
আমি আপনার বিষয়টা বুঝতে পারছি ফাদার জন।আসলে মানুষকেই দোষারোপ করে কি লাভ ? চোখে না দেখা জিনিস গুলো আমরা অনেক সময়ে বিশ্বাস করতে চাই না কিন্তু ওটাই সত্যি হয়। যেমন আমার কথা কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না” রুক্ষ কন্ঠে বলল সাতোশি
“ফাদার হওয়ার পর থেকে এই রকম অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি।বলতে পারো আমার জীবনের সূচনা হয়েছে এইসব ঘটনা দিয়ে।এমনকি আমার ভাইকে হারালাম এভাবেই।” বিষন্ন মনে বলল ফাদার জন
“আপনার ভাইয়ের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?” জিজ্ঞেস করল সোফিয়া
“আমার বাবার সাথে শত্রুতা ছিল এক লোকের।সেই আমার ভাইয়ের উপর কালো জাদু করে।সেই জাদু যেটা সেই চার বছরের ছোট্ট ছেলেকে নরকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।সেই সময় অবশ্য আমি ফাদার ছিলাম না। তবে বেচারা ছোট্ট ছেলেটা অন্য আরেকজনে অভিশাপের বলি হলো।” বলল ফাদার জন
“কিসের অভিশাপ?” জিজ্ঞেস করল সোফিয়া
“লামিয়ার অভিশাপ। লামিয়ার মাধ্যমে এক ধরনের ভয়ংকর কালো জাদু করা হয়। এই জাদু এতটাই ভয়াবহ হয়ে থাকে যে জাদুকরকে তার প্রাণের বিনিময়ে এই জাদু কার্যকর করতে হয়।সহজ ভাষায় বলতে গেলে জাদুকর সফল না হলে সে মারা যাবে। এছাড়া আরও অনেক কঠিন কঠিন শর্ত মানতে হয়।যেমন সাতটা নদী ও সাতটা পুকুরের পানি সংগ্রহ করতে হবে। এবং ওই সকল জায়গায় একটা বিশেষ রিচুয়াল পারফর্ম করতে হবে। সবগুলো সফল হলে অন্তিত কাজ।সেটা হলো জাদুকর নিজের জীবন উৎসর্গ করা। এরপর লামিয়ার অভিশাপ যার উপর পড়েছে সে যদি বেঁচে যায় জাদুকর মারা যাবে।এই জাদু নষ্ট করার কোনো উপায় নেই বললেই চলে। যার উপর কালো জাদু করা হয়, লামিয়া তাকে অল্প কিছু দিনের মধ্যে মেরে ফেলে এবং তার আত্মাকে নরকে বন্দি করে রাখে চিরকালের জন্য।এই জাদু থেকে বাঁচার তেমন কোনো উপায় নেই। একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। তবে সেগুলো খুব কঠিন। সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তোমার অভিশাপ অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া।” বলল জন।
“নিজের অভিশাপ আরেকজন কে কিভাবে দিবে ?” জিজ্ঞেস করল সোফিয়া
“ একটু আগে শোনা সেই ঘটনার কথা মনে আছে।সেই চার বছরের ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটা।তার উপর কিন্তু জাদু করা হয়নি। হয়েছে সেই পরিবারের উপর যার থেকে সে পুতুল টা নিয়ে আসে। এইজন্য পরবর্তীতে ওরা পুতুল গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বাচ্চা ছেলেটা নিজের থেকে পুতুল আনার মাধ্যমে নিজের কাছে অভিশাপ টেনে আনে এবং মারা যায়। মৃত্যুর পর আমার রুমের ফ্লোরে পুতুল টা পড়ে ছিল।সেই পুতুলের ভেতর থেকে কালো জাদুর অনেক জিনিস বেরিয়ে আসে।পরে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়।কারন এই পুতুল যদি আবারো কেউ নেয় সে নিজেও এই অভিশাপের কবলে পড়ে যাবে। ” বলল জন
