একজন তারেক মাসুদকে কি আর কেউ এনে দিতে পারবে আমাদের? কোথায় পাবো আমরা আশফাক মুনীর মিশুককে? আর একটি বারও কি আমরা দেখতে পাবো,মায়াবী হাসিমাখা মাটির ময়না-টাকে অথবা দ্যুতিময় চোখের লম্বা-চওড়া মানুষ মিশুককে? স্বপ্নবাজ এই জুটি কি আর কোনদিন আমাদের স্বপ্ন মেরামত করবে না? আমরা কি আসলে-ই চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি তাদের? কোন উপায় কি আছে তাদের ফিরে পাবার? কে বানাবে আমাদের জন্য কাগজের ফুল?
এমন হাজার প্রশ্ন আমার মত চলচ্চিত্র প্রেমীদের চোখে মুখে আজ ঘুরে ফিরছে বারেবার। চোখের জলের বিনিময়ে যেন ফিরে পেতে চাইছি তাদের। কোন কার্পণ্যতা নেই কান্নায়। শোকে পাথর হয়ে বসে আছি একটা অবান্তর আশায় । এখনি বুঝি ফিরে আসবেন তারেক,মিশুক। মনের মাধুরি মিশিয়ে আমাদের জন্য বানাবেন "এ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড,সোনার বেড়ী, মাটির ময়না,নারীর কথা, মুক্তির কথা,ইন দ্য নেইম অফ সেফ্টি, ভয়েসেস অব চিলড্রেন,মুক্তির গান, ইউনিসন,সে,আদম সুরত,অন্তর্যাত্রা,রানওয়ে ও নরসুন্দর-এর মত বিশ্বখ্যাত কোন নতুন চলচ্চিত্র।" আর জগৎ মাতিয়ে হাসবেন তারেক,পাশে থাকবেন মিশুক। তাদের হাসিতে আবার হাসবে বাংলাদেশ। শোকাহত আমরা,বিষন্ন আর বড় বেশি মলিন আমাদের আকাঙ্ক্ষা।
কেঁদে কেঁদে যদি তারেক মাসুদ,মিশুককে ফিরিয়ে আনা যেত,তাহলে হয়তো আমরা তাই-ই করতাম। আকাশ,বাতাস ভারি করে তুলতাম হাউ-মাউ শব্দে। কান্নার চিৎকারে প্রকম্পিত করে তুলতাম পৃথিবীর চতুরদিক। অশ্রু বন্যায় জগত ভাসিয়ে , দুহাত বাড়িয়ে ধমকের সুরে ভিক্ষা চাইতাম। বলতাম ফিরিয়ে দে। আমাদের তারেক,মিশুককে। আমাদের যে খুব প্রয়োজন এই দুই মানবকে। এমন নক্ষত্র মানব যে প্রতি বছর জন্ম নেয় না আমাদের দেশে। এই দেশের খুব বেশি মানুষকে নিয়ে গর্ব করা যায় না। আকাশ চুম্বী দালান কোঠা আর দামি শাড়ি-চুরির স্বপ্ন নিয়ে জন্ম নেয়া কোটি মানুষের ভিড়ে কিছু এমন আছেন যাদের নিয়ে আমরা অহংকার করতে পারি। এই কিছু মানুষের অন্যতম দুইজন ছিলেন তারেক মাসুদ আর আশফাক মুনীর মিশুক। তাই তাদের হারিয়ে আমাদের পাগল হবার পালা।
হে! বরেণ্য চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ,গণমাধ্যম জগতের প্রান পুরুষ মিশুক,তোমরা আমাদের ক্ষমা করো। আমাদের পরাজয়ে তোমরা চলে গেলে সিমানা পেরিয়ে। এ লজ্জা আমাদের। তোমাদের হারিয়ে আমরা আরেকবার পরাজিত হলাম। আরো একবার বিপন্ন হলো আমাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনা। তোমরা ছিলে আমাদের গর্বের অমূল্য রত্ন। তাইতো আমাদের উচ্চারন ছিল "এই আমাদের তারেক মাসুদ","এই আমাদের আশফাক মুনীর মিশুক"। চোখের জলের বন্যা বইছে বাংলাদেশের মিডিয়া অঙ্গনে?নিস্তব্ধ ,স্তব্ধবাক সমগ্র দেশের মানুষ। তারপরে -ও আমাদের কোন উপায় নেই। উপায় হীন মানুষের সর্ব শেষ কর্ম হল প্রার্থনা। তাই আমরা আন্তরিক ভাবে কামনা করছি তোমাদের অন্তর্যাত্রা শান্তিময় হোক...
স্মৃতির এ্যালবামে তারেক মাসুদ ।
তারেক মাসুদ তার বাল্যকালের অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছিলেন মাদ্রাসায়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন এবং একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন এবং দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের শেষ দিকে তিনি জীবনের প্রথম ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ডকুমেন্টারিটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশী শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের উপর। এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি, এনিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ২০০২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাটির ময়না মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং দেশে-বিদেশে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অডিঁনেটর হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতেন।
তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়া তারেক মাসুদের আগ্রহের বিষয় ছিল লোকসঙ্গীত এবং লোকজ ধারা। এই দম্পতির 'বিংহাম পুত্রা মাসুদ নিশাদ' নামে এক ছেলে আছে।
বিকল্প ধারার এই চলচ্চিত্রকার ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ঘিওর নামক এলাকায় মর্মান্তিক এক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হন। একই দুর্ঘটনায় বুদ্ধিজীবি সাংবাদিক ও প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর নিহত হন। কাগজের ফুল নামের
চলচিত্রের শুটিং স্পট দেখার জন্য মানিকগঞ্জের ইছামতি নদীর তীরে তারা গিয়েছিলেন। একই দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ গুরুতর আহত হন।
ইতিহাসের পাতায় আশফাক মুনীর মিশুক।
আশফাক মুনীর চৌধুরী শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে। ১৯৮৩ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যায়ন শেষ করেন। ১৯৮২-৮৯ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন জাতীয় জাদুঘরের অডিওভিজুয়াল কর্মকর্তা হিসেবে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকতায় যুক্ত হন।
১৯৯৯-০১ পর্যন্ত একুশে টিভির বার্তাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মিশুক মুনীর।
২০০২-২০০৭ সালে তিনি টরন্টোর ব্রেকথ্রো ফিল্মস,জে ফিল্মস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্স ক্যামেরাপারসন ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। কানাডার রিয়েল নিউজ নেটওয়ার্কের হেড অব ব্রডকাস্ট অপারেশন্স হিসেবে দীর্ঘ আট বছর কাজ করেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিবিসির হয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। একুশে টেলিভিশন চালু হলে এ অঙ্গনে দেশের অন্যতম যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মিশুক মুনীরই দায়িত্ব পান সংবাদ বিভাগ পরিচালনার।
সর্বশেষ গত বছর তিনি এটিএন নিউজে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি লিবিয়ার সংকটের সময় সে দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সংবাদ সংগ্রহ করতে নিজেই ছুটে যান। বাংলাদেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের ছবি রানওয়ের প্রধান চিত্রগ্রাহক ছিলেন মিশুক মুনীর। এছারা -ও সম্প্রচার সাংবাদিকতার পেছনের মানুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ পরিচিতি রয়েছে তার।
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



