নতুন বছরের শুরুতেই রাজধানীতে ভাড়াটিয়াদের ওপর নেমে এসেছে বাড়িভাড়ার খড়গ। অধিকাংশ বাড়িওয়ালাই ইতোমধ্যে বর্ধিত ভাড়ার স্লিপ ভাড়াটিয়াদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। বাসাভেদে এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে ভাড়া। গত কয়েক বছর ধরেই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ত্রুটিপূর্ণ আইন সংশোধন করে ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) কোনো দায়িত্ব নেই অজুহাতে এ ব্যাপারে এই সংস্থাটির পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
জানা গেছে, মাসিক আট থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়ার বাসার ক্ষেত্রেই এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই স্তরের বাসার অধিকাংশেরই প্রতি বছর এই হারে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কোনো কোনো বাড়িওয়ালা বছরের মাঝামাঝি সময়েও ভাড়া বৃদ্ধি করছে। এর ওপরের ভাড়াবাড়ির ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হারও নানা রকম।
মূলত বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এখন ভাড়াটিয়াদের জন্য আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছরই বাড়িভাড়া গড়ে ১৬ শতাংশ বাড়ছে। গত পাঁচ-ছয় বছরে অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। যে বাড়ির ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা ছিল এখন তা ১২ হাজার টাকার ওপরে। ভাড়া নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ না থাকায় যে যেভাবে পারছে ইচ্ছেমতো ভাড়া নির্ধারণ করছে। ২৩ বছর আগে পাস হওয়া একটি ত্রুটিপূর্ণ আইন থাকলেও সেটির প্রয়োগ না থাকায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এখন বাড়িওয়ালাদের খেয়ালি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাধ্য হয়েই রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত, গার্মেন্ট শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষকে তাদের কষ্টার্জিত আয়ের বেশির ভাগই বাড়িভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব মানুষ এক অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে বাড়িভাড়া গড়ে বেড়েছে ১৫.৮৩%। ওই প্রতিবেদনে পাকা, আধা পাকা, মেস রুম ও বস্তিÑ এই চার শ্রেণীর বাড়ির দুই রুমের ভাড়ার তুলনামূলক চিত্র উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে, এক বছরে পাকা বাড়ির ১৩.২৭%, আধাপাকা বাড়ির ১৪.৭১%, মেস রুমের ১৭.৩৯% ও বস্তির ১৭.৯৫% ভাড়া বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে ১৫%, ২০০৮ সালে ২১%, ২০০৭ সালে ২২% ও ২০০৬ সালে ১৪% বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পায়।
বাড়িভাড়ার নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধির বিপরীতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে একটি আইন রয়েছে। অধ্যাদেশের আলোকে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটি পাস হয় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। কিন্তু ২৩ বছরে আইনটি কার্যকর কিংবা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার এটি আইনে উল্লেখ না থাকায় এ ব্যাপারে কেউই উদ্যোগী হয় না।
ওই আইনে ভাড়া নিয়ন্ত্রণে ‘নিয়ন্ত্রক’ নিয়োগের একটি বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রক নিয়োগ করা হয়েছে বা কোনো সংস্থাকে নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ (ডিসিসি) সংশ্লিষ্ট কেউ জানে না।
ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে ৮৫ ভাগ মানুষ ভাড়া বাড়িতে থাকে। ৫ ভাগ মানুষ বসবাস করে নিজ বাড়িতে এরা কাউকে ভাড়া দেয় না। কারো কাছ থেকে ভাড়াও পাচ্ছে না। আর বাকী ১০ ভাগ মানুষ ৮৫ ভাগ মানুষের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে। আর এই দশ ভাগ মানুষের কাছে মহানগরীর ৮৫ ভাগ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকে। সরকার ৮৫ ভাগ মানুষের জন্য এ পর্যন্ত কার্যকর কিছু করতে পারেনি।
বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির যুক্তি হিসাবে বাড়ির মালিকরা সরকারি ও সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স বাড়ানোর উদাহরণ দেয়। কিন্তু যে ট্যাক্স দিতে হয় তা খুবই সামান্য। এবং গত দুই দশক ধরে বাড়ানোও হয়নি। এমনকি বাড়ি ভাড়া আয় থেকে মালিকদের যে ট্যাক্স সরকারকে দিতে হয় তাও সরকার গত ২২ বছরে আদায় করেনি বলে এক জাতীয় দৈনিকে কয়েক মাস আগে রিপোর্ট বেরিয়েছে।
সব যন্ত্রণারই ওষুধ আছে দেখা যায়। কিন্তু এ যন্ত্রণা উপশমের কি কোন ব্যবস্থা নেই? বাড়ি ভাড়া দেবার ব্যবস্থা চালু আছে এমন সব দেশেই বাড়িভাড়া সংক্রান্ত সব যন্ত্রণা উপশমের ওষুধ রয়েছে। ওষুধটি হচ্ছে নিয়মবিধি, শৃঙ্খলা তথা আইন। সেটা আমাদের দেশে যে নেই তা কিন্তু নয়। আইন কিছু না কিছু এখানেও আছে। তবে সেসব লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ, বাস্তব প্রয়োগে নেই বললেই সম্ভবত ঠিক বলা হয়।
রাজধানীতে বাড়িভাড়ার যেন বাবা-মা নেই। বাড়িভাড়ার এই বাবা-মাহীন অবস্থা ঘোচানো হাজার হাজার পরিবারের জন্য অতি জরুরী। এজন্য প্রয়োজন বাড়ি ভাড়া আইন পুরোপুরি কার্যকর করার কর্তৃপক্ষীয় ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে চাই নতুন আইন।
মূলতঃ সব সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা তথা সততা।
পণ্য দ্রব্যের চেয়েও ঊর্ধ্বগতিতে বাড়ছে বাড়িভাড়া। চলছে যখন তখন বাড়ি ছাড়ার বেআইনী নোটিশের যন্ত্রণা। অথচ রাজধানীর বাসিন্দাদের ৮৫ ভাগই ভাড়াটিয়া। কিন্তু তাদের সমস্যার প্রতি সরকারের সহানুভূতির এবং অনিবার্য সহযোগিতার দৃষ্টি নেই কেন?
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত
জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।
ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন
দায়বদ্ধতা: আমরা সবাই ইনসাফের লোক—যতক্ষণ না নিজের স্বার্থ ছাড়ার প্রশ্ন আসে!
একজন মানুষ অসুস্থ বোধ করছেন। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাতর কণ্ঠে বলছেন, একটু বসতে দেবেন? শরীরটা ভালো লাগছে না। আশপাশে মানুষ আছে, আসন আছে, চলমান ট্রেন আছে—শুধু তাঁর জন্য একটু জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এক্সিট পোল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন ৬১টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট, প্রায় ৫১–৫২ আসন।
গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট: প্রায় ৪৯–৫১ আসন... ...বাকিটুকু পড়ুন
এক সেকেন্ডের নেই ভরসা

সংসারের শত দায়িত্ব কাঁধে। ধাপে ধাপে সব পালন করতে হবে। মোটরসাইকেল নিয়ে ভালো মনে রাস্তায় নামলেন রাইড শেয়ার করবেন বলে। হঠাৎ একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা লাগল। আপনি রাস্তায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
অসমাপ্ত নীহারিকা - কেয়া ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে দেখলে মানুষের প্রথম যে কথাটা মনে হতো, তা হলো—ছেলেটার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে।
কালো জিনস। কালো টি-শার্ট। টি-শার্টে কখনো Behemoth, কখনো Slayer, কখনো Cannibal Corpse। কানে হেডফোন। চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।