“এই জাদু কি পুরো পরিবারকে শেষ করে দেয়? জিজ্ঞেস করল সোফিয়া
“না। একজনের উপর করলে একজন মারা যাবে। আর পুরো পরিবারের উপর করলে পুরো পরিবার মারা যাবে” বলল জন
“আচ্ছা এই লামিয়া কে ?” জিজ্ঞেস করল সাতোশি
“গ্রিক পুরাণের লামিয়া এক ধরনের দানবী বা আত্মা বলে পরিচিত করানো হয়েছে।লামিয়া ছিল লিবিয়ার এক সুন্দরী রাণী, যার সৌন্দর্যের জন্য দেবতা জিউস তার প্রতি আকৃষ্ট হন। এরপর জিউস ও লামিয়ার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, কিন্তু লামিয়া ও জিউসের প্রেম দেখে জিউসের স্ত্রী হেরা ক্রোধান্বিত হন।হেরা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য লামিয়ার সব সন্তানকে হত্যা করেন।কারো মতে হেরা লামিয়াকে তার সন্তানদের খেয়ে ফেলার জন্য উন্মাদ করে তোলেন।সন্তান হারানোর শোকে পাগল হয়ে লামিয়া এক দানবীতে পরিণত হয় এবং অন্য শিশুদের হত্যা করতে শুরু করে।ইসলামী লোককথায় লামিয়া মধ্যপ্রাচ্য বা আরবীয় লোককথায় লামিয়া নামে কোনো জ্বিন বা আত্মা। সে নারী আকৃতির হয় এবং মানুষকে প্রলুব্ধ করে বিপদে ফেলে। তবে যে যেটাই মানুষ না কেন সবচেয়ে বড় বিষয় হলো লামিয়া এক ভয়ংকর ডিমন বা প্রেতাত্মা যে বাচ্চা ছেলে , মেয়ে ও মানুষের আত্মা ভক্ষন করে।ও বাচ্চা ছেলে মেয়েদের বেশি পছন্দ করে। মৃত্যু পর মানুষের আত্মা কে ও নরকে নিয়ে যায় এবং ভক্ষন করে।কেউ কেউ বলে নরকে অনেক যন্ত্রনা দেয় ওইসব আত্মাদের।” বলল জন
"বুঝতে পারলাম" একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল সোফিয়া।
“আপনারা আমার কাছে কেন এসেছেন জানাই হলো না। আমাকে বিস্তারিত খুলে বলুন” জিজ্ঞেস করল জন
“ঘটনা অনেক বিশাল। আপনাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলতে হবে। তাহলে আপনি সবকিছু বুঝতে পারবেন।এত কিছু শোনার সময় হবে আপনার?” জিজ্ঞেস করল সাতোশি
“অবশ্যই” বলল জন
“আপনি কি আবার লামিয়ার সঙ্গে মুখোমুখি হতে চান?” জিজ্ঞেস করল সোফিয়া
“যদি সুযোগ হয় তবে অবশ্যই। আমার অনেক দিনের জেদ ওকে হারিয়ে দেয়া কিংবা শেষ করে দেয়া যেটাই বলো তোমরা। তুমি কেন এসেছ সেটা বলো” বলল জন
সোফিয়া তার পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা শেয়ার করতে লাগলো।
২.
