somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাচ্চাকে সঠিক পথ দেখানোর আসল দায়িত্ত মা বাবার

১৩ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যখন সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে গিয়ে থাকবো কিছুদিন তখন ইন্টারনেট থেকে বেশ কিছু স্কুলের নাম লিখে নিয়ে গেলাম। দেশে গিয়েই সেই তালিকা দেখে দেখে স্কুলে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছি তাদের স্কুলে ভর্তির জন্য আসন খালি আছে কিনা, কারন আমরা যখন দেশে গিয়েছিলাম তখন সব স্কুলেই একমাস আগে থেকেই নতুন ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল।

বাচ্চার জন্য কোন স্কুল ভাল হবে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছ থেকে কিছুটা ধারনা নিয়েছিলাম। আসন খালি আছে এমন একটা স্কুলে গেলাম, আলাপ করলাম।স্কুল মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। তারপর গেলাম আরেকটা স্কুলে। স্কুলটি বাইরে থেকেই বুঝা যায় সব উচ্চবিত্তদের সন্তান এখানে পড়ে। স্কুলের ভেতরে দেখে তো আমার চোখ ঝলসে যাওয়ার অবস্থা। স্কুলের প্রতিটা জায়গায় বিলাসিতার ছাপ। এমন না যে এরকম স্কুল আগে দেখিনি। আমরা যেখানে থাকি সেখানে নার্সারির একটা বাচ্চাকে পড়াতে এক বছরের জন্য যে পরিমান টাকা জমা দিতে হয়, সেই টাকাতে আমাদের দেশের প্রাইভেট মেডিকেলের একজন এম,বি,বি,এস এর কোর্স শেষ করতে পারবে। তাহলে বুঝায় যায় সেই এই স্কুল গুলির পুরা ক্যাম্পাস , স্কুল কতটা গুছানো। অবশ্য সব স্কুলে এরকম খরচ না, তবে বেশির ভাগ স্কুলেই এমন, বিশেষ করে প্রাইভেট স্কুল গুলিতে।আমাদের দেশে এরকম অত্যাধুনিক স্কুল আছে, আগে জানা ছিলনা। ছেলে ভর্তি পরীক্ষা দেই আর আমি স্কুল দেখি। যেদিন আমরা এই স্কুলে গেলাম তার একদিন আগেই মনে হয় এই স্কুলের এক ছাত্রী তার মা বাবাকে খুন করেছিল। একে তো এই স্কুল এত বেশি চাকচিক্য তার উপর আবার মাত্রই এই স্কুলের ছাত্রী মা বাবাকে খুন করেছে, যদিও এতে স্কুলের কোন দোষ নেই, তারপরও আমার ছেলে ভর্তি পরীক্ষায় পুরো নাম্বার পাওয়ার পরও আমার মন সায় দিচ্ছিলনা এখানে ভর্তি করাতে। আমি বাচ্চার জন্য স্কুলের একটা সুন্দর পরিবেশ খুঁজছিলাম, আমার কাছে এই স্কুল এমন মনে হয়নি।

স্কুলে বলে এসেছি আমরা বাসায় গিয়ে জানাব। স্কুল থেকে বাইরে বের হয়ে দেখি কতগুলো ছেলে মেয়ে পাশের কোচিং সেন্টার থেকে বের হচ্ছে। তাদের বললাম যে আমরা বাচ্চার জন্য স্কুল খুঁজছি, এই এলাকায় কোন স্কুল ভাল হবে। তারা সবাই একসাথে একটা স্কুলের নাম বলল। গেলাম সেই স্কুলে। আরো অনেকের কাছেই জেনেছিলাম এই স্কুল খুবই ভাল। হয়ত ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল, তাই একটা আসন খালি ছিল। পরদিন নিয়ে গেলাম ভর্তি পরীক্ষা দিতে। অনেকের কাছে জেনে আর নিজের চোখে দেখে মনে হল আমি এমন স্কুলই খুঁজছি। বাইরে বসে দোয়া দুরুদ পড়ছি যাতে ছেলে এই স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায়।অনেকের কাছেই শুনেছি এই স্কুলে আসন খালি থাকলেও যদি বাচ্চা ভর্তি পরীক্ষায় ভাল না করে, স্কুল কর্তিপক্ষ আসন খালি রাখবে কিন্তু লাখ লাখ টাকা ডোনেশন নিয়ে বাচ্চা ভর্তি করবেনা। এই স্কুলেও ভর্তি পরীক্ষায় পাস করেছে আমার ছেলে। পরদিন সব কাগজ পত্র নিয়ে ভর্তি করে দিলাম।এই স্কুলে উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সব শ্রেনির বাচ্চাই আছে। সব কিছু মিলে আমরাও ভর্তি করতে পেরে খুশি।

