
ছবিসূত্র
আমার কিছু বলার আছে - কারণ আমি আমার মায়ের মেয়ে, এবং বুক চিতিয়ে কাঁধ সোজা করে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো বলার গভীর প্রয়োজন এই মুহূর্তে আমি বোধ করছি। সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করতে চলেছে যে যুদ্ধ, সে সম্পর্কেই এটা একটি ছোট বক্তব্য। আমি জানি আজ আমরা এখানে Mother Mary Comes to Me (অরুন্ধতী রয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত আত্মজৈবনিক বই) নিয়ে কথা বলতে এসেছি। কিন্তু তেহরান, ইসফাহান এবং বৈরুতের মতো কাব্যিক সুন্দর শহরগুলো, যারা আজ আগুনে জ্বলছে, তাদের সম্পূর্ণ উহ্য রেখে আমরা কীভাবে এই আলাপ শেষ করতে পারি?
আমার মা মেরির স্পষ্টবাদিতা এবং রাখঢাকহীন দুঃসাহসকে চেতনায় ধারণ করে আমি এই মঞ্চকে ব্যবহার করতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর চালানো উসকানিবিহীন এবং বেআইনি আক্রমণ সম্পর্কে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য। ইজরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা নিঃসন্দেহে গাজায় তাদের চলমান গণহত্যারই ধারাবাহিকতা। তাদের কৌশল পুরনো, নকশাও বহুল ব্যবহৃত - নারী ও শিশুদের হত্যা করা, হাসপাতাল বোমা মারা, শহরজুড়ে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করা, তারপর আবার নিজেদেরই ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা।
কিন্তু ইরান গাজা নয়।
এই নতুন যুদ্ধের মঞ্চ এমনভাবে বিস্তৃত হতে পারে, যা হয়তো গোটা বিশ্বকেই গ্রাস করে ফেলবে। আমরা সামগ্রিকভাবে পারমাণবিক বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। যে দেশ একদিন হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলেছিল, সেই দেশই এখন হয়তো পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটির ওপর বোমা ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বলার আরও অনেক সুযোগ আসবে। তাই এখানে আমি শুধু এতটুকু বলব - আমি দ্বিধাহীনভাবে ইরানের পাশে দাঁড়াচ্ছি। যেসব দেশে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন - যেমন কি নাঃ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং আমাদের নিজেদের দেশ ভারত - সেগুলোর শাসনক্ষমতার পরিবর্তন জনগণকেই করতে হবে। কোনো ফাঁপা, মিথ্যাবাদী, প্রতারক, লুম্পেন, সম্পদ-লুটকারী, বোমা ফেলতে থাকা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তার মিত্রদের দ্বারা নয়, যারা পুরো পৃথিবীকে জোর করে বশ্যতা স্বীকার করাতে চাইছে।
ইরান সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সম্মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করছে, আর ভারত ভয়ে জড়ভরত হয়ে আছে। আমাদের সরকার যে কতটা ভীরু এবং মেরুদণ্ডহীন আচরণ করেছে, তা ভেবে আমি লজ্জিত। এক সময় আমরা ছিলাম গরিব মানুষের একটি গরিব দেশ - কিন্তু আমাদের ছিল গর্ব, ছিল মর্যাদা। আজ আমরা একটি ধনী দেশ, যেখানে অসংখ্য মানুষ দরিদ্র ও বেকার; আর তাদের প্রকৃত খাবারের বদলে খাওয়ানো হচ্ছে ঘৃণা, বিষ আর মিথ্যার খাদ্য। আমরা আমাদের গর্ব হারিয়েছি, মর্যাদা হারিয়েছি, সাহস হারিয়েছি - শুধু বলিউডের সিনেমা ছাড়া আর কোথাও এসবের দেখা মেলে না।
আমরা কী ধরনের জীবে পরিণত হয়েছি যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের নির্বাচিত সরকার, তাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের অপহরণ ও হত্যার মতো ঘটনা সংঘটিত করলেও আমরা এই অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিন্দাজ্ঞাপনের মতো সামান্য কাজটুকু করতে পারে না? আমরা কি চাই এমনটা আমাদের সঙ্গেও ঘটুক? আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইরানে হামলার ঠিক কয়েক দিন আগে ইসরায়েলে গিয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করেছেন। এর অর্থ কী? আমাদের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক লজ্জাজনক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা কার্যত আমাদের কৃষিখাত এবং বস্ত্রশিল্পকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এটা কিসের ইঙ্গিত দেয়, বিশেষ করে যখন কয়েক দিন পরই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে?
এখন আমাদের রাশিয়া থেকে তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটাই বা কেমন প্রহসন? আর কী কী করবার জন্য আমাদের অ্যামেরিকার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে? বাথরুমে যাওয়ার জন্য? একদিন ছুটি নেওয়ার জন্য? আমাদের মায়েদের দেখতে যাওয়ার জন্য? প্রতিদিন মার্কিন রাজনীতিবিদেরা, ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ, প্রকাশ্যে আমাদের উপহাস ও অপমান করেন; আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সেই বিখ্যাত অন্তঃসার শূন্য ফাঁপা হাসি হাসেন এবং অপমানকারীকে আলিঙ্গন করে চলেন।
গাজায় গণহত্যা যখন চরমে, তখন ভারতের সরকার হাজার হাজার দরিদ্র ভারতীয় শ্রমিককে ইসরায়েলে পাঠিয়েছিল, বহিষ্কৃত ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের জায়গা পূরণ করতে। আজ যখন ইসরায়েলিরা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে, তখন খবর আসছে যে সেই ভারতীয় শ্রমিকদের সেই আশ্রয়কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এর মানে কী? আমাদের কে এমন অপমানজনক, লজ্জাজনক, ঘৃণ্য অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে গোটা পৃথিবীর সামনে?
আপনাদের অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, আমরা একসময় চীনা কমিউনিস্টদের বাজারে ছড়িয়ে দেয়া শব্দবন্ধ - 'running dog of imperialism.' বা‘সাম্রাজ্যবাদের পিছে দৌড়ে চলা কুকুর’ নিয়ে হাসাহাসি করতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শব্দটি আমাদের ক্ষেত্রেই ঠিক মানানসই—অবশ্য আমাদের বিকৃত, বিষাক্ত সিনেমাগুলো বাদ দিলে। সেখানে সেলুলয়েডের নায়কেরা বুক ফুলিয়ে হাঁটে, ফাঁপা পেশীশক্তির প্রয়োগে একের পর এক কাল্পনিক যুদ্ধ জিতে যায়, এবং মাথা ভর্তি গোবর ও সহিংসতার প্রতি বেকুবের মতো আগ্রহ থেকে আমাদের অদম্য রক্তপিপাসাকে আরও উসকে দেয়।
(সম্প্রতি ভারতের বুকার প্রাইজ বিজয়ী ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রয় তার নতুন আত্মজৈবনিক - 'মাদার মেরি কামস টু মি' এর প্রচারণায় ভারতের হরিয়ানা প্রদেশের অঙ্গরাজ্য গুরগাও এ গিয়েছিলেন। সেখানে, নিজের বক্তব্যের সময় বই নিয়ে কথা বলার বদলে তিনি ইরান ও তার ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি ইজ্রায়েল ও অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। ইউটিউব থেকে ভাষণটি শোনার পরই আমার মনে হয়েছিল, এটার বঙ্গানুবাদ করে ফেলা দরকার। পাঁচ মিনিটের ছোট ইংরেজি ক্লিপটির বাংলা সংস্করন, আমার এই লেখাতে পাবেন। মূল বক্তব্য শুনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন )
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

