
১ /
আমাদের এলাকার সব চেয়ে প্রাচীন দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার ছিল মেইন রোডে । উপরের কার্টুনের মত, ইনি পৃথিবীর ইতিহাসে দাঁতের প্রথম সার্জন ছিলেন কিনা জানা না গেলেও , উনার কর্ম পন্থায় প্রতীয়মান হতো , প্রথম না হলেও ইনি অন্তত প্রথম দশ জনের মধ্যে ছিলেন ।
উনার সামনে টেবিলের উপর এই বিদ্যার সার্টিফিকেট স্বরূপ কেজি পাঁচেক দাঁত ছিল ।( সাইজ দেখে অনুমান , সেখানে বেশির ভাগ গরুর ) যা উনার প্রধান বিজ্ঞাপনও ছিল ।
আমার আম্মার দাঁতের ব্যাথা । ওষুধের জন্য গেলাম এই ডাক্তারের কাছে । চেম্বারে ঢুকার মুখেই ভিতর থেকে এক মহিলার গোঙানির বিকট শব্দ শুনতে পেলাম । ভিতরে ঢুকে দেখি অবস্থা ভয়াবহ !
এক মহিলাকে ফ্লোরে শুইয়ে ডাক্তার প্লায়ারস দিয়ে তার দাঁত তুলছে । ডাক্তারের এক পা মহিলার বুকে , আরেক পা চুলের খোপার উপর । আর মহিলার স্বামী মহিলার দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে ।
২ /

এক সরকারী স্টাপ দাঁত তুলতে গেছে এই ডাক্তারের কাছে । ডাক্তার প্লায়ারস দিয়ে হ্যাঁচকা টান মেরে দাঁত তুলে আনলো । রোগী যন্ত্রণায় ''গেছিরে'' বলে চিৎকার করে উঠলো । রোগীকে কুলি করার জন্য পানি দেয়া হলো । রোগী মুখে পানি নিয়ে গড়গড়া করার চেষ্টা করতেই দেখা গেলো সব পানি নাক দিয়ে বেরিয়ে গেছে ।
এই দেখে ডাক্তার সাহেব এক কাণ্ড করে বসলেন। রোগীকে ধাক্কা মেরে দোকানের বাইরে ফেলে , দড়াম করে শাটার টেনে , ভোঁ দৌড় ।
এই ঘটনা নিয়ে অনেক দরবার হয়েছিল ।
বাদী বলেছিল তাঁর ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে , ডাক্তারের ৭ হাজার টাকা জরিমানার মাধ্যমে বিষয়টার মীমাংসা হয়েছিল ।
৩/

