আগের পর্ব পড়ুন । ঘুষঃ পারিশ্রমিক পাওয়ার পরও যে কোন কাজ তার ন্যায্য হকদারকে আদায় করতে গিয়ে তার কাছ থেকে যে কোনভাবে কোন কিছু আদায় করা এবং পাওনা নয় এমন কিছু পাওয়ার চেষ্টায় কাউকে খুশি করার নিমিত্ত যে অতিরিক্ত অর্থ কিংবা অন্যান্য দ্রব্যাদির আদান-প্রদান হয়, তার নামই হচ্ছে ঘুষ। বর্তমান পৃথিবী যেন ঘুষের ন্যায় এই অপকর্মকে বৈধ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। কেননা, আপনার-আমার সাথে এখন প্রকাশ্যভাবেই দামদর করেই ঘুষের আদান-প্রদান হচ্ছে। আকারে ইঙ্গিতে হলে সেটাকে আমরা ঘুষই বলি আর যদি শক্তির প্রাবল্যে দাবী করা হয়, তখন সেটাকে আমরা চাঁদাবাজী হিসেবে গণ্য করি। মোটকথা, যে নামেই ডাকি না কেন এটা যে অন্যায়ভাবে অন্যের হক ভক্ষণ বা অধিকারে হস্তক্ষেপ করা; তা নিঃসন্দেহ। পৃথিবীর বিধানাবলীতে এ সম্পর্কিত নীতিমালা থাকলেও তার জন্য নেই যথাযথ ব্যবস্থাপনা। দেশে দেশে দূর্নীতির বৃদ্ধিতে ঘুষের ভূমিকা অসামান্য।
দুনিয়ার মানুষকে ইনসাফ-সুবিচার প্রদান এবং হকদারদেরকে তাদের ন্যায্য পাওনা প্রদানের লক্ষ্যে আগত জীবন বিধান ইসলাম এ ব্যাপারে যে কঠোরতা অবলম্বন করেছে, তেমন নজীর আর কোথাও মিলবে না। কুরআন-হাদীসে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক সম্পর্কিত সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা মেনে চলতে পারলে পৃথিবীর মানুষ ঘুষ-চাঁদাবাজী ইত্যাদি যুলুমগুলো থেকে রেহাই পেত। কেননা, ইসলাম এ কথারই ঘোষণা দেয় যে, "যে ব্যক্তি মানুষের হক আদায় করতে পারে না সে আল্লাহর হক আদায় করতেও অক্ষম"। পরন্তু, "আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অনাদায়ী হক তথা তাঁর অবাধ্যতাকে যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদা দিয়েছেন, কিন্তু অন্যের হক তিনি ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না ঐ ব্যক্তি ক্ষমা করে"। ইসলামের এই সৌন্দর্য্য ও ইনসাফগুলোকে ঘুষখোর যালেমরা সহ্য করতে পারে না; আর সে জন্যই সকল পর্যায়ের ঘুষখোর অপরাধীরা কখনোই ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চায় না। অন্য সকল পর্যায়ের বিরোধিদের সাথে এরাও কাঁধে কাঁধ মিলায় ইসলামের বিরোধিতায়।
আমীরুল মু'মিনীন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর শাসন আমলে যাকাত আদায়ের জন্য নিয়োজিত এক রাজকর্মচারীকে কেউ একজন খুশি হয়ে যাকাতের অর্থ-মালামালের সাথে অতিরিক্ত কিছু্ উপহারও প্রদান করলেন। সে যখন আমীরুল মু'মিনীনের নিকট এসে যাকাতের যাবতীয় অর্থ ও মালামাল জমা দিচ্ছিল, তখন তাকে উপহার দেয়া জিনিসগুলো আলাদা করে নিজের কাছে রাখছিল। এটা দেখে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু জানতে চাইলেন যে, এগুলো কি এবং আলাদা করে নিজের কাছে রাখছো কেন? জবাবে সে বলল যে, এগুলো যাকাত আদায় করতে গিয়ে তার নিজের জন্য পাওয়া উপহার সামগ্রী। উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন এগুলোও যাকাত ফাণ্ডে জমা কর। লোকটি এ কারণ জানতে চাইলে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন যে, আজ থেকে তোমার চাকুরী শেষ, এবার যাও, গিয়ে দেখ যে কেউ তোমাকে কোন উপহার দেয় কি না।
সুবহান আল্লাহ্! কোথায় বর্তমানের জোর জবরদস্তি করে চেয়ে চাঁদাবাজী করে কিংবা আকারে ইঙ্গিতে, কাজ আদায়ে দেরী করা ইত্যাদি মাধ্যমকে খাটিয়ে ঘুষ বা উৎকোচ আদায় করা হচ্ছে, সেখানে ইসলাম এমন বিধান কার্যকর করে পৃথিবীবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কৃত কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে ঘুষ খাওয়া তো প্রশ্নাতীত, বরং কেউ খুশী হয়ে কোন উপহার সামগ্রী দিলে তাও উক্ত কার্যক্রমের লভ্যাংশেরই অন্তভর্ুক্ত। তাই সেসব উপহারও কর্মকোষাগারেই জমা পড়বে। অতিরিক্ত কোন কিছু চাওয়ার তো বিন্দুমাত্র সুযোগই নেই; বরং কাজ আদায়ের কারণে প্রাপ্ত উপহারেও তার অধিকার নেই, অবশ্য মালিক পক্ষ যদি তাতে ছাড় দেয় তো ভিন্ন কথা, কিন্তু তা না দিলে প্রকারান্তরে এই উপহার ভক্ষণ হবে মালিক পক্ষের হক অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা। আর অন্যের হক ভক্ষণের জন্য পৃথিবীতে ছাড় পেয়ে গেলেও আখেরাতে তার মত হতভাগা আর কেউ হবে না।
এ ব্যাপারে এক হাদীসে এসেছে যে, কেয়ামতে এক ব্যক্তি তার ভাল কাজের বদৌলতে জান্নাতে যাওয়ার উপযুক্ত হবে। তারপর তার পাওনাদারগণ অথবা অন্যের হক ভক্ষণ করার কারণে কেয়ামতের দিন সেসব হকের আসল অধিকারীগণ আসবে তা আদায় করতে। সেখানে তো আর টাকা-পয়সায় হিসেব হবে না; বরং হবে পাপ-পূণ্যে, আর একপর্যায়ে লোকটির সকল পূণ্যই পাওনাদারগণ নিয়ে যাবে, তারপরও যখন শেষ হবে না, তখন পাওনাদারগণের পাপ তার খাতায় জমা হবে। এভাবে এই হতভাগা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। (ভাবার্থ) আল্লাহ্ আমাদেরকে হেফাযত করুন এমন করুণ পরিণতি হতে।
(মন্তব্য কিন্তু হিসেব করে--; এখনো শেষ হয়নি)
পরের পর্ব পড়ুন ।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০০৭ সকাল ৮:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




