
ফিসফিসানি...
বর্ষার রাত। পাহাড়ি এলাকায় এখনো কনকনে শীত পড়ছে। দুই বোন পাতলা কম্বল জড়িয়ে জড়সড় হয়ে শুয়ে আছে। চারদিক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। রুমের পাতলা পর্দা ভেদ করে জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরে। কার্পেটের উপর গাছের ডালপালার ছায়া পড়ে অদ্ভুত সব ভুতুড়ে নকশা তৈরি হয়েছে।
এক টুকরো আলো এসে পড়েছে রেবেকার মুখের উপর। হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে গেল ওর। পাশ ফিরে শুয়ে চোখ মেলে তাকাল সে এবার। ঘরময় ছড়ানো ছিটানো প্লাস্টিকের পুতুল , খেলনা প্রাণীগুলো অপলক চোখে চেয়ে আছে ওর দিকে। এই রাতের আলো আধারিতে ও গুলোর দৃষ্টি যেন দিনের বেলার মতো নিরীহ মনে হচ্ছে না আর। পুতুল গুলোর দৃষ্টি যেন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
শোয়া থেকে উঠে বসল সে। মুখের ওপর এসে পড়া এক গোছা চুল সরিয়ে দিল হাত দিয়ে। মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নের ভিতরে ও কার গলা শুনতে পেয়েছিল। একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল সেই কণ্ঠস্বর। আরেকটু হলেই মনে হয় স্পষ্ট করে বোঝা যেত।
"হ্যালো!" আস্তে আস্তে ডাকল স্টিফেন।
"বাবা, তুমি ফিরে এসেছ? ডিনার করবে না?" ঘুম ঘুম চোখে বলল রেবেকা।
"ডিনার করেছি। আজকে একটা ছোট্ট মেয়ে মারা গেছে। পুরো শরীরটা যেন আগুনে জ্বলছে গেছে। একদল লোক ওকে মেরে জঙ্গলের মাঝে রেখে চলে গেছে। মেয়েটা একদম সারার বয়সী। ওদের ধারনা মেয়েটির উপর শয়তানের নজর আছে। ওকে মেরে ফেললে সব সমস্যার সমাধান হবে। তাই গ্রামের লোকজন গাছের সাথে বেঁধে আগুন দিয়ে মেরে ফেলেছে। এরপর মৃত লাশ জংগলেই ফেলে রেখে যায়। শুনেছি মেয়েটার পরিবারের লোকজন ও গ্রামের লোকজনদের সঙ্গে ছিল। ওকে দেখে তোমাদের দুজনের কথা বেশ মনে পড়ছিল। ভাবলাম, তোমাদের দুজনকে দেখে যাই," বলল স্টিফেন।
"তোমার কি মন খারাপ?" জিজ্ঞেস করল রেবেকা।
"না, আমি ঠিক আছি। তুমি ঘুমাও।কাল সকালে কথা হবে," বলল স্টিফেন।
"তুমিও বিশ্রাম নাও। সকাল সকাল আবার তোমাকে থানায় যেতে হবে," বলল রেবেকা।
স্টিফেন দুই মেয়ের কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে রুমে চলে গেল। রেবেকা আবার কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, কনকনে শীত পড়ছে। স্টিফেন নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
রেবেকা কম্বলের ভেতরে গা ঢুকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করল। বাইরে বৃষ্টির শব্দের মধ্যে কোথা থেকে যেন একটা চাপা ফিসফিসানি ভেসে আসছে। কেউ যেন অদ্ভুত স্বরে কান্না করছে। শব্দটা খুব কাছ থেকেই আসছে। শব্দ শুনে রেবেকার ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে সে ভেবেছিল বৃষ্টির আওয়াজের ভুল বুঝি। কিন্তু না... এবার স্পষ্টই শুনতে পেল। কেউ যেন কান্না করছে। বেশ রহস্যময় ভাবে কাঁদছে। রেবেকা ঘাড়ে হালকা ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করল। ওর গা কাঁপতে লাগল ভয়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে