somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সমগ্রঃ পর্ব ২

১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আকবর শেঠ।



'বৈঠকি খুনের জনক' আকবর শেঠ এর জন্ম ১৯৫০ এর দশকে। আকবরের প্রথমদিককার জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। আকবর শেঠ প্রথম লাইমলাইটে আসে ১৯৭৮ সালে।

সবে তখন রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। আকবর শেঠ পুরান ঢাকার প্রতিটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা নিত। কেউ টু শব্দ ও করতে পারতো না, শব্দ করলেই রাতে বা সন্ধ্যায় বৈঠকের আয়োজন করা হত। আর সেই বৈঠক হত আমন্ত্রিত অতিথির জীবনের শেষ বৈঠক।
কারণ আকবর শেঠ আমন্ত্রিতকে কুপি য়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিত। গুলি করতো এলোপাথারি। এরপর লা শ ফেলে দিত বুড়িগঙ্গায়। আকবর শেঠ জীবনে কতগুলো খু ন করেছিল কেউ হিসাব দিতে পারেনি।


আরমানিটোলা- নয়াবাজার- নাজিরাবাজারের বিভিন্ন এলাকা সে বিভিন্ন অবৈধ জিনিস ও খাবারের ব্যবসা শুরু করেছিল। এজন্যে সে রাজনীতিতেও জড়ানোর প্রয়োজন বোধ করতে শুরু করে।

আর শুরুতেই বিএনপিতে যোগদান করে। যোগ দিয়েই সে হয়ে ওঠে এলাকার ভয়ংকর ত্রাস। ১৯৮০ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জের এক আড্ডায় দাওয়াত দেয়া হয় আয়ুব ও মিন্টু কে। দুজনেই আর্মানিটোলার ব্যবসায়ী।

কদিন আগেই আকবর শেঠের সাথে চাঁদা দেয়া নিয়ে হাতাহাতি হয় ওদের। কিন্তু আকবর ওদের খবর পাঠায় আকবরের ডানহাত ‘আলীজান’কে দিয়ে। আলীজান নিজেও ছিল ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী।

বলা হয়- আকবর শেঠ ওদের সাথে মিমাংসা করতে চান। দুজনে গিয়ে দেখে সেখানে আকবর নেই। কিছু ছেলেপেলে আগে থেকে মদ খাচ্ছে- বড় ক্যাসেট প্লেয়ারে হিন্দি গান বাজছে।

ওরা দুজনকে নিজেদের সাথে মজা করতে আহবান করতেই দুজনেই ওখানে নাচ গানে মত্ত হয়ে যায়। মদের নেশা সবে চড়ে বসতে শুরু করেছে – দুজনেই সেখানে নির্ভার। এরমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।



আর বৃষ্টির মধ্যেই কয়েকজন মোটরসাইকেলে এল সেখানে। হঠাৎ একটা ব্ল্যাংক ফায়ার। থেমে গেল নাচ-গান। লোকগুলোর মধ্যে একজনকে চিনতে পারল আয়ুব। মিন্টু প্রথমে নেশার ঘোরে ছিল। তাই চিনতে না পারলেও কয়েক মিনিট পরেই সে বুঝতে পারল আকবর শেঠ দাঁড়িয়ে আছে।

এর মধ্যে ওরা বুঝতে পারল আগন্তুকদের মধ্যে কয়েকজন ওদের ধারালো চাপাতি দিয়ে কো পাচ্ছে। এলোপাথারি কো প খেয়ে আয়ুব আর মিন্টুর জীবন যায় যায়- তখন আকবর শেঠ দুজনের বুকের কাছে বন্দুক ঠেকিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

বাকিরা দেখল-দুজনের লা শ তুলে নিয়ে গেল আকবরের লোকেরা। পরদিন দুজনের লা শ পাওয়া গেল নদীতে। চারিদিকে রি রি পড়ে গেল। আকবর শেঠের ভয়ে সবাই দিশেহারা।

কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরাও কেউ আকবরের নাম মুখে আনেনি। সবাই চুপ মেরে গেছে। এভাবে আকবর যে কতজনকে দাওয়াত দিয়েছে আর ডেকে এনে হাসি ঠাট্টায় কথা বলতে বলতে কু পিয়ে-গুলি করে মে রেছে তার ইয়ত্তা নেই।

