
".....এসো, তোমাদের জন্য রুম গুছিয়ে রেখেছি ", বলতে বলতে তাদের নিয়ে বাড়ির দরজার দিকে এগোলেন মিসেস ইলমা।পিছনে লাগেজ হাতে করে নিয়ে আসছে বাড়ির আরেকজন হাউজ হোল্ড হেল্পার রবার্ট। রবার্ট এই বাড়ির মালী হিসেবে কাজ করবে।যদিও বাড়ির বাগানটা এখনো অপরিষ্কার ও নোংরা অবস্থায় পড়ে আছে। রেবেকা বুঝতে পারছে না এখানে রবার্টের কাজটা আসলে কি! সে থাকায় পরেও পুরো বাড়ির বাগান টা নোংরা আর অপরিষ্কার অবস্থায় পরে রয়েছে। সারাদিন রবার্ট কী করে এটাও একটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রেবেকার কাছে। বাড়ির আরেক হাউজ হোল্ড হেল্পার হলো ন্যান্সি। ন্যান্সি বাড়ির যাবতীয় কাজে সোফিয়া কে সাহায্য করবে। ন্যান্সির সঙ্গে আছে ওর ছয় বছর বয়সী একজন ছেলে। ছেলেটি জন্মের পর থেকে হাঁটতে পারে না।হুইল চেয়ার করেই চলাফেরা করতে হয় ওর।
এই বাড়িতে এসে সোফিয়া বেশ খুশি।এত বড় বাড়ি।এত এত হাউজ হেল্পার।অথচ আগের ঘরটা কত ছোট ছিল আর বাড়ির সব কাজ তাকে একাই করতে হতো।এখন সেইসব ঝামেলা ওকে পোহাতে হবে না।
মিসেস ইলমা বললেন, "আশা করি ঘরটা তোমাদের পছন্দ হবে। আমি তোমাদের পছন্দ মতো এই ঘরটা সাজিয়ে রেখেছি। তোমরা দুই বোন এখানে ভালোভাবেই থাকতে পারবে। ঘরে একটা বড় জানালা আর বড় সাইজের বারান্দা আছে। ওখানে তোমাদের জন্য ফুল গাছের চারা রেখেছি।আর আছে একটা দোলনা। রবার্ট কে বলেছি বাগান টা পরিষ্কার করে নিতে। ওখানে তোমরা খেলাধুলা করতে পারবে। এছাড়া বাগানেও একটা দোলনার ব্যবস্থা করতে বলেছি।বুঝতে পারছি, তোমরা অনেকটা পথ জার্নি করে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ এখন হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হবে চলো।এরপর ঘুমোতে হবে।বাড়ি ঘুরে দেখার জন্য অনেক সময় পাবে। এখন থেকে তোমরা তো এই বাড়িতেই থাকবে "
“মিসেস ইলমা , শুনেছি এখানে একটা সুইমিং পুল আছে ।ওটা কোথায়?” জিজ্ঞেস করল সারা
“বাড়ির পিছনে।ওটা বেশ নোংরা। অনেক বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।” একটু ইতস্তত করে বলল ইলমা
“পরিষ্কার করিয়ে নিবেন। রবার্ট কে বলবেন পরিষ্কার করে দিতে” বলল সারা
“ওই সুইমিং পুল টা ভালো না। মানে গ্রামের মানুষ ওটা ব্যবহার করে না” বলল ইলমা
“গ্রামের মানুষ কেন ব্যবহার করবে? ওই পুলটা তো আমাদের।সবার ব্যবহারের জন্য বানানো হয়নি” জিজ্ঞেস করল রেবেকা । রেবেকা একটু বিরক্তির সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল।
“ওই পুলটা ভালো না।এই বাড়ির প্রথম মালিক একজন মহিলা ছিল। তার লাশ নাকি ওই পুলের মধ্যে পাওয়া যায়। এরপর থেকে ওই জায়গাটা ভুতুড়ে জায়গা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। ওখানে কেউ যায় না। প্রতি পুর্নিমার রাতে ওই পুলের মধ্যে শত শত সাপ দেখা যায়। সকালে আবার থাকে না। কোথায় যেন চলে যায়।তোমরা এই বাড়ির সব জায়গায় যেতে পারো। কিন্তু বাড়ির পিছনে কিংবা সুইমিং পুলের আছে যেও না” বলল ইলমা
“ঠিক আছে” বলল সারা
“তোমরা তাহলে বিশ্রাম নেও। আমি তোমার মায়ের কাছে যাচ্ছি। উনি নতুন বাড়িতে এসেছেন। উনার সাহায্য দরকার।” বলল ইলমা
