দেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি অতিতের যে কোন সময় থেকে অনেক বেশি নাজুক এবং উদ্বেগ জনক। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বলেছেন, গত ১০ বছরের মধ্যে যে কোনো বিবেচনায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি ভালো। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হল, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। নিরাপত্তাহীনতায় কাটছে তাদের দিন। সারা দেশে দৈনিক গড়ে কমপক্ষে ১১টি হত্যাকান্ড ঘটছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে একাধিক। ডাকাতি-দস্যুতাসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বাড়ছে বেপরোয়াভাবে। গণপিটুনের নামে পিটিয়ে মানুষ হত্যায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন রেকর্ড। আইনি অধিকার বঞ্চিত মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে দিন দিন। সন্ত্রাস ও নির্যাতনের শিকার সাধারণ মানুষের আইনি আশ্রয় লাভের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বারবার। অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের দলীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেও খুনের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। দেশে আশঙ্কাজনকভাবে হত্যা, গুম ও সন্ত্রাস বেড়েছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই অজ্ঞাতনামা লাশ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক ও ভীতি কাজ করছে সর্বত্র।
এ বছর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, বিরাজমান পরিস্থিতি আমার কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে। কি মূল্যস্ফীতি, কি আইনশৃক্সখলা, কি প্রশাসন, কি অর্থনীতি, কি পররাষ্ট্রনীতি, কি দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় পরিস্থিতি সর্বত্রই একটা ক্রমাবনতিশীল চেহারা প্রতিদিন অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে। দেশের এ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ-আশঙ্কা ব্যক্ত না করে আমি আর স্থির থাকতে পারছি না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান গত ৭ আগস্ট পুলিশ ও মানবাধিকার শীর্ষক এক সেমিনারে পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন , রাজনৈতিক সরকারগুলো সব সময় পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি বলেন, পুলিশকে এসব চাপ উপেক্ষা করে কাজ করে আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে হবে। সত্যিকার অর্থে দেশে কোনো আইনের শাসন নেই। বিচার ব্যবস্থাতেও আইনের শাসন অনেকটা অনুপস্থিত । জনগণ মনে করে যে, সুবিচার পেতে হলে অর্থ প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না থাকায় সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনের সুযোগ না পেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন , জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কারাগার পরিদর্শন করতে না দেওয়া সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। আইজি প্রিজনের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক আইন অমান্য করার অভিযোগ এনে প্রয়োজনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন উচ্চ আদালতে যাবে। তিনি বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকেই নিয়োগ দেওয়া উচিত, যিনি আইনের মর্মার্থ বুঝবেন।
গত ২ অক্টোবর এফবিসিসিআই সম্মেলন কক্ষে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রানালয়ের কর্মকতাদের এক মতবিনিময় সভায় দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শিল্পপতি ব্যবসায়িরা তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। চুরি, ছিনতাই, পথ-ডাকাতি, মাদক ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে এ আলোচনায়। শিল্পপতি ব্যবসায়িরা তাদের ব্যবসা পরিচালনায় এই সব বিরাজমান সমস্যার কথা বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরে এর সমাধান দাবি করেন। জবাবে পুলিশের আইজিপি, র্যাবের মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমস্যাগুলির সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ব্যবসায়িদের আশ্বস্থ করেন। তারা উল্ল্যখ করেন, অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হয়। এর পরেও র্যাব-পুলিশের সাফল্য অনেক।
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০১০ এর প্রতিবেদনে বলা হইয়েছে, ২০১০ সালের প্রথম ১০ মাসে ৬০ জনেরও বেশি লোক র্যাব ও পুলিশের হাতে নিহত হয়েছে। এছাড়া ওই সময়ে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে কমপক্ষে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এসব অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। কারণ বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত এসব খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত কারও কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাদের একজনকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। এটা নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের একটি নেতিবাচক দিক । এ অবস্থাটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশের জন্য অনুকূল নয়। সরকারকে দেশব্যাপী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছ হতে হবে।পুলিশ ও র্যাবের যে অংশটি দুর্নীতিপরায়ণ এবং যারা এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণিত হবে তাদের অবশ্যই শনাক্ত করতে হবে। এদের কারণেই পুলিশ ও র্যাব বাহিনীকে বিরাট অপরাধের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে। দেশের স্বার্থেই পুলিশ র্যাবকে ঢেলে সাজানো দরকার। সরকারের উচিত দেশে এ ধরনের হত্যা বন্ধ করা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিআইবি) দুর্নীতির ধারণা সূচক-২০১০ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০০৯ এর ১লা জানুয়ারি থেকে ২০১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জরিপের মাধ্যমে ২ দশমিক ৪ সূচক বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের স্কোর (২.৪) না বাড়ায় প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে হতাশা ব্যক্ত করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, দুর্নীতি কমাতে সরকারি দলের জোরালো নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে তারা এ অঙ্গীকার পূরণে খুব একটা অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশ পিছিয়েই পড়বে। সংসদকে আরো কার্যকর হতে হবে। দুদকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কোনো অবস্থায়ই ঠিক হবে না। সরকারি ক্রয়নীতিতে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৎকালীন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, দুর্নীতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রকাশিত রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে তা আংশিক । তিনি বলেন, দুর্নীতির চিত্র টিআইবির রিপোর্টের চেয়েও ভয়াবহ এবং দেশের সার্বিক দুর্নীতির মাত্রা আরও ব্যাপক ।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার- দিন বদলের সনদে বলা হয়েছিল, "জনজীবনের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ হবে।" কিন্তু এই ঘোষণার বাস্তবায়নের কোনো যথার্থ উদ্যোগ সাধারণ মানুষের দৃশ্যমান হয়নি এখনো। বরং একের পর এক অপরাধ কর্মকান্ডের পর সরকারের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলে নিরন্তর দাবি করা হচ্ছে। যেটা দেশ ও জাতির সাথে তামাশা করা ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের দাবি সরকারের কর্তা ব্যাক্তিরা কথা কম বলে ফলপ্রসূ কাজ করবেন।
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