বর্ষাকাল
বৃষ্টির প্রবল ছাঁট গাড়ির সামনের উইন্ডস্ক্রিনের ওপর আছড়ে পড়ে পরক্ষণেই দরদর ধারায় গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে কাঁচ বেয়ে। সত্যিই, আবহাওয়ার মর্জি বোঝা ভার ! বাড়ির বাইরে যখন সারা আর রেবেকা তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসেছিল তখনো আবহাওয়া চমৎকার ছিল। কিন্তু গাড়ি স্টার্ট দেবার পর যত তারা পথ অতিক্রম করতে লাগল, ততই হঠাৎ করে আকাশের মুখ ভার হতে শুরু করল। ভেজা কংক্রিটের রাস্তার দু'পাশের গাছগুলো ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে। রাস্তাটা ক্রমেই অজগর সাপের মতো পাক খেয়ে খেয়ে ক্রমশ পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরের দিকে উঠছে। হঠাৎ হঠাৎ করে রাস্তাটা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে, মনে হচ্ছে যেন এবার গাড়ি থামিয়ে পায়ে হেঁটে ওপরে উঠতে হবে। কিন্তু এটা ভাবতে না ভাবতেই তারপরই আবার চোখের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে চকচকে পাকানো রাস্তাটা।
সারা ও রেবেকা তাদের বাবা স্টিফেনের কাছে অবশ্য এমন দিনে এইরকম পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো ডালভাত। সুদক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ধরে তিনি গাড়িটাকে ড্রাইভ করে নিয়ে চলেছেন। ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসে রয়েছে স্টিফেনের স্ত্রী সোফিয়া।গাড়ির পিছনের সিটে বসে আছে সারা ও রেবেকা ও তাদের আংকেল সাতোশি। সাতোশি সম্পর্কে সোফিয়ার ভাই।উৎসুক দৃষ্টিতে পথের দু'পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে পেছনে চলে যাওয়া পাইন গাছগুলোকে দেখছে সারা। অন্যদিকে রেবেকার বেশ মন খারাপ। তাদের নতুন বাড়িতে শিফট হওয়া নিয়ে তার মন ভালো নেই। রেবেকা চাইছে না তাদের পুরনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে যেতে।তার সব বন্ধুরা পুরনো শহরেই রয়ে গেছে। নতুন শহরে গেলে সে সম্পুর্ণ একা হয়ে পড়বে। রেবেকা কোলের ওপর একটা বই খুলে রেখে তাতে মুখ ডুবিয়ে আছে, যদিও তার মনোযোগ বইয়ের দিকে আছে বলে মনে হচ্ছে না।
".....জানো বাড়িটা অনেক বড়।একদম রাজপ্রাসাদের মতো।এত বড় বাড়িটা আমরা এত সস্তায় পেয়ে গেলাম।এত বড় বাড়ি আমরা সবাই এতদিন চেয়েছিলাম।দেখবে তোমার ওখানে অনেক ভালো সময় কাটবে" রেবেকা কে উদ্দেশ্য করে বলল সোফিয়া
“আমার তো সেটা মনে হয় না” মন খারাপ করে বলল রেবেকা
“ একদমই না সোনা, বড় বাড়িতে আমরা বেশ ভালো সময় কাটাবো” হঠাৎ রাস্তার একটা বাঁকে গাড়িটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন স্টিফেন
গাড়িটা আকস্মিকভাবে বাঁক নেওয়ায় গাড়ির দরজার ওপর প্রায় হেলে পড়েছিল সোফিয়া সহ পিছনের সিটে বসে থাকা সারা , রেবেকা ও সাতোশি। নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিকঠাকভাবে গাড়ির সিটে বসল ওরা চারজন।
“তোমার উচিত ছিল সিটবেল্ট বাঁধা।” বলল স্টিফেন
".....জায়গাটা নতুন হলেও অনেক বেশী মজা আর হৈ-হুল্লোড়ে তোমাদের কেটে যাবে বলে আমি মনে করি। তাছাড়া আমি তো থাকবোই তোমাদের সঙ্গে", বললেন সাতোশি
"....সত্যিই তাই হবে। আমি ওখানে বোরিং সময় কাটাতে চাই না", ছোট্ট করে বলল রেবেকা। রেবেকা তার আংকেল কে বেশ পছন্দ করে। তাদের আংকেল ছোট বেলা থেকেই তাদের সঙ্গে আছে। সাতোশি সারা ও রেবেকার সঙ্গে একদম বন্ধুর মতো আচরণ করে।
দুই ঘণ্টা পর। গাছগাছালিতে ঘেরা একটা সরু ড্রাইভওয়েতে গাড়িটা ঘোরাতে ঘোরাতে লাগল স্টিফেন।তাঁর দৃষ্টি অদূরে একটা কাঠের লেটার বক্সের ওপর। তারপরেই সোল্লাসে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ, এই তো সেই নম্বর। আমাদের বাড়ি এসে গেছে।"