ইলমা দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো।সারা আর রেবেকা দুইবোন ছুটে গেল বারান্দায়। বারান্দাটা বেশ বড়।বলতে গেলে পুরনো শহরে থাকা একটা ছোটখাটো বেডরুমের সাইজের মতো। বারান্দায় একটা বড় দোলনা রাখা আছে। বারান্দায় আরো ছিল একটা ছোট টেবিল ও দুটো চেয়ার। যেখানে বসে চা কফি খাওয়া যাবে।বেশ সুন্দর আর পরিপাটি করে এই বাড়িটা বানানো হয়েছে।মনে মনে বলল রেবেকা। সারার কাছে মনে হচ্ছে ও যেন কোন রাজকন্যা আর ওর বাবা ওদের জন্য একটা রাজপ্রাসাদ কিনেছে। প্রিন্সেসদের কাছে যেই রকম প্রাসাদ থাকে ঠিক সেইরকম।
৩. পূর্ণিমার রাত
আকাশে বড় থালার মতো চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। সারা ও রেবেকা দুজনে বারান্দায় বসে আছে।
“চলো, বাড়িটা ঘুরে দেখি। সারাদিন পার হয়ে গেল, এখনো একটা ঘরেই পড়ে আছি। এই বাড়িটা কিন্তু বিশাল বড় এবং সুন্দর,” বলল সারা। সারা তখনো জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে ওর বড় বোন রেবেকার দিকে তাকিয়ে আছে। রেবেকা কি বলে, সেটাই এখন তার শোনার অপেক্ষায়।
“চল, এখানে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। খুব বোরিং লাগছে,” উত্তর দিলো রেবেকা।
দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা লাগিয়ে বিশাল বাড়িটা ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লো। প্রশস্ত কাঠের মেঝেতে তাদের জুতোর ভারী শব্দ উঠল। সারা আর রেবেকা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোটা বাড়িটা দেখছিল। যতই দেখছে, দুজন ততই অবাক হচ্ছে। শত বছরের পুরনো একটা জমিদার বাড়িতে থাকছে তারা—ভাবতেই অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। ঘুরতে ঘুরতে একটা ঘরে এসে পৌঁছাল ওরা দুজন। সোনালি আর লাল রঙের ওয়াল পেপার লাগানো ঘরের দেয়ালগুলো হাত দিয়ে ছুয়ে স্পর্শ করে দেখছে সারা। পুরনো হওয়ার কারণে কিছু জায়গায় ওয়াল পেপার ছিঁড়ে গেছে। তার ভিতরে পুরনো খসখসে দেয়াল দেখা যাচ্ছে। দেয়ালের এক প্রান্তে একটা বিশাল সাইজের পেইন্টিং—একটা ফ্যামিলি ফটো। ফটো তে আছে একজন সুদর্শন পুরুষ ও তার সঙ্গে এক সুন্দরী রমণী। সম্ভবত ওরা দুজন স্বামী-স্ত্রী। দুজনেই ব্রিটিশ ডাক্তার ছিল। কোন এক সময় এই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এখানে এই বাড়িটা বানিয়েছে। লোকটির নাম উইলিয়াম ও তার স্ত্রী এ্যানি । পেইন্টিং টা বেশ পুরনো। অনেক গুলো বছর এই বন্ধ ঘরে অযত্ন আর অবহেলায় পেইন্টিং টা তার নিজের সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। রঙ গুলো খসখসে হয়ে পড়ছে এবং তাতে বেশ কিছু মাকড়সার জাল বাসা বেঁধেছে। রেবেকা জাল গুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করে, পেইন্টিং-এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনো গোপন কক্ষ রাখা আছে, যেটা এই পেইন্টিং দিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে পেইন্টিং রাখা হয়েছে যাতে মানুষ সহজেই সেই গোপন কক্ষটা খুঁজে না পায়। রেবেকা পেইন্টিং টা সরাতে গেলে হাত ফসকে পেইন্টিংটা ফ্লোরে পড়ে একটা বিকট আওয়াজের সৃষ্টি করে। পেইন্টিং টা ভেঙে গেছে। আর ভাঙবেই না কেন! এটা কম হলেও শত বছরের অধিক পুরনো। পেইন্টিং-এর কাঠের ফ্রেমে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছে অনেক আগেই।
পেইন্টিং-এর পিছনে বেরিয়ে আসে একটা কাঠের দরজা। দামী নকশা করা কাঠের ডিজাইন দেখে ওরা অবাক না হয়ে পারে না। এত সুন্দর আর সূক্ষ্ম নকশা যেন এই প্রথম বারের মতো ওরা দেখেছে। রাজকীয় বাড়ির দরজা ও রাজকীয়। রেবেকা দরজাটা খোলার চেষ্টা করে, ভেতরে কি আছে দেখতে চায়। কিন্তু তার আগে হলঘর থেকে মিসেস ইলমা ওদের ডাকছে। রাতের ডিনারের সময় হয়ে এসেছে। দুই বোন ঘরের দরজাটা লাগিয়ে নিচতলায় চলে যায়। আগামীকাল সকালে এসে এই ঘরে কি আছে, সেটা খুঁজে দেখবে।