সাধারণ একজন টোকাই থেকে ধীরে ধীরে বড় ব্যবসায়ী ও পরে রাজনীতির মাঠে আসার পর আকবর নিজের ক্যারিয়ারের দিকে মন দিল। নিজের ক্লিন ইমেজ ধরে রাখার পাশাপাশি ‘আলীজান’ কে দিয়ে নিজের ব্যবসা চালাতো সে।

আলীজান ও আকবরের প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো পালিত কুকুরের মতো। আকবর শেঠ যখন যাকে দাওয়াত দিতে বলতো- পরদিনই তার মৃত্যু সংবাদ অবধারিত ছিল।

সে আমলে অনেক ব্যবসায়ী দাওয়াতের চিঠি পেয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর রেকর্ড আছে। ভারত ও পাকিস্তানের কুখ্যাত ডন দা উদ ইব রাহিম এর সাথে আকবরের বন্ধুত্ব ছিল। দুজনের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে সে সময় পত্রিকায় আর্টিক্যাল ও বেরিয়েছিল।

এদিকে রাজনীতিতে মন দেয়ার পর আকবর জনপ্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টায় সমাজসেবা শুরু করে। ভয়ংকর সন্ত্রাসী আকবর শেঠ ও আলীজানের হাসিমাখা মুখ দেখে সবাই ভাবতে শুরু করে- আকবর বোধহয় ভাল হয়ে গেছে।।

আকবরের বয়স ও তখন অনেকটাই হয় গেছে। তারুণ্যের টগবগে রক্ত আর শরীরে বইছেনা। তাই সে এসব কাজ থেকে ইস্তফা দেয়ার চেষ্টা করতে শুরু করে। কিন্তু পাপ ছাড়েনা বাপকেও।

আকবর শেঠ এর সামনে কেউ কথা বলতে না পারলেও সবাই পেছনে পেছনে ঠিকই বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে। বিশেষ করে আকবর শেঠের ব্যবসা গুলোর ভাগ নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে দ্বন্ধ শুরু হয়।

১৯৯০ সালের কিছু আগে থেকে আকবর এলাকায় গরুর হাটের কন্ট্রোল নেয়। ৯১ সালে এই হাট সংক্রান্ত একটা বিষয়ে বাজারে সবার সামনেই আকবর শেঠ আলীজানকে গালিগালাজ করে।

এর মধ্যে আকবরের এক বোনের সাথে আলীজানের অবৈধ সম্পর্ক আছে জানতে পেরে রাস্তায় সবার সামনেই আলীজানকে থাপ্পড় মারে। এই ঘটনায় আলীজান রেগে এলাকা ত্যাগ করে।

সাথে সাথে আকবরের দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এতোদিন দলের মধ্যে যারা আকবর শেঠের বিরুদ্ধে কোন শব্দ করার সাহস পেতনা- ওরা আলীজানের সাথে ভিড়ে যায়। আর আলীজানের কান গরম করতে থাকে।
আলীজানের ভাতিজা আসাদ সহ ওর বন্ধুরা আলীজানকে বিভিন্নভাবে ফুসলাতে শুরু করে। যেন সে আকবর শেঠকে আলীজানের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এত বছরের সম্পর্ক আলীজান অস্বীকার করতে পারেনি।

কয়েকদিনের মধ্যে আলীজানের কাছে চিরকুট আসে। আকবর শেঠ বৈঠকে ডেকেছে। আলীজান তৈরী হয়েই গিয়েছিল।যেন আকবর শেঠ কো পাতে আসলে সেও পালটা আক্র মণ করতে পারে। কিন্তু বৈঠকে তেমন কিছুই করলনা আকবর শেঠ। আলীজানকে বিশহাজার টাকা দিল ক্ষতিপুরণ হিসেবে।

আকবর শেঠ ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করতে চাইল। কিন্তু আলীজানের চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের বারুদ। অপেক্ষাতেই ছিল সে। কিছুই না বলে সে বৈঠক ত্যাগ করল বটে। কিন্তু অপেক্ষা করতে শুরু করল সঠিক সময়ের।