বলতে বলতে বড় বড় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছের ছায়ায় ঢাকা ড্রাইভওয়েতে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়লেন স্টিফেন। বাড়িটা বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো হলেও জায়গাটা দেখেই কেন জানি রেবেকার ভালো লাগল না।ম্যাপল,ওক,পাইন অন্যান্য নানারকম জংলা গাছের জটলায় ভর্তি বাড়িটার আশপাশ। বোঝাই যাচ্ছে, বাগান পরিচর্যার জন্য কোনো মালী নেই।থাকবেই বা কি করে।এই বাড়িতে প্রায় শত বছর ধরে কোন মানুষের বসবাস নেই। স্টিফেন কিছু দিন আগে এসে বাড়িটা হাউজ হোল্ড হেল্পারদের দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিয়েছে।যাতে স্ত্রী ও সন্তানের নিয়ে বাড়িতে আসার পর কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়। তবুও কোথা থেকে একটা বিচ্ছিরি গন্ধে ওদের নাকে এসে লাগল। সম্ভবত বাগানে কোন পাহাড়ী জীবজন্তু মরে পচে আছে। তাছাড়া বাড়িতে এইসব গাছপালার বহুদিন ছাঁটাই করা হয় না। ফলে যত্রতত্রভাবে আর যেমন খুশিমতো গাছগাছালি বেড়ে উঠেছে। দিনের বেলাতেই জায়গাটায় ঘুপসি অন্ধকার হয়ে রয়েছে। বিশাল বাড়িটার আশেপাশেও প্রচুর বন্য লতাপাতা আর আগাছায় ভর্তি। নানা রঙের বাহারি বুনোফুল ফুটে রয়েছে। সমগ্র পরিবেশটায় দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলার ছাপ।দেখলেই বোঝা যায় বাড়িটায় শত বছর কোন মানুষ বসবাস করে নি।
সারা আর রেবেকা বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। তাদের পাশেই আরো অনেক গুলো বাড়ি আছে। তবে সেগুলো খুব বেশি পুরনো না।বছর দশেক হবে বানানো হয়েছে।
পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি বিশাল বাড়িটা বনের গাছপালার জটলা থেকে খুব সামান্যই দূরে। তবুও বেশ পরিস্কার আর পরিপাটি। নতুন রঙ সুর্যের আলোয় চকচক করছে। স্টিফেন বাড়িটা কেনার পর পুরনো বাড়িটা রঙ করে পরিষ্কার করে বাড়িটা একদম নতুন বানিয়ে ফেলেছে। রেবেকার অবশ্য এখন মন খারাপ নেই।বাড়িটা তার বেশ পছন্দ হয়েছে। এইরকম পুরনো ভুতুড়ে টাইপ বাড়ি তার ভালোই লাগে। রেবেকা তার বাবার মুখে শুনেছিল বাড়িটা বেশ বড়। তবে এক বড় হবে সে সেটা আশা করেনি।
বাড়ির পেছনেই খাড়া হয়ে উঠে গেছে বিশাল সাইজের পর্বতশ্রেণী, যা আকাশের অনেকখানি ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে।বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে কলিং বেল বাজাতেই একজন ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিল।
"......হ্যালো!"হঠাৎ এইসময় বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা।
“সারা ও রেবেকা উনি মিসেস ইলমা। আমাদের বাড়ির হাউজ হোল্ড হেল্পার। শুধুমাত্র তোমাদের দেখভাল করার জন্য উনাকে রাখা হয়েছে।তোমরা উনাকে আন্টি বলে ডাকবে” বলল সোফিয়া
রেবেকা বেশ রহস্যময় নজরে ইলমার দিকে তাকাল।মিসেস ইলমা খুব অল্প বয়সী।ওর চেহারা এবং সাজপোশাক কেমন যেন শহুরে বিজ্ঞাপনী চমকের মতো। এর একমাথা লম্বা, বাদামী রেশমি চুল একটা নীল চকচকে রিবন ফিতে দিয়ে মাথার পেছনে খোঁপা করা, পরনে চেক গাউন আর সাদা অ্যাপ্রন - যা বেশ মানানসই হয়েছে। সারা মুখে অজস্র ব্রণ, চোখদুটো তীক্ষ্ণ এবং উজ্জ্বল। রেবেকার মুখ দেখেই বোঝা যায় সে মিসেস ইলমাকে বিশেষ কারণে পছন্দ করেনি কিন্তু সোফিয়া তেমন কিছুই বলে না।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০২৫ সকাল ৯:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