দুই বোন হলঘরে ঢোকে। সোফিয়া ও স্টিফেন দুজনে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। ন্যান্সি খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত। স্টিফেন সোফিয়ার সঙ্গে একটা কেস নিয়ে কথা বলছে। স্টিফেন পেশায় একজন পুলিশ অফিসার। চাকরি সূত্রেই এই নির্জন পাহাড়ী এলাকায় ওদের আসা। এখানে একটা বিশেষ কেসে ওকে আনা হয়েছে। যদিও এখানে ওকে চার-পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে থাকতে হবে। স্টিফেন তার স্ত্রীকে বোঝাচ্ছে, এই জায়গাটা তেমন নিরাপদ নয়। এই গ্রামের মানুষেরা অনেক জাদু-টোনায় বিশ্বাস করে। অন্যের সঙ্গে শত্রুতা করে জাদু করে মানুষের ক্ষতি করে, এমনকি মেরেও ফেলে।তাই ওদের সঙ্গে এত আলাপ করার দরকার নেই।যতটা সম্ভব দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে।স্টিফেন বলে তাদের মেয়েদের যেন বাড়ির বাইরে বেরোতে দেয়া না হয়। এই এক মাসে এই শহরে অনেকগুলো বাচ্চা ছেলে-মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। সবগুলোই রহস্যময় আর অমিমাংসিত। বাচ্চার বয়স নয় থেকে পনেরো বছর এবং এগুলো কোনো মানুষের কাজ নয়, কোনো প্রেতাত্মা বা খারাপ কোনো শক্তির ফলে এইসব হচ্ছে।
সোফিয়া প্রথম প্রথম এই জায়গায় আসতে আপত্তি না করলেও এইসব শুনে তার আর ভালো লাগছে না। এমন একটা অনিরাপদ জায়গায় সে কীভাবে তার দুই বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে থাকবে? স্টিফেন তাকে বোঝায়, এখানকার মানুষদের এড়িয়ে চললে কোনো সমস্যা হবে না। তাদের সঙ্গে তো এখানে কারোর শত্রুতা নেই। সারা ও রেবেকা দুজনে দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনছে। দুজনেই চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে পড়লো। ন্যান্সি ওদের প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।হঠাৎ স্টিফেনের ফোন বেজে উঠল। ফোন হাতে করে হলঘর থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কি হচ্ছে বুঝতে না পেরে দুই বোন একজন আরেকজনের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। একটু পর স্টিফেন ঘরে প্রবেশ করল।
“তোমরা ডিনার সেরে নাও। আমাকে একটু বেরোতে হবে। থানার থেকে ফোন এসেছে। সারা, রেবেকা, তোমরা তোমার মাকে একদম বিরক্ত করবে না। ডিনার করে ভালো বাচ্চার মতো ঘুমিয়ে পড়বে,” বলল স্টিফেন। বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। স্টিফেন সারা ও রেবেকার কথার জবাব শোনার জন্য অপেক্ষা করলো না।
“জলদি খাবার শেষ করো,” বলল সোফিয়া।
সারা ও রেবেকা কোনো কথার জবাব দিল না। চুপচাপ খাবার খেয়ে নিজেদের রুমে ফিরে গেল। মিসেস ইলমা আগে থেকেই ওদের জন্য রুমটা তৈরি করে রেখেছে। ঘরে দুটো সিঙ্গেল খাট রাখা আছে। দুই বোনের জন্য আলাদা খাট রাখা আছে। দুজনেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিনের জার্নিতে দুজন বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। শুয়ে পড়ার সাথে সাথে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লো।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০২৫ বিকাল ৪:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