পাশে হাতড়ে দেখল, সারা ও শুয়ে আছে। আশেপাশের পরিবেশ কেমন যেন লাগছে তার কাছে। রেবেকা আশেপাশে চোখ মেলে দেখতে লাগল, হঠাৎ নজরে পড়ল জানালার পর্দার আড়ালে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। যেন ধোঁয়ার মতো আবছা সেই অবয়ব! সেখান থেকেই কান্নার শব্দটা আসছে। বুকে একটা ধাক্কা লাগল ওর। এক ঝটকায় উঠে বসে পড়ল সে। ঘরে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। বিছানা থেকে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বুকে সাহস নিয়ে পর্দা সরাতেই দেখল পর্দার ওপাশে কেউ নেই। মনের ভুল ভেবে আবার বিছানায় ফিরে এলো। চাঁদের আলো ও ম্লান। জানালার পর্দা হালকা দুলছে, পর্দার আড়ালে আবার সেই অবয়ব দেখা যাচ্ছে। প্লাস্টিকের পুতুলগুলোর দিকে তাকাতেই রেবেকার শরীর জমে গেল। সব পুতুলের মুখে যেন একটা কুচকুচে কালো হাসি ফুটে উঠেছে। আর সবাই যেন তাকিয়ে আছে শুধু ওর দিকেই। রেবেকা সবকিছু উপেক্ষা করে কম্বল জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল।
ভোরের আলো আস্তে আস্তে ঘরটা কে ছুঁয়ে দিল। জানালার ফাঁক দিয়ে রৌদ্রছায়া মিশ্রিত হালকা আলো বিছানায় এসে পড়েছে। বাইরে থেকে ভিজে মাটির গন্ধ আর দূরের পাখির ডাক ভেসে আসছে। রেবেকা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। দেখল সারা বিছানায় বসে আছে। পুতুল নিয়ে খেলা করছে। কিছু পুতুল এখনো ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ফ্লোরে পড়ে থাকা খেলনাগুলো আগের মতোই ঠাণ্ডা আর নিশ্চল। রাতের সেই ভয়ংকর ছায়া কান্নার আওয়াজ সব যেন কোনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল এখন। রেবেকা ভাবে সেইসব হয়তো তার মনের ভুল কিংবা কোনো খারাপ স্বপ্ন ছিল। পরদিন সকালে রেবেকা উঠে বসে জানালার বাইরে তাকাল। পাহাড়ের ঢালে নেমে আসা ঘন কুয়াশায় পুরো গ্রামটা ঢেকে গেছে। রাতের টানা বৃষ্টির পর সবুজ প্রকৃতি যেন নতুন করে স্নান করে উঠেছে। গাছের পাতা থেকে বৃষ্টির ভারী ফোঁটাগুলো এক এক করে টুপটাপ ঝরে পড়ছে মাটিতে আর সেখান থেকে মিশে আসছে ভিজে মাটির সেই চেনা মায়াবী গন্ধ।
দূরের পাহাড়গুলো আধো ছায়া, কুয়াশার চাদরে নিজেকে মুড়ে রেখেছে। মেঘের আড়াল ভেদ করে সূর্যের আলোর এক ফালি রোশনাই গাছের মাথায় এসে পড়েছে পানিতে ভেজা পাতাগুলো তাতে চিকচিক করে উঠছে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস বয়ে এসে জানালার পর্দাকে দুলিয়ে দিচ্ছে যেন প্রকৃতি নিজের নীরবতা ভেঙে রেবেকাকে ডাকছে। দূরে ছোট্ট জলপ্রপাতের শব্দ ভেসে আসছে । পাখিরা একে একে ডানায় ভেজা বৃষ্টি ঝেড়ে নিয়ে কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে তাদের মিষ্টি ডাক পাহাড়ি সকালের নিস্তব্ধতাকে আরও জীবন্ত করে তুলছে। চারদিকে সবুজ আর ধোঁয়াটে সাদা কুয়াশার মিশ্রণে যেন একটা অন্যরকম জাদু ছড়িয়ে আছে। রাতের সব দুঃস্বপ্ন সব অস্বস্তি ধুয়ে-মুছে যেন প্রকৃতি নতুন সকাল সাজিয়ে রেখেছে রেবেকার জন্য।
রেবেকা জানালা থেকে একটু ঝুঁকে বাইরে তাকাল। তাজা বাতাস বুক ভরে নিল সে।