৯০ সালের দিকে , একবার দাঁতে ব্যথা নিয়ে বাবলু আমার কাছে এলো । সেই সময়ে উপজেলা সদরের তাকিয়া রোডে এক দাঁতের ডাক্তার চেম্বার খুলে বসেছে । উদ্ভোধনের মিলাদে আমিও হাজির ছিলাম ।ভাবলাম বেচারার জিলাপি খেয়ে এলাম , দেখি তার কিছু শোধ দেয়া যায় কিনা ।
বাবলুকে পাঠিয়ে দিলাম তার কাছে । দাঁতের ডাক্তার ফাক্তারকে বাবলু বেশ ভয় পায় । ভরসা দিয়ে বললাম , তুলা দিয়ে একটা লিকুইড লাগিয়ে দেবে ব্যাথা চলে যাবে ।
অনেকক্ষণ হল বাবলু ফিরে আসার নাম নাই । ব্যাপার কি দেখার জন্য এগিয়ে গেলাম । দেখলাম রোগী এক মালটিফাংশান চেয়ারে শোয়া । ( কাজ জানুক আর না জানুক , দাঁতের ডাক্তার ( কোয়াক ) দের প্রধান সাইনবোর্ড এই চেয়ার , এক মাত্র পুঁজিও বটে । )
আর ডাক্তার ব্লেড দিয়ে রোগীর মুখের মধ্যে কি জানি খোঁচাখুঁচি করছে ।
বাবলু আমাকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে বসলো । দেখলাম সে খুব খুব ভীত । চেহারায় ''ডাকাতের পাল্লায় পড়েছি'' অবস্থা ।
আমাকে বলল , ভাইয়া আপনি আমাকে কার কাছে পাঠাইলেন , এ তো আমাকে সুঁই টুঁই মেরে নাশ খাশ করি ফালাইছে ।
ডাক্তারের চেহারায়ও দেখলাম বেশ আতংকের ছায়া ।
বললাম , কি মিয়া , তুমি কি চিকিৎসা করতে যাচ্ছ , সেটা আগে রোগীকে বুঝিয়ে বলবেনা ? ?
বুঝিয়ে বলার পর রোগী রাজী হলে তার পরইতো চিকিৎসা করবে ।
ডাক্তার আমাকে সাইডে নিয়ে অনেকটা নিচু্ স্বরে বলল , ভাই জান , আগে তিন জনকে ইঞ্জেকশন দিয়ে লোকাল এনেস্থেশিয়ার কথা বলেছিলাম , দুজন পরে আসবে বলে ভেগেছে , আরেকজন বলার সাথে সাথে পলাইছে । ভাবলাম উনাকে বললে উনিও ভেগে যাবেন তাই, না বলেই ------
ধমক দিয়ে বললাম , কাজটা তুমি ঠিক কর নাই ।
ডাক্তার কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল , ভাইজান চেম্বার খুলেছি আজ এক মাস নয় দিন , এখনো ''বউনী'' করতে পারি নাই । বড় কষ্টে আছি ।
আমার একটু সহানুভূতি এলো । জিজ্ঞেস করলাম , হাতে ব্লেড কেন , এখন সমস্যা কি ?
কোয়াক জানালো , সুঁই মারার সময় উনি নড়াচড়া করায় , সুঁইর আগা ভেঙ্গে ভিতরে রয়ে গেছে ।
শেষের কথা কয়টি মনে হয় বাবলুর কানে গিয়েছে ।
- ওরে আল্লারে ---!!! শালার পুতে আমারে খাইছেরে !!! বলেই বাবলু দিলো দৌড় ।
এই ঘটনার পর প্রায় ছয় মাস বাবলু আমার সাথে কথা বলে নাই ।
এই দাঁত ঠিক করতে ওই আমলে তার পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল ।
চেম্বারটিও আর তালা খোলা অবস্থায় দেখিনি ।
(আজ গিন্নীকে নিয়ে দাঁতের ডাক্তারের কাছে গেলে ঘটনা কয়টি মনে পড়ল ।)
পুনশ্চ ঃ ১৪ হাজার বছর আগের গুহামানবদেরও ছিল দাঁতের ডাক্তার
বোলোগ্না বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্তেফানো বেনাজ্জি আবিষ্কার করেছেন ১৪ হাজার বছর প্রাচীন একটি কঙ্কাল। আর এতেই বেরিয়ে আসে পুরোনো অনেক অজানা তথ্য।নৃ-বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন‚ কঙ্কালের মাড়ির একটি দাঁতে চিকিৎসা করা হয়েছিল। রীতিমতো ড্রিল করে বের করে দেয়া হয়েছিল ক্ষয়ে যাওয়া অংশ। তার পর ফিলিং । বর্তমানে যাকে বলে রুট ক্যানেল , এটি পৃথিবীর ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত প্রাচীন ডেন্টাল সার্জারি।

জনস্বার্থে - সারা পৃথিবীতেই দাঁতের চিকিৎসা অত্যান্ত ব্যয়বহুল । স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলোও দাঁতের ঝুঁকি বহন করে না ।
(তাদের বীমা পত্রে উল্যেখ থাকে ''দাঁত ব্যাতিরেকে"।) সুতরাং দাঁত থাকতে দাঁতের যত্ন নিন ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৯:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



