রয়েছে, রাগ, লোভ, কামনা, হিংসা ইত্যাদি। আর মানবতার চিরশত্রু শয়তান শুধুমাত্র এসব দমিত দগদগে আগুনে ঘি ঢালার কাজটি করে দেয়, তদুপরি সেই মুহুর্তে যদি হাতে থাকে কোন ধরনের অস্ত্র, তাহলে আড়াল শুনতে পেলে নিশ্চয় মানুষ শুনতে পেত ইবলীসের অট্টহাসি। কারণ, আল্লাহর একজন বান্দাকে সে খুনের অপরাধে জাহান্নামে গমনের উপযোগী করতে সক্ষম হয়েছে। আর তাই হত্যা তো নয়ই; বরং রাগান্বিত অবস্থা বা সাধারণ অবস্থায়ও যেন কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র প্রদর্শন না করে, মানবতার জন্য রহমত স্বরূপ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধ করে বলেনঃ ((যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দিকে কোন লোহা দিয়ে ইশারা করলো, তার উপর ফিরিশ্তারা লা'নত করে থাকে; যদিও সে তার সহোদর ভাইয়ের দিকে ইশারা করে।)) [মুসলিমঃ ১২৫(২৬১৬), ৪/২০২০] খবরে কান পাতলে শোনা যায় যে, 'সন্তানের হাতে পিতা খুন', 'ভাইয়ের হাতে ভাই' ইত্যাদি; একে তো রয়েছে মানবীয় দুর্বলতা, সাথে নেই দ্বীনী জ্ঞানের বর্ম, নেই আল্লাহভীরুতার ঢাল, তারউপর হাতে যদি থাকে অস্ত্র, তাহলে বাকী যা রইলো তা হলো অসদিচ্ছাকে জাগ্রত করার প্ররোচণা, যা দিতে শয়তান খুব ভালভাবেই পারদর্শী এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত। ব্যস হয়ে গেল খুন; যার অপরাধ জগতের সমস্ত মানুষকে হত্যার শামিল। [দেখুন- সূরা আল-মায়েদাঃ ৩২]
(অসমাপ্ত পর্ব)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