মনে হলো এমন শান্ত সকাল হয়তো আগে কখনো দেখেনি। রেবেকা মনে মনে তার বাবাকে ধন্যবাদ জানায় এমন সুন্দর একটা পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম সে তো এই জায়গায় আসতে চাইছিল না। অথচ এখন তার কাছে মনে হচ্ছে এখানে আসা ওদের জন্য বেস্ট একটা সিদ্ধান্ত ছিল।
রেবেকা আবার জানালার বাইরে চোখ মেলে তাকাল। সারারাতের টানা বৃষ্টির পর পাহাড়ি গ্রামটা যেন জেগে উঠেছে নতুন প্রাণে। পাহাড়ের গা বেয়ে নামা ছোট্ট নদীটা দূরে চকচক করছে ভেজা পাথরের উপর দিয়ে। হালকা কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা সেই নদীর শব্দ মৃদু ঝংকার তুলছে বাতাসে। দূরে দুই একটা ছোট কুঁড়েঘর থেকে ধোঁয়ার সরু রঙিন রেখা উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। কেউ হয়তো ভোরের চুলা ধরিয়েছে।
রেবেকা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সবকিছু। হঠাৎ তার পাশে এসে দাঁড়াল সারা।
“ওই যে দূরের পাহাড় দেখছো। ওখানে একটা সুন্দর ঝরনা আছে। ওখানে যাবে?” বলল সারা।
“আজ যাবো না। আজ আমরা এই বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখবো। পাহাড়ে যেতে হলে বাবা মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে যেতে হবে। ওরা জানলে যেতে দেবে না। খুব বকবে। ফ্রাইডেতে বাবা মায়ের একটা জরুরি কাজ আছে যার জন্য শহরে যেতে হবে। সারাদিন বাড়িতে একা থাকবো। ওইদিন আমরা ঝরনা আর পাহাড় দেখতে যাবো।” বলল রেবেকা।
সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে। বর্ষণমুখর এক দিনের সূচনা ঘটে। সেদিন সকাল থেকেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। শুধু বৃষ্টি নয়, সেইসঙ্গে কুয়াশার একটা ঝাপসা পর্দা চারপাশটায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা।
স্টিফেন দরজার সামনে পায়চারি করছে। বৃষ্টির কারণে বাড়ি থেকে বেরোতে পারছিল না সে। তাই অস্থির লাগছিল ওর। থানায় আজ ওর প্রথম দিন। প্রথম দিনেই লেট করতে চায় না সে, কিন্তু উপায় নেই। স্টিফেন পায়চারি করছে আর বারবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। বাইরের যা অবস্থা, ছাতাতেও কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। স্টিফেনের বাড়ি থেকে থানায় মিনিট চল্লিশ মিনিটের পথ। তবে যেহেতু পাহাড়ী পিচ্ছিল রাস্তা তার উপর বৃষ্টি পড়ছে, তাই এক ঘন্টার আগে পৌঁছানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অনেকক্ষণ ধরে মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে একসময় স্টিফেন এক হাতে ফাইল আর অন্য হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়েই পড়ল। বৃষ্টির কারণে রাস্তাগুলো বেশ পিচ্ছিল হয়ে আছে। হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল ওর। শহরে বড় হওয়া মানুষ সে। এই রকম রাস্তায় হেঁটে চলার অভিজ্ঞতা তার এই প্রথমবারের মতো হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে পাকা রাস্তায় এসে পৌঁছাল সে। রাস্তার পাশে শহরের মতো ফুটপাত নেই। রাস্তার পাশে চিকন ড্রেন দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি বয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ী এলাকায় রিকশা চলে না। রিকশা পেলে হয়তো তার জন্য বেশ ভালো হতো। স্টিফেন মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকে। ছাতা থাকা সত্ত্বেও শরীর অনেকটাই ভিজে গেছে। কুয়াশা আর বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে মাঝেমাঝে কাঁচ ফেলা গাড়িগুলো পাশ দিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। তাদের বন্ধ উইন্ডস্ক্রিন এবং জানলার কাঁচের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির বিন্দু বিন্দু কণা।
দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টির ছাঁট মুখে-চোখে এসে ঝাপটা মারল। চিন্তায়-ভাবনায় আচ্ছন্ন স্টিফেন চিন্তার তাল কেটে গেল। বৃষ্টির ঘন পর্দা ভেদ করে ওর দৃষ্টি চলে গেল সামনের দিকে। দেখল, ওর সামনে রাস্তার ওপর একটা অল্পবয়সী ছেলে দাঁড়িয়ে। বয়স অল্প হলেও বেশ লম্বা, দুই কানে একজোড়া হেডফোন লাগানো, পরনে নীল রেইন কোট। প্রথম নজরেই মনে হলো, ছেলেটি কোনো স্টুডেন্ট হবে। হয়তো কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। স্টিফেন ছেলেটিকে বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। কেন দেখছিল সে নিজেও জানে না। স্টিফেনের নজরে ছেলেটিকে স্বাভাবিক মনে হলো না। যেন কোন শয়তান তার কাঁধে ভর করে রেখেছে। চোখ গুলো লাল বর্নের ধারন করেছে।
হঠাৎ ছেলেটি রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াল। কোনোদিকে না তাকিয়েই ওপারে যেতে রাস্তা পার হতে গেল আর ঠিক তখনই একটা জোরে ব্রেক কষার শব্দ কানে এলো স্টিফেনের। ওর চোখের সামনেই ঘটে গেল বিশ্রী ঘটনাটা। বিশাল একটা বাঁশভর্তি ট্রাক ছুটে আসছিল উল্টোদিকের রাস্তা থেকে। হেডফোন কানে, ছেলেটি তখনো মাঝরাস্তাও পেরোয়নি। ট্রাকটা ওর প্রায় ঘাড়ের কাছে এসে সজোরে ব্রেক কষার চেষ্টা করেও পারল না। হুড়মুড় করে এসে পড়ল তার ওপর। নিমেষে যুবকটির দেহের ওপর দিয়ে স্টিম রোলারের মতো চলে গেল তার দেহটাকে পিষে দিয়ে। ছেলেটি মারা গেছে। ওর নিথর রক্তে ভেজা দেহ রাস্তায় পড়ে রইলো।
যুবকটিকে চাপা দিয়ে চলে যাবার পর ক্ষণিকের জন্য একটু থেমেছিল ট্রাকটি বোধহয় ড্রাইভার লোকটি পেছন ফিরে তাকিয়ে পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করছিল। তারপরেই বিদ্যুৎগতিতে ট্রাকটাকে ছুটিয়ে নিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।
স্টিফেন তৎক্ষণাৎ বাড়িতে ফোন দিল। ফোন রিসিভ করে ন্যান্সি।
“হ্যালো কে বলছেন?” বলল ন্যান্সি ।
“আমি মিস্টার ব্লাকউড বলছি। সোফিয়া কোথায়?” বলল স্টিফেন ।
“উনি রবার্ট কে নিয়ে বাগান পরিষ্কার করছে।” বলল ন্যান্সি ।
“সারা ও রেবেকা কোথায়?” জিজ্ঞেস করল স্টিফেন।
“বাগানে দোলনা নিয়ে খেলছে” বলল ন্যান্সি
“আচ্ছা সোফিয়া কে বলে দিও আমার ফিরতে দেরী হবে। বাচ্চাদের দিকে যেন নজর রাখে। ওরা কোন ভাবেই যেন গেইট পার হয়ে রাস্তায় না যেতে পারে” বলল স্টিফেন।বলেই ফোনটা কেটে দিলো।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