১৯৯১ সালের ১৩ আগষ্ট আকবর শেঠ বন্ধু সুলতানকে নিয়ে রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘পারভেজ ট্রান্সপোর্ট’ এর অফিস থেকে ফিরছিল।

রিকশায় করে আসার পথে অন্ধকার গলিতে ওঁত পেতে ছিল আলীজান, নাইম, ফজলু, পারভেজ সহ আরো কয়েকজন। সবাই ছিল আকবরের দলের লোক।

কিন্তু আজকে ওরা আকবরকে শেষ করতে চায়। তাই অতর্কিত আ ক্রমণ করে ওরা। আকবর হতবিহবল হয়ে পড়ে। রিকশার পেছন থেকে আক্রমণ করে আলীজান।

চাপাতির আঘাতে আকবরের ঘাড় থেকে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। সুলতানের শরীর থেকেও রক্ত ঝরছে। কোনরকমে খুড়িয়ে পালায় সে। নইলে সেও মরতে পারতো। কিন্তু বন্ধুকে রেখে আসতেই হল- প্রাণের মায়া বলে কথা।

আকবর পড়ে গেল রিকশা থেকে। আকবরকে আততায়ীরা আকবরের স্টাইলেই মারতে শুরু করে। প্রথমে বুকে কোপায়। এরপর গলায় ছুরি চালায়। আলীজান খুব কাছ থেকে বুকের ওপর উঠে দুই রাউন্ড গুলি করে। এরপর ফাঁকা গুলি করতে করতে পালায়। আকবর শেঠের শেষ সেখানেই।

আকবরের খুনীরা পরবর্তীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল। আলীজান শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জেলেই ছিল। ফজলু জেলখানায় মারা গিয়েছিল। ভাতিজা আসাদ এখন ইতালিতে পলাতক।

আকবর শেঠকে ওরা খুন করতে পারলেও আকবর শেঠকে ওরা লিজেন্ড বানিয়ে দিয়েছিল। পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে এখনো আকবর শেঠের গল্প শোনা যায়। ওর নামে একটা সিনেমা ও বের হয়েছিল 'আকবর শেঠ' নামে।
অনেকেই বলেন- ওর কোন অস্ত্রের প্রয়োজন হত না। ওর কণ্ঠ শুনলেই সবাই ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলতো।
তথ্যসূত্রঃ আমাদের সময়, বিভিন্ন ব্লগ ও ইন্টারনেট।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সমগ্রঃ পর্ব ২

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



আকবর শেঠ।



'বৈঠকি খুনের জনক' আকবর শেঠ এর জন্ম ১৯৫০ এর দশকে। আকবরের প্রথমদিককার জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। আকবর শেঠ প্রথম লাইমলাইটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিব হল → ওসমান হাদি হল: নতুন বাংলাদেশের শুরু ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে ডাকসু নেতারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি‼️রবিন্দ্র নাথ সঠিক ছিলেন বঙ্গবন্ধু ভুল ছিলেন। বাঙালি আজও অমানুষ!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:১৩


১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের জনগন সহ সমগ্র বিশ্বের প্রতি যে নির্দেশনা। তা এই ভাষণে প্রতিটি ছত্রে ছত্রে রচিত করেছিলেন। ৭ই মার্চের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ভাষণের নির্দেশনাগুলো! কি অবলীলায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মের শুভেচ্ছা হে রিদ্ধী প্রিয়া

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:০১



জন্মের শুভেচ্ছা নিও হাজার ফুলের
শৌরভে হে রিদ্ধী প্রিয়া, তোমার সময়
কাটুক আনন্দে চির।স্মৃতির সঞ্চয়
তোমার নিখাঁদ থাক সারাটা জীবন।
শোভাতে বিমুগ্ধ আমি তোমার চুলের
যখন ওগুলো দোলে চিত্তাকর্ষ হয়
তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

=হাঁটি, আমি হাঁটি রোজ সকালে-মনের আনন্দে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

রোজ সকালে খুব হাঁটার অভ্যাস আমার, সকালটা আমার জন্য আল্লাহর দেয়া অনন্য নিয়ামত। হাঁটা এমন অভ্যাস হয়েছে যে, না হাঁটলে মনে হয় -কী যেন করি নাই, কী যেন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×