
প্রচন্ডরকম ক্ষুধা পেয়েছে। আবু মিয়ার ছাপড়া দোকান আজ বেশ কয়েকদিন বন্ধ। খাওয়া দাওয়ায় যে বেশ অসুবিধা হচ্ছে তাও নয়। এক দুই বেলা না খেয়ে দিব্যি কাটিয়ে দেবার ট্রেনিং ভালই নেয়া আছে হোসেনের। তবে এখন বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে। দুপুরে লাইব্রেরীর মালিকের ছেলে কলা রুটি আনিয়েছিল, সেটার কার্যবিধি যে ফুরিয়ে গেছে তা ভালই টের পাচ্ছে এখন। হাটতে হাটতে এগুচ্ছে, ফুটপাতের উপর মাথার উপর ঠাই গোজা নেই যাদের তারা চার হাত পা এক করে ঘুমুচ্ছে। তিন জনের একটা জটলা মতন দেখা যাচ্ছে, মাঝে ধোয়া উঠছে। কাছে গিয়ে দেখা গেল, প্রায় ষাটোর্ধ একজন বৃদ্ধা, আর দুইজন ছেলে মেয়ে বয়স আনুমানিক নয় কি দশ হবে, জটলা পূর্ণ করে বসে আছে।
রান্না হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে। এই মূহুর্তে ভাত রান্না হচ্ছে। মাটির ঢাকনা ফুড়ে পানি বের হচ্ছে আর ধোয়া বের হচ্ছে। কোথা থেকে যেন স্টোভ কুড়িয়ে রান্নার এই আয়োজন চলছে।
হোসেনের ক্ষুধাটা যেন চড়ে উঠল। নির্বিকার হয়ে জটলার সামনে গিয়ে দাড়ালো।
সবাই মুখ তুলে একবার হোসেনের দিকে চাইল। এর পর নিজেরা নিজেরা মুখ চাওয়া চাউয়ি করে নিল। কি কথা বার্তা হোল ইশারায় কে জানে।
বৃদ্ধা হঠাৎই বলে উঠলো,
-বাবা খাইবা আমাদের সাথে
হোসেনের বোধশক্তি বোধহয় লোপ পেয়েছে, শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। ছেলে মেয়ে দুইটি ঘুমে ঢুলছে।
-প্লেট একটা বাবা, ঢাকনির মধ্য দেই? ভাত নাই তেমন, চার পাচ লোকমা খাইতে পারবা হয়ত।
হোসেন শুধু বলে
-দিন না, অসুবিধা নেই।
বৃদ্ধা পরম যত্নে ছেলে মেয়ে দুইটিকে ভাত তুলে দেয় একটা মাত্র প্লেটে। একটু ডাল, আর হোটেলে বাসি ভাজি দিয়ে চটকে চটকে মেখে খাইয়ে দিতে থাকে।
হোসেন কে দেয়া ঢাকনায় অল্প কিছু ভাত তুলে দেয়, আর সাথে একটু ভাজি, একটা কাচা মরিচ।
-হাত টা ধুইয়া আসো গো বাবা, গেলাস তো নাই, বোতলে খাওয়ার পানি দিতাসি। নাও বস বাবা, খাও
প্রচন্ডভাবে আবেগ কাজ করে হোসেনের। গলা শুকিয়ে যায়। পানিতে ঢোক গেলে। ভাত হাতে মাখিয়ে বসে থাকে, আহ কত দিন এভাবে আদরে ভাত খাওয়া হয় না।
খুব বেশি চাওয়া পাওয়া তো নেই, পোলাও কোরমা, অথবা ভুনা মাংস, দোপেয়াজা মাছভাজা এসব এ হয়ত পেট ভরে যায়, মন কি ভরে?
আজ হয়ত পেট ভরবে না, তবে মন ভরবে।
জীবনের কাছে খুব সামান্যই চাওয়া পাওয়া, একটু আন্তরিকতা, একটু স্নেহ, ড্রইং রুমের অই সাজানো বাহারি গন্ধবিহীন ফুলের থেকে বাগানে হাস্নাহেনার গন্ধর মতই তীব্র। ব্যাপার টা কেবল অনুভবের।
গরম ভাতের ধোয়ায় অথবা অন্য কোন কারনে ফুটপথে চারজন মানুষের একজনের চোখ চিকচিক করতে থাকে।
তীব্র অনুভব, হাস্নাহেনার তীব্র গন্ধের মতই।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০২০ রাত ১২:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