প্রথম দিন ক্লাস করার পর ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম কেমন গেল তার প্রথমদিন। ছেলে বলল ভাল লাগেনি। সে ক্লাসে সবথেকে ছোট বলে অনেকেই তাকে সামনে বসতে দেয়নি, তাকে পিচ্চি পিচ্চি বলে সবাই ডাকে। তার ক্লাসের সব বাচ্চাদের বয়স কমপক্ষে ১০/১১ আর তার বয়স মাত্র ৭ বছর ১০ মাস।তার বয়স কম বলে প্রথমে স্কুলও ভর্তি করতে চাইনি। ছেলে আমার দেশের বাইরে পড়ার কারনে সেই দেশের নিয়ম অনুযায়ী অল্প বয়সেই ক্লাস থ্রিতে চলে এসেছে। আর আমাদের দেশে ঢাকাতে ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাদের বয়সও ৮/৯ হয়ে যায়। যাই হোক ছেলেকে বললাম কিছু কিছু বাচ্চা তুমি নতুন বলে এমন করবে, তুমি তাদের কিছুই বলবেনা, একসময় দেখবে তারা চুপ হয়ে যাবে।

দিন যাচ্ছে আর ছেলের স্কুলের প্রতি আগ্রহ কমছে। অনেকেই তাকে ছোট বলে পাত্তা দেইনা, অনেকেই তাকে সামনে বসতে দেয়না, আর একজন তো আরো সরশ, সে তাকে ধাক্কা দেয়, থাপ্পড় দেয়, তার টিফিন খেয়ে ফেলে। সব কিছু জানালাম স্কুলের সুপার ভাইজারকে। উনি বললেন ঠিক আছে আমি দেখব। আমিও কয়েকজন বাচ্চাকে বললাম যে সে নতুন, তাকে যেন সবাই হেল্প করে সব কিছুতে। কয়েকটা বাচ্চা তাকে বিরক্ত করা বন্ধ করে দিল। কিন্তু একটা বাচ্চা যে থাপ্পড় মারে, ঘুষি মারে, টিফিন খেয়ে ফেলে সেই বাচ্চা আরো বেশি করে বিরক্ত শুরু করেছে।

ছেলে আমার বাসায় এসে প্রতিদিন কান্না করে। স্কুলে যেতে চাই না। স্কুলে বাচ্চারা এরকম করতে পারে, এসবে সে অভ্যস্ত না। আমি তাকে শিখিয়েছি মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করতে, কেউ খারাপ ব্যবহার করলেও সে যেন তাকে কিছুই না বলে, সে শিখেছে অন্য বাচ্চাদের সাথে খাবার শেয়ার করে খেতে, সে শিখেছে ভ্যালেন্টাইন ডে-তে এতিম বাচ্চাদের সাথে ভালোবাসা প্রকাশ করতে, সে শিখেছে তার জন্মদিন এতিমখানাতে খাবার খাওয়াতে, বাসার কাজের লোক, ড্রাইভার, দারুয়ান তাদের সাথে জন্মদিনের আনন্দ ভাগ করতে।

