আগের পর্ব পড়ুন । ইসলামে যাবতীয় নেশার দ্রব্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পর একদিন সাহাবী উমার, মু'আয ইবনে জাবাল এবং কিছুসংখ্যক আনসার রাদিআল্লাহু 'আনহুম রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ 'মদ ও জুয়া মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনাকে পর্যন্ত বিলুপ্ত করে ফেলে এবং ধন-সম্পদও ধ্বংস করে দেয়। এ সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কি?' এই প্রশ্নের জবাবেই আল্লাহ্ তা'আলা নেশার বস্তু মদ সম্পর্কে প্রথম পর্যায়ের বিধান নাযিল করেন যেখানে বলা হয়েছেঃ
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا
((লোকেরা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, 'দু'টোর মধ্যেই আছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও; আর এ দু'টোর পাপ উপকারের চাইতে অনেক বড়'।)) [সূরা আল-বাকারাহঃ ২১৯] আল্লাহ্ তা'আলা মূলত তাঁর সৃষ্টির প্রায় সর্বত্রই ভাল ও মন্দ -এ দু'টি গুণাগুণের সমাহার ঘটিয়েছেন। আর সে ধারায় নেশার দ্রব্যাদিতেও ভাল কিছু গুণাগুণ রয়েছে। প্রাচীন কালেও মানুষ সেসব সুবিধাগুলো পেত এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যার আরো ব্যাপক সু-ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে কিংবা বাধ্য না হয়ে নিছক মনোরঞ্জনের অসদিচ্ছায় নেশায় আসক্ত হওয়া কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং তাতে রয়েছে জাগতিক মহাক্ষতির পাশাপাশি মহাপাপও। এ সমস্ত নেশার দ্রব্য ও জুয়া সম্পর্কে দয়াময় আল্লাহর পর্যায়ক্রমিক নিষেধের প্রথম ধাপের বাণীতে সে কথা সুস্পষ্ট।
তারপর পরবর্তী নির্দেশ আসার প্রেক্ষাপট ছিল এ রকম-
একদিন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিআল্লাহু 'আনহু সাহাবীগণের মধ্য থেকে তার কয়েকজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেন। আহারাদির পর যথারীতি মদ্যপানের ব্যবস্থা করা হলো এবং সবাই মদ্যপান করলেন। এমতাবস্থায় মাগরিবের সালাতের সময় হলে সবাই সালাত আদায়ে দাঁড়ালেন এবং একজনকে ইমামতি করতে এগিয়ে দিলেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যখন তিনি قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ সূরাটি ভুল পড়তে লাগলেন, তখনই মদ্যপান তথা নেশা গ্রহণ থেকে পুরোপুরি বিরত রাখার জন্য দ্বিতীয় পদক্ষেপ গৃহীত হলো। আল্লাহ্ তা'আলা বাণী নাযিল করলেনঃ অর্থাৎ,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى
((হে ঈমানদারগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের কাছেও যেও না।)) [সূরা আন্-নিসাঃ ৪৩] এখানে সালাতের ক্ষেত্রে নেশা গ্রহণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অতঃপর মদীনায় সাহাবীদের আহার ও তৎপরবর্তী মদ্যপানের পাশাপাশি তৎকালীন আরব্য রীতি অনুযায়ী কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে সংঘটিত হয় আরো একটি ঘটনা। যার প্রেক্ষিতে সাহাবী সা'আদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহু মারাত্মকভাবে আহত হন। পরে সা'আদ রাদিআল্লাহু 'আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে উক্ত এহেন দুর্ঘটনার উল্লেখ করে অভিযোগ তোলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো'আ করলেনঃ اللهم بين لنا في الخمر بيانا شافيا অর্থাৎ, "হে আল্লাহ্! মদ সম্পর্কে আমাদের একটি পরিস্কার বর্ণনা ও বিধান দান করুন।" তখনই সূরা মায়েদায় উদ্ধৃত মদ ও মদ্যপানের বিধান সম্পর্কিত বিস্তারিত আয়াতটি নাযিল হয়। এতে মদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ ((হে ঈমানদারগণ! নিশ্চিত জেনো, মদ, জুয়া, বেদী এবং তীরের মাধ্যমে ভাগ্য যাচাই এসবগুলোই নিকৃষ্ট শয়তানী কাজ। কাজেই এসব থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে থাক, যাতে তোমরা মুক্তিলাভ ও কল্যাণ পেতে পার। মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও তিক্ততা সৃষ্টি হয়ে থাকে; আর আল্লাহ্্র যিকর ও সালাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখাই হলো শয়তানের একান্ত কাম্য, তবুও কি তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে না?)) [সূরা আল-মায়েদাঃ ৯০-৯১]
উপরোল্লেখিত নেশার বস্তু হারাম ঘোষণা করার পর্যায়গুলো তুলে ধরার কারণ এই যে, এর মাধ্যমে যে কেউ খুব সহজেই ইসলামের উদারতা, সুবিজ্ঞতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন। বিশ্বস্রষ্টার অপার দয়া ও মমতা এখানে অসীম সুস্পষ্ট। বিধানাবলী জারী করার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষের আবেগ-অনুভূতির প্রতি কতটা সূক্ষ্ম দৃষ্টি রেখেছেন। সোবহান আল্লাহ্! তিনি তো ইচ্ছে করলে একবারেই পারতেন মদ বা নেশার বস্তুসমূহকে নিষিদ্ধ করে দিতে, কিন্তু তা করেননি। কারণ, আলেমগণের মতে, 'যেভাবে শিশুদেরকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়ানো কঠিন ও কষ্টকর, তেমনি মানুষের কোন অভ্যাসগত কাজ ছাড়ানো এর চাইতেও কষ্টকর'। আর আমাদের প্রতিপালক তো সুমহান, সুবিজ্ঞ! পৃথিবীর আর কোন বিধান রচনাকারী কিংবা প্রয়োগকারীর কাছ থেকে মানুষ এমন আচরণ পায়নি; পেতে পারেও না। কেননা, একমাত্র স্রষ্টাই বুঝেন সৃষ্টির সকল আবেগ-অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, কল্যাণ-অকল্যাণ। সমপর্যায়ভুক্তরা সেসব বুঝ অর্জন করা তো সুদূরকল্প, নিজেদের ভাল-মন্দ পরীক্ষা করতে করতেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
(মন্তব্য কিন্তু হিসেব করে--; এখনো শেষ হয়নি)
পরের পর্ব পড়ুন ।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৭ সকাল ১০:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




