
জামায়াতে ইসলামীকে আমি এখন নতুন চোখে দেখি। মানুষ ভুল করতেই পারে, ইতিহাসে ছোটখাটো কিছু ভুল তো সবারই থাকে। যেমন ধরুন, একটা দেশের জন্মের বিরোধিতা করা, সেটাকে ভেঙে দিতে চাওয়া, বা সেই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সন্দেহের চোখে দেখা। এগুলো আসলে যৌবনের আবেগ, রাজনৈতিক হরমোনের সমস্যা। বয়স বাড়লে মানুষ যেমন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনে, তেমনি দলও নিজেদের অতীত নিয়ন্ত্রণে আনে। তাই যখন দেখি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত চান, তখন মনে হয়, ইতিহাস সত্যিই ক্ষমাশীল, বিশেষত যখন ইতিহাস লেখার সুযোগ হাতের কাছে থাকে।
একই দৃশ্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারেক রহমান। তাঁকে দেখে আমার আরও আশা জাগে। কারণ ইতিহাসে আমরা জানি, জাতীয় প্রতীকের অর্থ সময়ের সঙ্গে evolve করে। একসময় শহীদ মিনারে শুধু ফুল দেওয়া হতো, এখন সেখানে দোয়া হচ্ছে। এটাকে আমি সাংস্কৃতিক আপগ্রেড বলি। ফুল তো নীরব জিনিস, কিন্তু দোয়া শব্দ করে। ফলে শহীদরা হয়তো এখন পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন যে রাজনীতির মঞ্চে তাঁদের নাম কতটা দরকারি।
আমাদের secular সমাজের পরিপক্কতাও আমাকে মুগ্ধ করে। একসময় তারা খুবই অপরিণত ছিল। যেমন ধরুন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন ভাষা দিবসে শহীদ মিনারে দোয়া ও জেয়াফত ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখন তারা অকারণে হৈচৈ করেছিল। রাস্তায় নেমে পড়েছিল, বিবৃতি দিয়েছিল, প্রতীকের চরিত্র নিয়ে তর্ক করেছিল। কী ভয়ানক অস্থিরতা! এখন তারা অনেক mature। এখন তারা বোঝে, ইতিহাসকে বাধা দেওয়া উচিত নয়, ইতিহাস নিজেই ধীরে ধীরে নিজের অর্থ বদলায়। তাই এবার তারা চুপ থেকেছে, নীরবতা দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা জাতির আছে।
আমি কখনো কখনো কল্পনা করি, ১৯৭১ সালে যারা ভাষা, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার ধারণাকে বিপজ্জনক বলে মনে করেছিল, তারা আজ সেই ভাষার শহীদদের জন্য মাগফেরাত চাইছে। এটা নিঃস্বার্থ বিবেকের জাগরণ, যে জাগরণ কাকতালীয়ভাবে সবসময় নির্বাচনী মৌসুমে আসে, ঠিক যেমন আম আসে বৈশাখে।
সবচেয়ে ভালো লাগে secular দের নীরব সমর্থন। তারা এবার বুঝেছে, প্রতীকের পাহারা দিয়ে লাভ নেই, প্রতীক নিজেই তার মালিক খুঁজে নেয়। একসময় তারা ভাবত শহীদ মিনার সবার। এখন তারা দেখছে, "সবার" মানে আসলে "যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।" এই উপলব্ধি খুব উচ্চস্তরের রাজনৈতিক জ্ঞান। তাই তারা আর রাস্তায় নামে না, বরং ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিকে সম্মান জানিয়ে সোফায় বসে থাকে। এটাকে আমি জাতির পরিণত বয়সের লক্ষণ বলি।
ফেব্রুয়ারির আকাশ থেকে হয়তো রফিক, জব্বার, বরকত, সালামরা সব দেখছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই স্বস্তি পাচ্ছেন যে তাঁদের স্মৃতি এখন অনেক বেশি কার্যকর, শুধু ফুলে নয়, বক্তৃতায়, দোয়ায়, এবং ক্ষমতার রাজনীতির সূক্ষ্ম হিসাবেও তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। একটা স্বপ্ন যখন এতভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হয় সেটি সত্যিই সফল হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