সে শিখেনি অন্যের খাবার জোর করে খেয়ে ফেলতে, মারামারি করতে।কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতে। একে তো নতুন স্কুল, পড়ার সিস্টেম আমিও বুঝিনা, ছেলেও বুঝেনা। কারন দেশের বাইরে তো তাকে বাসায় পড়তে হয়নি, আমি শুধু বাংলা পড়িয়েছি বাসায়, এখনো পড়াই। তার উপর আরেক ছেলের এমন ব্যবহারে কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমি শুধু বলি বাবা এডজাস্ট কর, এডজাস্ট কর, এই ছেলের সাথে কথা বলবে না। ছেলে বলে আমি কথা বলিনা, তাও সে এমন করে, আরো কয়েকজনের সাথেই এমন করে। একদিন ছেলে ছুটির পর ক্লাস থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হল আর বের হয়েই আমাকে তার হাত দেখাচ্ছে, ঐছেলে তাকে এমন খামচি দিয়েছে যে রক্ত পড়ছে। আমি বললাম তুমি কি এই ছেলের মাকে চেন। সে বলল হুম। তারপর দূরে দাঁড়ানো একটা মহিলাকে দেখিয়ে বলল এই হচ্ছে তার মা। আমি বললাম যাও তার মাকে গিয়ে বল সে কি করেছে। আমি কিছুই বলব না, সমস্যা তোমার তাই তুমিই বল।

ছেলে আমার সেই মহিলার কাছে গেল। আমি তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছি। সে বলল ‘’খালামনি দেখেন সামিন আমার হাত খামচি দিয়ে কেটে ফেলেছে’’। সামিনের মা বলল ‘’ তুমি আমাকে বলছ কেন? তুমিও তাকে খামচি দিয়ে দিতে’’। এই কথা শুনে আমি শুধু বললাম আমি তাকে কারো সাথে মারামারি করতে শেখাই না, আমি শেখাই তোমার সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলেও তুমি তার সাথে ভাল ব্যবহার করবে।

এই কথা শুনে তো মহিলা এমন ক্ষ্যাপা ক্ষেপেছে যে তার মুখে যা আসে তাই আমাকে শুনিয়ে দিল। তার ছেলে তো এসব দেখে মহাখুশি। আমি মহিলার এমন দূর্ব্যবহারে অবাক, আমার ছেলে কোনদিন কোন মানুষকে দেখেনি এমন খারাপ ব্যবহার করতে, সেতো ভয়েই শেষ। এই মহিলা নাকি পি, এইচ, ডি করা। এমন পি, এইচ, ডির কি মূল্য যে ব্যবহার ই শিখেনি। পরে অনেকের কাছেই শুনেছি এই মহিলার কাছে তারাও তার ছেলে যে অন্যের টিফিন খেয়ে ফেলে, মিথ্যা বলে, মারামারি করে এসব নিয়ে বিচার দিয়ে নিজেরাই অপমানিত হয়েছে। সে কারো কথা বিশ্বাস করেনা। তার ছেলে যা বলে তাই বিশ্বাস করে। এজন্য এখন আর কেউ তাকে কিছু বলেওনা।

বাসায় এসে আমি পুরা এক সপ্তাহ মন খারাপ করে ছিলাম তার ব্যবহারে। ছেলে শুধু বলে মা চলেন আমরা আবার চলে যাই। প্রতিটা মা বাবার উচিত তার সন্তানকে ভাল-মন্দ, পাপ-পূন্য, যার যার ধর্মের ধর্মিয় জ্ঞান, মানবিক গুণাবলী শেখানো। বাচ্চারা কাদামাটির মত,মা বাবা বাচ্চাকে যা শেখাবে তারা তাই শিখবে। বাচ্চাকে সব মা বাবাই আদর করে কিন্তু এভাবে অন্ধের মত আদর করে আমরাই তাদের ঐশীর মত হওয়ার পথ তৈরি করে দেই। শুধুমাত্র সঠিক শিক্ষার অভাবে এইধরনের মায়েদের বাচ্চারা বড় হয়ে ভাল কোন চাকুরি বা ব্যবসা হয়ত ঠিকই করবে, কিন্তু মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েও মানুষ হবেনা। প্রতিটা মা বাবার উচিত বাচ্চাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া। বাচ্চা কার সাথে মিশছে, স্কুলে কি করছে সেসব জানা। আমরা যদি বাচ্চাদের সঠিক পথ না দেখাই তাহলে বাচ্চারা তো উল্টো পথে হাঁটবেই।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৩৭
২৮টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×